হানাফি মাযহাবের উপর অন্যতম আপত্তি হচ্ছে, এটি কিয়াসভিত্তিক মাযহাব। হাদিসের চেয়ে এই মাযহাবে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে কিয়াস তথা যুক্তিকে। এমন আপত্তি যারা করেন তারা মূলত হাদিস শাস্ত্রে গভীর জ্ঞান রাখেন না। ভাসা-ভাসা জ্ঞানের অধিকারী হওয়ায় হানাফি মাযহাবকে তাদের কাছে হাদিস-বিরোধী লাগে। হানাফি ফিকহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কিতাব হেদায়া। তাতে উল্লেখিত হাদিসগুলোর তাখরিজ সংক্রান্ত কিতাব 'নাসবুর রায়াহ'র ভূমিকা লিখেছেন আল্লামা যাহিদ কাউসারি রহ.। সেখানে তিনি উপরোক্ত আপত্তির সুন্দর জবাব দিয়েছেন। পরবর্তীতে সেই ভূমিকাটিই 'ফিকহু আহলিল ইরাক ওয়া হাদিসুহুম' নামে আলাদা কিতাবরূপে প্রকাশিত হয়। সেই কিতাবটি ক্বওমি মাদরাসার ইফতা বিভাগে পড়ানো হয়।
উপর্যুক্ত আপত্তির জবাবে হানাফি উলামায়ে কেরাম বহু কিতাবাদিই রচনা করেছেন। তন্মধ্যে বক্ষমাণ গ্রন্থটি তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত ও সামগ্রিক। কিতাবটির গুরুত্ব বিবেচনায় বাংলাভাষী পাঠকদের সামনে এর বাংলা ভার্সন নিয়ে এসেছি আমরা। আশা করি, সর্বস্তরের চিন্তাশীল পাঠকের চিন্তার খোরাক জোগাতে সক্ষম হবে গ্রন্থটি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকল শ্রম ও প্রচেষ্টা ইখলাসের সাথে কবুল করে নিন।
আল্লামা যাহিদ ইবনে হাসান কাউসারি রহ. প্রাজ্ঞ, বিশেষজ্ঞ ও গবেষক একজন আলিম। ১২৯৬ হিজরির ২৭ বা ২৮শে শাওয়াল তিনি জন্মগ্রহণ করেন তুরস্কের দুযাজা শহরের হাজি হাসান আফেন্দি গ্রামে। তখন চলছিল উসমানী সালতানাতের শেষ সময়। এই দুযাজা শহরের শায়েখদের কাছেই প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। পরে ১৩১১ হিজরিতে চলে যান কাজাখিস্তানের আস্তানা নগরীতে। সেখানে গিয়ে হাসান আফেন্দির প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসা দারুল হাদিসে ওঠেন।
পরে মসজিদে ফাতিহে ইবরাহিম হাক্কি আয়ীনির কাছে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত ইলম অর্জন করেন। তিনি মারা যান ১৩১৮ হিজরি সনে। উনার ইন্তেকালের পর শায়েখ আলি যাইনুল আবেদিন আলসূনির কাছে পড়াশোনা শেষ করেন। ১৩২৫ হিজরিতে জীবনের সর্বশেষ কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে কৃতিত্বের সাথে কৃতকার্য হন তিনি। পড়াশোনা শেষে তিনি অধ্যাপনা শুরু করেন মসজিদে ফাতিহে। সেটা অব্যাহত থাকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত।
উসমানী সালতানাতের পতনের পর রাষ্ট্র দ্বিনবিরোধী শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে। এর প্রতিবাদে তিনি ছিলেন সোচ্চার। ফলে তিনি পড়ে যান রাষ্ট্রীয় রোষানলে। ১৩৭১ হিজরির ১৯শে যিলক্বদ তারিখে ৭৫ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন।
যাহিদ কাউসারি রচিত স্বতন্ত্র গ্রন্থের সংখ্যা ৫১টি। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য রচনাগুলো হচ্ছে: 'তা'নিবুল খতিব আলা মা সাক্বাহু ফি তরজমাতি আবি হানিফা মিনাল আকাযিব', 'বুলুগুল আমানি ফি সিরাতি মুহাম্মদ ইবনে হাসান শায়বানি', আল ইশফাক আলা আহকামিত তালাক', আল ইহতিমাম বিতরজমাতি ইবনিল হুমাম, আল হাভি ফি সিরাতিল ইমাম আবি জাফর তহাবি', লামহাতুন নযর ফি সিরাতিল ইমাম যুফার', আত তারহিব বিনাকদিত তা'নিব' ইত্যাদি। এছাড়া বহু কিতাবাদিতে টীকা-টিপ্পনী লাগিয়েছেন তিনি। লিখেছেন বহু কিতাবের ভূমিকা। বক্ষমাণ গ্রন্থটিও মূলত যাঈলাঈ রচিত 'নাসবুর রায়াহ' কিতাবের ভূমিকা স্বরূপ লিখেছিলেন তিনি।
শুরুর কথা
প্রশংসা সব সেই আল্লাহর যিনি সমুন্নত করেছেন ফুকাহায়ে কেরামের মর্যাদা। সরল ও পরিচ্ছন্ন দ্বীনের খেদমতে যাঁদের হিম্মত সুউচ্চ। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক সর্বশেষ নবি সাইয়িদুনা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর। যিনি হলেন মুত্তাকিদের আস্থার প্রতীক। মানবজাতিকে জাহিলিয়াতের অন্ধকার থেকে যিনি নূর এবং আলোর পথে নিয়ে এসেছেন। আরো দরুদ বর্ষিত হোক তাঁর পরিবারবর্গ এবং সাহাবায়ে কেরামের উপর। যাঁরা হলেন পছন্দনীয়, মনোনীত এবং অনুসরণীয় আদর্শ নেতা। হেদায়াত ও পথ প্রদর্শনের সূর্যপুরুষ তাঁরা। সমুজ্জ্বল শরিয়তের বিধানাবলি অবিকৃত রূপে আমাদের পর্যন্ত পৌছে দেওয়ায় (কেয়ামতের মাঠে) তাঁরা থাকবেন সতেজ ও প্রাণবন্ত।
প্রথিতযশা গবেষক আলেম শায়খ যাইলাঈ রহ.-জান্নাতে তাঁর অবস্থান সুউচ্চ হোক- রচিত 'নাসবুর রায়াহ লি তাখরিজি আহাদিসিল হিদায়া' অতুলনীয় একটি কিতাব। (বক্ষ্যমাণ গ্রন্থটি উপরোক্ত কিতাবটির ভূমিকা রূপেই লিখেছিলেন এর লেখক। তা-ই উক্ত কিতাব সম্পর্কে বলা হয়েছে ভূমিকায়।) বিধানের হাদিস বিশ্লেষণে কোনো জুড়ি নেই এই কিতাবের। কারণ, কোনো ধরনের বাধা-বিপত্তি, অলসতা এবং পরনির্ভরতা এর লেখককে একমুহূর্তের জন্যও বিচ্যুত করতে পারেনি চূড়ান্ত গবেষণা এবং বিশ্লেষণ থেকে। এছাড়া বড়ত্ব কিংবা জ্ঞানের গভীরতার অজুহাতে সমসাময়িক অথবা ছোটদের থেকে তত্ত্ব আহরণে নিরুৎসাহিত হননি তিনি। বরং তার স্বভাব ছিল যেখানেই পাওয়া যাবে রাতদিন শুধু কাঙ্ক্ষিত জ্ঞান তালাশ করে যাওয়া।
এমনতর ইখলাস এবং গবেষণার ফলে বক্ষ্যমাণ কিতাবটি হাদিস বিশারদদের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পেরেছে। হৃদয়ের সেই স্থান দখল করে নিয়েছে এই গ্রন্থটি হাদিস বিশ্লেষণের আর কোনো কিতাব নেই সেই স্থানে।
একথা বললেও অত্যুক্তি হবে না, আল্লামা যাইলাঈ রহ. গবেষণার কোনো জায়গা বাদ রাখেননি। বরং সকল অধ্যায়ে এমন বিশদ আলোচনা করেছেন যে, সব মাযহাবের ফকিহগণই দলিল দিতে পারবেন এই কিতাবের হাদিস দ্বারা। তাঁর সমসাময়িক এবং পরবর্তী খুব কম হাদিস বিশারদগণই খুঁজে পান উক্ত কিতাবোল্লিখিত হাদিসগুলোর মূল উৎসগ্রন্থ। কেননা সেগুলোর অধিকাংশই বিদ্যমান রয়েছে অকল্পনীয় বিভিন্ন কিতাবে। তবে কেউ তাঁর মতো চেষ্টা ও গবেষণা চালালে খুঁজে পেতে পারে সেগুলো।
শুধু নিজেদের দলিলগুলোতে সীমাবদ্ধ না থেকে বিরোধী পক্ষের প্রমাণাদিও সংকলন করেছেন খুব স্বল্পসংখ্যক হাদিস বিশারদ। সর্বোচ্চ ইনসাফের সাথে উভয় পক্ষের দলিল ও খণ্ডনগুলো উল্লেখ করার মতো উদারতা খুব বেশি মানুষের মধ্যে দেখা যায় না। নিজ মাযহাবের বিধানসংক্রান্ত হাদিস গবেষণায় কিতাব লিখেছেন অনেকেই। তবে তাদের কারো মাঝে ছিল গবেষণার অপর্যাপ্ততা। কেউবা আবার নাকাল ছিলেন প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণে। গবেষণার অপর্যাপ্ততায় শক্তিশালী দলিলসম্পন্ন একটি মাসআলাও নিতান্তই দুর্বল দেখা যায়। আর প্রবৃত্তি পূজার চূড়ান্ত পরিণতি হচ্ছে সাম্প্রদায়িকতা ও গোঁড়ামি; ওলামায়ে কেরামের কাছে যা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।
দলিল গবেষণার সময়ে ইলমি দক্ষতার জন্য সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাপার হচ্ছে মাযহাবের অন্যায় তরফদারি। যার ফলে শক্তিশালী মাসআলাকে মনে হয় দুর্বল আর দুর্বলটা উপস্থাপিত হয় মজবুত রূপে। তেমনি শক্ত প্রমাণ হয়ে যায় নড়বড়ে। পক্ষান্ত রে ভাসাভাসা দলিলটাকেও দেখা যায় বেশ দৃঢ়। কিন্তু দ্বীনি বিষয়ে আল্লাহর ভয়ে ভীত কারো ক্ষেত্রে সমীচীন নয় এটা। যেই দিন সবাইকে তার কৃতকর্মের হিসাব দিতে হবে সেই দিনের ভয়ে যারা কম্পিত তাদের থেকে এটা অশোভনীয়।
সুতরাং হাদিস বিশারদদের মধ্যে গভীর ও প্রশস্ত জ্ঞানের অধিকারী প্রবৃত্তি পূজা মুক্ত কাউকে পাওয়া গেলে আঁকড়ে ধরতে হবে তাঁকে। কেননা তিনি হচ্ছেন লাল ইয়াকুত তুল্য। (যা খুবই দুষ্প্রাপ্য ও দুর্মূল্য)
আল্লামা যাইলাঈ রহ. (মৃত্যু: ৭৬২ হি.) তেমনি একজন ইয়াকুত তুল্য হাদিস বিশারদ। তা-ই তো পরবর্তী হাদিস গবেষকদের সবাইকে তাঁর দ্বারস্থ হতে হয়। বদর যারকাশি (৭৪৫-৭৯৪ হি.), ইবনে মুলাক্কিন (৭২৩-৮০৪ হি.) এবং ইবনে হাজার প্রমুখসহ অন্য অনেকের ব্যাপারে মানুষ ভাবে যে, তাঁরা মুগ্ধতার আকাশ ছুঁয়ে ফেলেছেন। টক্কর দিয়েছেন মেঘমালার সাথে। তাঁদের রচনাগুলোকে যাইলাঈ রহ. রচিত কিতাবাদির সাথে তুলনা করলেই আমার কথার সত্যতা টের পাবেন আপনি। বরং আরো বেশি মনে হবে আপনার কাছে। বলতে বাধ্য হবেন, মাযহাবি সংকীর্ণতা ছাড়া সেই কিতাবাদির সবই আছে যাইলাঈ রহ.র রচনাবলিতে। বরং আরো সুবিন্যস্ত রূপে।
'নাসবুর রায়াহ' গ্রন্থে হানাফিরা খুঁজে পাবে বিধানাবলির ক্ষেত্রে মাযহাবি ইমামগণের পেশকৃত মৌলিক হাদিসগুলো। আর মালেকিরা দেখতে পাবে এতে 'তামহীদ' ও 'ইসতিযকার' নামক কিতাব দুটিতে ইবনে আব্দুল বারের (মৃত্যু: ৪৬৩ হি.) চয়নকৃত সর্বোত্তম কিছু গবেষণা। এছাড়াও তারা এতে পাবে ইবনুল খাররাত্ব আন্দুলুসী (৫১৪-৫৮১ হি.) রচিত বিধানসংক্রান্ত হাদিসি কিতাবগুলোতে উল্লিখিত আলোচনার সারসংক্ষেপ।
শাফেয়িরা এই কিতাবে পাবে 'সুনান', 'মা'রিফাহ' সহ ইমাম বাইহাকী (৩৮৪-) রচিত অন্যান্য কিতাবে ছড়িয়ে থাকা বিশুদ্ধ কিছু পর্যালোচনা। সেই সাথে ইমাম নববি রহ. (৬৩১-৬৭৬ হি.) 'খুলাসা', মাজমু' এবং 'শরহু মুসলিম' নামের কিতাবগুলোতে যে আলোচনা করেছেন তার বিশুদ্ধ এক সারনির্যাস বিদ্যমান এই 'নাসবুর রায়াহ' গ্রন্থে। আরো আছে 'ইলমাম' ও 'শরহুল উমদাহ'য় ইবনু দাকিকিল ঈদ রহ. (৬২৫-৭০২ হি.)র বয়ানকৃত বিষয়গুলোর সংক্ষিপ্ত উপস্থাপন।
আর হাম্বলিরা এই কিতাব থেকে জানতে পারবে ইবনুল জাওযি (৫১০-৫৯৭হি.) রচিত 'তাহত্ত্বিক', ইবনু আবদিল হাদি (৭০৪-৭৪৪ হি.) প্রণীত 'তানকিহুত তাহকিক' সহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের অন্য অনেক কিতাবে বিবৃত সমালোচনার অনেক নীতিমালা। এমনকি গবেষণা করলে এই 'নাসবুর রায়াহ'তে পাওয়া যাবে বিধানসংশ্লিষ্ট এমন কিছু হাদিস যা অনুপস্থিত সিহাহ (বিশুদ্ধ হাদিসের কিতাবাদি), সুনান (ফিকহের অধ্যায় অনুসারে সাজানো হাদিসের গ্রন্থ), মাসানিদ (কোনো নির্দিষ্ট সাহাবি বর্ণিত হাদিসের কিতাব), আসার (রসুল, সাহাবি, তাবেঈ সবার বক্তব্যের সমাহার ঘটে যে হাদিসের কিতাবে) এবং মাআজিম (হাদিসের সেই গ্রন্থ যাতে হাদিস বিন্যস্ত হয়েছে সাহাবি বা শায়খ অথবা দেশের নামের ধারাবাহিকতায়) এর কিতাবসমূহে। সেই কিতাবসমূহের অন্যতম হচ্ছে, মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা। ফকিহদের দৃষ্টিতে এটি হাদিসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কিতাব। এছাড়া আছে মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক সহ বর্তমানে দুর্লভ কিছু কিতাবাদি। (সেগুলোতে যা নেই তা আছে 'নাসবুর রায়াহ'তে।)
সেইসঙ্গে 'নাসবুর রায়াহ' তে প্রতিটি হাদিসের সাথেই রয়েছে সেই হাদিস সংশ্লিষ্ট পরিপূর্ণ আলাপ। যা গৃহীত হয়েছে হাদিস বর্ণনাকারীর নির্ভরযোগ্যতা যাচাই শাস্ত্রে পারদর্শীগণের মতামত ও হাদিসের ত্রুটি সম্বন্ধীয় প্রসিদ্ধ কিতাবাদি থেকে। এসব কারণেই হাদিসের অন্যান্য গবেষণামূলক গ্রন্থের সাথে এই গ্রন্থটির রয়েছে অনন্য স্বাতন্ত্র্য। 'নাসবুর রায়াহ'র এত প্রশংসা করে অন্যদের হিম্মত ও চেষ্টা প্রচেষ্টাকে কিন্তু দমাতে চাই না আমি। আমার উদ্দেশ্য কিন্তু এটা অস্বীকার করাও নয় যে, সত্যিকারের দৃঢ়তা সম্পন্ন ব্যক্তির মাঝে আল্লাহ তাআলা ঢেলে দিবেন ইলমের গূঢ়তত্ত্ব। আমি এটা স্বীকার করি যে, পরবর্তীদের রচিত বহু কিতাবেই রয়েছে প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা যোগ্য অনেক উপকারী বিষয়। দ্বিগুণ প্রচেষ্টা ও দৃঢ়প্রত্যয় থাকলে খাঁটি উৎস থেকে সেই ধরনের উপকারী জ্ঞানার্জন আরও বেশি করে সম্ভব।
'নাসবুর রায়াহ'র ব্যাপারে আমি যা বলেছি সেটা হলো, ইলমের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, যোগ্য ব্যক্তিকে তার অধিকার প্রদান। সেইসঙ্গে আমি চেয়েছি, মানুষ যেন বুঝতে চেষ্টা করে কেমন মহান আলেম ছিলেন আল্লামা যাইলাঈ রহ.।
তিনিই একমাত্র হানাফি হাদিস শাস্ত্রবিদ যিনি এমন বিশাল এক কর্মযজ্ঞ সম্পাদন করে গিয়েছেন। যেটা হয়ে গেছে তৎকালীন ও পরবর্তী যুগের সকল ফকিহের নিকট পরিপূর্ণ মুগ্ধতার একটি ব্যাপার। 'নাসবুর রায়াহ'র শিক্ষক, শিক্ষার্থী সকলেই এই ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাসী হয়ে যাবে, হানাফিরা সকল ক্ষেত্রেই হাদিস ও আসারের চূড়ান্ত অনুসারী।
কিন্তু পৃথিবীতে এমন কিছু গোঁড়া লোকের উপস্থিতি সর্বদাই রয়েছে যারা নিজেদের মূর্খতা কিংবা সাম্প্রদায়িকতার কারণে সমালোচনা করে হানাফিদের। কখনো ওরা সমালোচনা করে কোনো মাসআলায় শরিয়তের সুস্পষ্ট ভাষ্য না থাকাবস্থায় ইজতিহাদ করা নিয়ে। অথচ ফিকহ মানেই কিন্তু ইজতিহাদ। আবার কখনো ওদের সমালোচনার বিষয়বস্তু থাকে হানাফিদের হাদিস স্বল্পতা। অথচ গোটা বিশ্বেই কিন্তু তাদের হানাফি মুহাদ্দিসগণের বর্ণিত হাদিস সমাদৃত। অনেকে আবার বলে, হানাফিরা ইসতিহসান (তথা সূক্ষ্ম গবেষণা) করে। আর (তাদের মতে) ইসতিহসানের মানে হলো, নতুন করে শরিয়ত প্রণয়ন করা।
ইসতিহসান সম্পর্কে হানাফিদের ব্যাখ্যা জানার পর এই অভিযোগের কোনো ভিত্তিই থাকে না। তাছাড়া কিয়াস (অর্থাৎ স্বাভাবিক গবেষণা) কে স্বীকৃতিদানকারী ইসতিহসানকে অস্বীকার করে কীভাবে? শরিয়তের একমাত্র প্রণেতা হলেন, মহান আল্লাহ। আর রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন শরিয়ত প্রচারকারী। ফকিহগণের কাজ শুধু শরিয়তের ভাষ্যগুলো নিয়ে গভীর গবেষণা করে যাওয়া। তো ফকিহকে যারা বসাবে শরিয়ত প্রণেতার আসনে তারা মূলত শরিয়ত ও ফিকহ বোঝেনি কোনটিই। বরং পথ হারিয়ে ফেলেছে তারা। তা-ই তো ওরা শরিয়তকে বানিয়ে ফেলেছে মানুষের আবিষ্কার। অথচ শরিয়ত প্রণয়ন কিংবা ওহি প্রেরণে কখনোই কোনো মানুষের ভূমিকা রাখেননি আল্লাহ পাক। এসব থেকে তিনি সম্পূর্ণ পবিত্র।
বক্ষ্যমাণ গ্রন্থে আমি চেয়েছি সেই সব সমালোচনার অসারতা তুলে ধরতে। সে জন্যেই কিয়াস, ইজতিহাদ, হানাফিদের কাছে স্বীকৃত ইসতিহসান এবং তাদের মতে হাদিস গ্রহণযোগ্য হওয়ার শর্তবলীসংক্রান্ত বিষয়াদি আলোচনা করেছি এতে। আরও উল্লেখ করেছি, কুরআন ও হাদিসের জ্ঞান, আরবি ভাষা, ফিকহ ও তার মূলনীতি নিয়ে গবেষণার অঙ্গনে তৎকালীন কুফার (হানাফি মাযহাবের উৎপত্তিস্থল) অবস্থান। পাশাপাশি তুলে ধরার প্রয়াস চালিয়েছি যে, কুফাই ছিল প্রাচ্যের দেশগুলোতে ফিকহের উৎসভূমি। সেখান থেকেই পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে ফিকহের উজ্জ্বল জ্যোতি। এই গ্রন্থে এও প্রমাণ করেছি আমি, অন্যান্য মাযহাবের তুলনায় হানাফি মাযহাব বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। হাদিস শাস্ত্রে দক্ষতায় তাদের রয়েছে উল্লেখযোগ্য অবদান। ইসলামের শুরু যুগ থেকে আজোব্ধি ইরাকবাসীদের মাঝে রয়েছেন অনেক হাদিস বিশারদ। (আর সেই ইরাকের কুফার অধিবাসী ছিলেন আবু হানিফা রহ.।) তাছাড়া তাদের রয়েছে সূক্ষ্ম বুঝ ও অর্থের গভীরে হারিয়ে যাওয়ার দক্ষতা। এই ব্যাপারটা স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়েছে সকল হানাফি বিরোধী এবং রাবীদের নির্ভরযোগ্যতা যাচাই শাস্ত্র নিয়ে লিখিত গ্রন্থের সাধারণ পাঠকেরাও।
আল্লাহ তাআলাই যথেষ্ট আমার জন্য। আর তিনিই উত্তম কর্মবিধায়ক।
কিয়াস ও ইজতিহাদ
কিয়াসের ব্যাপারে বর্ণিত আছে কিছু প্রশংসামূলক হাদিস। পাশাপাশি রয়েছে কিছু নিন্দা সূচক হাদিস। তো নিন্দিত কিয়াস সেটাই যার উৎপত্তি হয় মানবিক চাহিদা ও প্রবৃত্তি থেকে। আর নন্দিত কিয়াস হলো, কুরআন ও সুন্নাহয় উল্লিখিত কোনো মাসআলার সাথে তুলনা করে সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন ও তাবে তাবেঈনের পথ ধরে নব্যসৃষ্ট মাসআলার সমাধান বের করা।
কিয়াসের প্রশংসা ও নিন্দা সূচক অধিকাংশ হাদিসগুলো তার প্রয়োগ স্থলসহ উল্লেখ করেছেন খতিবে বাগদাদি রহ. তাঁর রচিত 'ফকিহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ' কিতাবে। হাফেজ ইবনে আব্দুল বার রহ. ও সম্পাদন করেছেন এই একই কর্ম।
তো এই প্রসঙ্গে স্বতঃসিদ্ধ কথা হলো, ফকিহ সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন এবং তাবে তাবেঈন সকলেই মত দিয়েছেন নন্দিত কিয়াসের পক্ষে। অর্থাৎ কুরআন, সুন্নাহর ভাষ্য থেকে গবেষণা করে বের করা যাবে নবসৃষ্ট সমস্যার সমাধান। এটা এমন এক ইজমাঈ বা ঐকমত্যপূর্ণ বিষয় যা অস্বীকারের কোনো সুযোগ নেই।
ইমাম আবু বকর রাযি (৩০৫-৩৭০ হি.) তার প্রণীত 'ফুসূল' কিতাবে কিয়াস সম্বন্ধে ফকিহ সাহাবা ও তাবেঈদের মতামত উল্লেখ করার পর বলেন, একপর্যায়ে আবির্ভাব হয় ফিকহ ও তার মূলনীতি সম্পর্কে অজ্ঞ কিছু লোকের; যাদের কোনো জানাশোনা নেই পূর্বসূরিদের পথ ও পন্থা সম্পর্কে। সেইসঙ্গে নিজেদের মূর্খতা এবং নিকৃষ্ট প্রভৃতি পূজা থেকেও বিরত থাকে না তারা। ফলে তারা বিরোধিতা করে সাহাবায়ে কেরাম এবং তাদের পরবর্তী তাবেঈদের।
নতুন সৃষ্ট বিষয়ে কিয়াস ও ইজতিহাদ করাকে সর্বপ্রথম অস্বীকার করে ইবরাহিম নাযযাম। (সে ছিল ছুপা নাস্তিক। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত সহ অন্যান্য ভ্রান্ত দলের লোকেরাও কাফের সাব্যস্ত করেছিল তাকে। ২১১ হিজরির আশপাশে ইন্তেকাল হয় তার।) কিয়াসের স্বপক্ষে বলায় সাহাবায়ে কেরামেরও সমালোচনা করেছিল সে। তাঁদের প্রতি বেয়াদবিমূলক কথাবার্তা উচ্চারণ করেছিল এই কুলাঙ্গার। আল্লাহ তাআলা সাহাবায়ে কেরামের প্রতি যেই প্রশংসা ও সন্তুষ্টি বর্ণনা করেছেন তার উচ্চারণ ছিল তার সম্পূর্ণ বিপরীত। এসব করেছিল সে একেবারে বেপরোয়া এবং অপরিণামদর্শী হয়ে।
পরবর্তীতে ইবরাহিম নাযযামের মতামত অনুসরণ করে বাগদাদের একদল দার্শনিক। তবে সেই নাস্তিকের মতো তারা কটাক্ষ করেনি পূর্বসূরিদেরকে এবং দোষী সাব্যস্ত করেনি তাঁদেরকে। কিন্তু বিরোধীপক্ষকে আটকাতে এবং প্রকৃত প্রয়োজনকে অস্বীকার করতে গিয়ে হীন এক কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে তারা। যেন ইজতিহাদ ও কিয়াস প্রসঙ্গে পূর্বসূরিদেরকে কোনো কটাক্ষ না করা লাগে। সেই কৌশলটি হচ্ছে, তারা দাবি করত, সাহাবায়ে কেরাম যে নতুন সৃষ্ট বিষয়ে ইজতিহাদ ও কিয়াসকে বৈধ বলেছেন তা ছিল পারস্পরিক সমঝোতা ও মীমাংসার স্বার্থে। আবশ্যকীয় ও নিশ্চিত কোনো বিধান ছিল না সেটা। এ ধরনের মূর্খতাপূর্ণ দাবি করে মূলত নিজেদের মতবাদটাকেই উত্তম বলতে চাইত তারা। সেইসঙ্গে এড়াতে চাইত সেই সংকট যার মুখোমুখি হতে হয়েছিল নাযযামকে পূর্বসূরিদেরকে ভুল সাব্যস্ত করার কারণে।
এরপরে তাদের দেখানো পথে হাঁটে দাউদ ইবনে আলী হাশাবী নামের এক গণ্ডমূর্খ। এই লোকটি প্রকৃতপক্ষে জানতই না কিয়াসের ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরাম ও তাদের অনুসারীরা কী বলেন, আর বিরোধীদের বক্তব্যই বা কী!? সে নাযযাম থেকে কিছু আর বাগদাদের কিয়াস অস্বীকারকারী দার্শনিকদের থেকে কিছু বক্তব্য নিয়ে সেগুলোর মাধ্যমে প্রমাণ করে যে কিয়াস এবং ইজতিহাদ অবৈধ। অথচ কিয়াস স্বীকারকারী এবং অস্বীকারকারী কারো বক্তব্যই জানা ছিল না তার। দাউদ নামের এই লোকটি আরেকটু আগে বেড়ে অস্বীকার করে বসে বিবেকের প্রামাণ্যতাকেও। সে দাবি করে, দ্বীনের কোনো বিষয় বিবেকের মাধ্যমে বুঝা সম্ভব নয়। এভাবেই নিজেকে সে নিয়ে যায় চতুষ্পদ জন্তুর কাতারে, বরং তার চেয়ে নিম্নস্তরে। (এই পর্যন্ত শেষ আবু বকর রাযী রহ. রচিত 'ফুসূল' কিতাবের অংশ।)
ইজতিহাদ ও কিয়াসের প্রামাণ্যতাকে খুব সুন্দরভাবে সাব্যস্ত করেছেন আবু বকর রাযী রহ.। কিয়াসের প্রামাণ্যতার বিরুদ্ধে কিছু বলার কোনো সুযোগ রাখেননি তিনি। তো নন্দিত ও প্রশংসিত কিয়াস ও ইজতিহাদ করতে হয় প্রত্যেক ফকিহকেই। যা থেকে বুঝে আসে তাঁর বোধের সূক্ষ্মতা এবং জ্ঞানের গভীরতা। এজন্যই দেখবেন, ইবনে কুতায়বা রহ. নিজ গ্রন্থ 'কিতাবুল মাআরিফে' ফকিহদের আলোচনা এনেছেন 'আসহাবুর রায়' (কিয়াসকারী) শিরোনামের অধীনে। আর ফকিহদের মধ্যে গণ্য করেছেন ইমাম আউযাঈ (৮৮-১৫৭ হি.) সুফিয়ান সাওরি (১০৭-১৯৮ হি.) এবং মালিক ইবনে আনাস (৯৩-১৭৯ হি.) রহ. গণের মতো বড় বড় মুহাদ্দিসকে।
তেমনি মুহাম্মদ ইবনে হারিস খুশানি (মৃত্যু: ৩৬১ হি.) রহ.কে দেখা যায়, নিজের রচিত 'কুযাতু কুরতুবা' গ্রন্থে ইমাম মালিকের শাগরিদদেরকে সম্বোধন করেন 'আসহাবুর রায়' নামে। একই কাজ করেছেন হাফেজ আবুল ওয়ালিদ ইবনে ফারাজি (মৃত্যু: ৪০৩ হি.) তাঁর প্রণীত 'তারিখু উলামাঈল উনদুলুস' কিতাবে। ইরাকে আদ দা-উল উদ্বাল তথা দুরারোগ্য ব্যাধি আছে বলে একটি হাদিস রয়েছে মুআত্তা মালিকে। সেই হাদিসে আদ দা-উল উদ্বাল তথা দুরারোগ্য ব্যাধির ব্যাখ্যায় ইমাম মালেকের সূত্রে বিভিন্ন জন বলেছেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য আবু হানিফা ও তাঁর শাগরেদগণ। এই ব্যাখ্যাকে প্রত্যাখ্যান করে হাফেজ আবুল ওয়ালিদ বাজি (মৃত্যু: ৪৭৪ হি.) বলেন, আমাদের জানামতে, ইমাম মালেক কোনো আহলুর রায় (তথা ফকিহগণের)র সমালোচনা করেননি এখানে। বরং কিছু মুহাদ্দিসগণের বর্ণনাগত দিক নিয়ে সমালোচনা করেছেন তিনি। 'ইনতিত্ত্বা' গ্রন্থে ইবনে আব্দুল বার (মৃত্যু: ৪৬৩ হি.) বলেন, ইমাম আবু হানিফার ব্যাপারে এমন ধরনের সমালোচনা ইমাম মালিকের সূত্রে তাঁর কোনো আহলুর রায় তথা ফকিহ শাগরিদ করেননি। এভাবেই আরো বহু উলামায়ে কেরাম ফকিহগণকে অভিহিত করেছেন যে সব উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই এখানে।
এ থেকেই বুঝা যায়, প্রবৃত্তি পূজা থেকে সৃষ্ট মতামতের নিন্দায় বর্ণিত হাদিসগুলোকে নিয়ে ফকিহগণের ফিকহে ফিট করা ঠিক নয়। তাছাড়া উচিত নয় মানবেতিহাসের শেষ অবধি অনবরত ঘটমান নতুন সৃষ্ট ঘটনাবলিকে কুরআন ও হাদিসের ভাষ্যের সাথে মিলিয়ে তার সমাধান বের করাকে নিন্দিত কিয়াস আখ্যা দেওয়া। এটা নিশ্চয়ই খুবই খারাপ একটি কাজ হবে। যা শরয়ী প্রমাণাদি সমর্থিত নয়।
আর হানাফিদেরকে বিশেষভাবে আহলুর রায় নাম দেওয়া সঠিক হবে কেবল এই অর্থে যে, ইজতিহাদের ক্ষেত্রে রয়েছে তাঁদের সর্বোচ্চ দক্ষতা। কেননা ফিকহ, সেটা মদিনাবাসী চর্চা করুক কিংবা ইরাকবাসী কিয়াসের অবস্থান ছিল সব জায়গাতেই। আর ফকিহগণের মাঝে দলিলভিত্তিক মতানৈক্য রয়েছে শুধু ইজতিহাদের শর্তশারায়েত নিয়ে। এমনিতে কুরআন, হাদিস, ইজমা ও কিয়াস এই চারটি বিষয়ের প্রামাণ্যতা নিয়ে কোনো মতদ্বৈততা নেই তাদের। এগুলোর কোনো একটিতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি তাঁরা। (চারটিই তাঁদের কাছে দলিল রূপে গ্রহণযোগ্য।)
মুহাদ্দিস বলা হয় সেই সব লোককে যারা পারদর্শী শুধু হাদিস বর্ণনায়। ইমাম আ'মাশের (৪৩১-৫১২ হি.) বক্তব্য মতে তাঁরা হলেন, ঔষধ বিক্রেতার মতো আর ফকিহগণ হলেন চিকিৎসকের মতো। তো ফিকহে দুর্বল মুহাদ্দিসরা যখন ফতোয়া দানের দুঃসাহস করলেন তখনই সমস্যা সৃষ্টি হলো এই অঙ্গনে। এমনটাই লিখেছেন হাসান ইবনে আব্দুর রহমান রামাহুরমুযী রহ. নিজের রচিত 'আল মুহাদ্দিসুল ফা-সিল' গ্রন্থে। ইবনুল জাওযি (৫১০-৫৯৭হি.) তাঁর প্রণীত 'তালবিস' এবং 'আখবারুল হুমাক্বা' গ্রন্থ দুটিতেও বলেছেন এটা। খতিবে বাগদাদিও (৩৯২-৪৬৩ হি.) তাঁর গ্রন্থ 'ফকিহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ'তে বলেছেন এরকম কিছু। এরপরে তিনি অনর্থক কিছু মুহাদ্দিসদের নাম উল্লেখ করেছেন সেখানে।
হাম্বলি ফিকহের মূলনীতি সম্পর্কিত 'শরহু মুখতাসারির রাওযাহ' নামক কিতাবে সুলাইমান ইবনে আব্দুল ক্বাভী তুফি রহ. (৬৭১/৭২-৭৩৬ হি.) বলেন, জেনে রাখুন বিধানাবলির বর্ণনায় যারাই নিজ মতামতের সহযোগিতা নেয় তাঁরা সবাই শাব্দিক দিক থেকে আহলুর রায় (কিয়াসকর্তা)। এদিক থেকে সমস্ত উলামায়ে কেরামই এতে অন্তর্ভুক্ত। কেননা কোনো মুজতাহিদই গবেষণার ক্ষেত্রে নিজ মতামত ও চিন্তাকে উপেক্ষা করতে পারেন না। হোক সেই মতামত সর্বসম্মত তাহক্বিকুল মানাত্ব (মূল ভিত্তির বাস্তবায়ন) এবং তানকিহুল মানাত্ব (মূল ভিত্তির পরিমার্জন) রূপে।
(তাহত্ত্বিকুল মানাত্ব [মূলভিত্তির বাস্তবায়ন। এর ব্যাখ্যা দুটি: এক. মূলবিধানটা হবে সর্বসম্মত কিংবা কুরআন, সুন্নাহে উল্লিখিত। তবে সেই বিধানটি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন ইজতিহাদের। যেমন: ইহরামাবস্থায় বন্য গাধা শিকার করলে তার মতো কোনো প্রাণী জবাই করা ওয়াজিব। এটা তো কুরআনের আয়াত ও ইজমা দ্বারা প্রমাণিত। তবে সেই বিধান বাস্ত বায়নের ক্ষেত্রে ইজতিহাদ তথা গবেষণা জরুরি। কেননা সাদৃশ্যপূর্ণ প্রাণী কোনটি তা ইজতিহাদ ছাড়া জানা অসম্ভব। দুই. বিধানের মূল কারণটা প্রমাণিত হবে কুরআন, হাদিস কিংবা ইজমা দ্বারা। অর্থাৎ হুকুমের মূল কারণটা সর্বসম্মত হবে কিংবা কুরআন, হাদিসে বর্ণিত থাকবে। অতঃপর সেই কারণটা অন্য আর কোথায় পাওয়া যায় সেটা বের করবেন মুজতাহিদগণ। যেমন: বিড়ালের ক্ষেত্রে নবিজি বলেছেন, এটি অপবিত্র নয়। কেননা এটা তোমাদের আশপাশে বসবাসকারী প্রাণী। এই হাদিসে বিড়াল নাপাক না হওয়ার স্পষ্ট কারণ বলে দিয়েছেন রসুল। আর তা হল, আশপাশে থাকা। তো এখন মুজতাহিদগণ ইজতিহাদের মাধ্যমে বলে দিবেন, এই 'আশপাশের থাকা'র কারণটা বিদ্যমান ইঁদুর, তেলাপোকা, টিকটিকি ইত্যাদি প্রাণীর মধ্যে। তাহলেই বুঝা যাবে, সেগুলোও পবিত্র। এই 'তাহকিকুল মানাত্ব' জরুরি প্রতিটি শরিয়তের জন্যই। কারণ, প্রত্যেক ব্যক্তি ও বস্তুর বিধান আলাদা করে শরিয়তের মূল ভাষ্যে উল্লেখ থাকা সম্ভব নয়।
আর তানক্বিহুল মানাত্ব [মূলভিত্তির পরিমার্জন] এর ব্যাখ্যা হচ্ছে এই: শরিয়ত প্রণেতা কোনো বিধানকে সম্পৃক্ত করেছে একটি কার্যকারণের দিকে। তবে সেই বিধানের সাথে মিলে আছে আরো বিভিন্ন অবস্থা। বিধানের ক্ষেত্রে যেগুলোর কোনো প্রভাব নেই। মুজতাহিদকে চিহ্নিত করতে হবে সেই অপ্রভাবক অবস্থাগুলো। তাহলেই বিধানটা হবে ব্যাপক ও সামগ্রিক। যেমন: একজন গ্রাম্য ব্যক্তি এসে বলল, হে আল্লাহর রসুল। আমি ধ্বংস হয়ে গেছি। নবিজি জিজ্ঞেস করলেন, কী করেছ তুমি? সে বলল, রমজানের দিনের বেলায় স্ত্রী সংগম করে ফেলেছি আমি। রসুল বললেন, কাফফারা স্বরূপ একটি ক্রীতদাস আজাদ করে দাও।
এই হাদিসে রমজানের দিনের বেলায় স্ত্রী সংগমের কারণে বিধান এসেছে ক্রীতদাস আজাদ করে দেওয়ার। তবে এখানে কিন্তু অন্যান্য অবস্থাও আছে। শরিয়তের গতিপ্রকৃতি ও অন্যান্য বিধানের আলোকে সেগুলো খুঁজে বের করতে হবে মুজতাহিদের। যেমন: এখানে প্রশ্নকারী ছিল গ্রাম্য ব্যক্তি। তবে বিধান কেবল তার সাথেই সম্পৃক্ত নয়। কারণ, আমরা জানি, শরিয়তের বিধান নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির প্রেক্ষিতে আসে না। বরং সেটা হয় আ'ম তথা ব্যাপক।)
তবে খলকে কুরআনের ফেতনার (কুরআন আল্লাহর সৃষ্টি নাকি নয় এ নিয়ে বিরাট বিতর্ক তৈরি হয়েছিল দ্বিতীয় হিজরি শতাব্দীতে।) পর থেকে মুহাদ্দিগণের পরিভাষায় 'আহলুর রায়' নাম দেওয়া হয় ইমাম আবু হানিফা এবং তাঁর অনুসারী কুফাবাসীদেরকে।
ইমাম আবু হানিফার সমালোচনার ক্ষেত্রে খুব বাড়াবাড়ি করেছে কোনো কোনো মুহাদ্দিস। আল্লাহর শপথ! যেসব সমালোচনা তারা করেছে ইমাম আবু হানিফার এবং যে অপবাদগুলো তাঁকে দিয়েছে সেগুলো থেকে তাঁকে একেবারেই পবিত্র ও মুক্ত মনে করি আমি। ইমাম আবু হানিফার ব্যাপারে সঠিক কথা হলো, নিশ্চয়ই তিনি বিদ্বেষবশত কোনো হাদিসের বিরোধিতা করেননি। যেসব হাদিসের বিপরীত মত তিনি দিয়েছেন সেটা ছিল ইজতিহাদি কারণে। বিপরীত মতপোষণের পেছনে তাঁর কাছে আছে সুস্পষ্ট ও বিশুদ্ধ দলিল প্রমাণাদি। সেই দলিলগুলো বর্তমানে মানুষের হাতে হাতে বিদ্যমান। কিন্তু বিরোধীরা খুব কমই ইনসাফ দেখিয়েছে তাঁর প্রতি। ইজতিহাদের ক্ষেত্রে তিনি ভুল করলেও পাবেন একটি সওয়াব। আর সঠিক করলে প্রাপ্ত হবেন দুটি সওয়াব। যারা তাঁকে তিরস্কার করে তারা হয় হিংসুটে আর না হয় ইজতিহাদ সম্পর্কে অজ্ঞ। আর বিশুদ্ধ বর্ণনানুযায়ী, ইমাম আবু হানিফা রহ.র ব্যাপারে ইমাম আহমদের সর্বশেষ বক্তব্য ছিল ভালো এবং প্রশংসামূলক। এমনটাই 'উসুলুদ দ্বীন' নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন হাম্বলি আলেম আবুল ওয়ারদ রহ.। আল্লামা শিহাব ইবনে হাজার শাফেয়ি রহ. (৯০৯-) তাঁর প্রণীত 'খাইরাতুল হিসান' গ্রন্থের ২৯ নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন, "শাফেয়ি মাযহাবাবলম্বী উত্তরসূরি উলামায়ে কেরাম আবু হানিফা ও তাঁর
অনুসারীদেরকে অভিহিত করেন 'আসহাবুর রায়' নামে। এ থেকে আপনার এটা বোঝার সুযোগ নেই যে, তাঁরা সমালোচনা করছেন হানাফিদের। এটা মনে করাও সঠিক হবে না, 'আসহাবুর রায়' বলে তাঁরা এই অপবাদ দিচ্ছেন যে, রসুলের সুন্নত এবং সাহাবিদের বক্তব্যের উপর নিজেদের মতামতকে প্রাধান্য দেয় হানাফিরা। কেননা তাঁরা তো এসব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।" এরপর তিনি উল্লেখ করেন, আবু হানিফা এবং তাঁর অনুসারীদের ফিকহ চর্চার পথ ও পদ্ধতি। সেটা হচ্ছে, প্রথমে কুরআন থেকে দলিল খোঁজা। এরপর হাদিস থেকে, এরপর সাহাবায়ে কেরামের বক্তব্য থেকে দলিল নেওয়া। এই আলোচনার মাধ্যমে তিনি হানাফি বিরোধীদের জবাব দিয়েছেন।
আমি অস্বীকার করছি না, কিছু যোগ্য মুহাদ্দিসগণও সমালোচনা করেন ফকিহগণের বিশেষত আবু হানিফা এবং তাঁর অনুসারীদের। তার কারণ হচ্ছে, হানাফিরা এমন কিছু হাদিস বর্জন করেছেন যেগুলোর ত্রুটি সম্পর্কে অবগত নয় তারা। তাদের ধারণা হানাফিরা সেই হাদিস বাদ দিয়ে গ্রহণ করে নিয়েছেন নিজস্ব মতামত। আবার অনেক সময় দলিল থেকে মাসআলা বের করার ক্ষেত্রে হানাফিদের মূল পয়েন্টটাই ধরতে পারে না তারা। এর কারণ হচ্ছে, তাদের নিজেদের নির্বুদ্ধিতা এবং হানাফিদের সূক্ষ্মতা। শেষে হতাশ হয়ে ফুকাহায়ে কেরামকে এই বলে তিরস্কার করে, তারা হাদিস বাদ দিয়ে কিয়াসকে প্রাধান্য দেয়। এই দোষারোপে অবশ্য কারোর কিছু যায় আসে না। তারা নিজেরাই কষ্ট পায় শুধু।
কিয়াসের আরেকজন ঘোরবিরোধী আছেন। নাম তার ইবনে হাযম যাহিরি (৩৮৪-৪৫৬ হি.)। কোনো রকম কিয়াসকেই স্বীকার করেন না তিনি। কিয়াসের প্রবক্তা অন্য সকল ইমামদের মতো হানাফিরাও ছিলেন তার সমালোচনার লক্ষ্যবস্তু। 'আওয়াসিম ওয়াল ক্বাওয়াসিম' কিতাবে আবু বকর ইবনুল আরাবি (৪৬৮-৫৪৩ হি.) সেই ইবনে হাযম যাহিরির শক্ত জবাব দিয়েছেন। কিয়াস অস্বীকারের স্বপক্ষে ইবনে হাযম যাহিরির দলিল নেই কোনো। এক্ষেত্রে তিনি আশ্রয় নিয়েছেন অনুমানের। অস্বীকার করেছেন কিয়াসের প্রামাণ্যতা প্রসঙ্গে সাহাবায়ে কেরাম থেকে প্রমাণিত বক্তব্যগুলোকে। আর কিয়াসের বিপক্ষে বর্ণিত দুর্বল বর্ণনাগুলোকে বিশুদ্ধ প্রমাণিত করার দুঃসাহস দেখিয়েছেন।
একটি আশ্চর্যের বিষয় হলো, আজকাল আলেমদের সোহবত বঞ্চিত জনৈক পত্রিকাওয়ালা নিজের পত্রিকাকে বানিয়েছে অদ্ভুত এক মতাদর্শের দিকে আহ্বানের প্ল্যাটফর্ম। যেই মতাদর্শের নেই কোনো মৌলিক ভিত্তি এবং পরিণাম। দশ বছর পূর্বে 'উসূলুত তাশরীঈল আ-ম' নামে একটি পুস্তিকা লিখেছিল সে। সেখানে সে একত্রিত করেছিল কিয়াস অস্বীকারের ক্ষেত্রে ইবনে হাযমের মতামতগুলো। পাশাপাশি কিয়াস প্রবক্তাদেরও কিছু মতামত নিয়ে এসেছিল সে। তবে তা উপস্থাপনের পদ্ধতি অনুসরণীয় ইমামদের মতো ছিল না। এছাড়াও সেই পুস্তিকায় আরও কিছু বিচ্ছিন্ন মতামত জমা করেছিল সেই লোক। তার সে নিজের মতাদর্শের ভিত্তি ছিল স্রেফ নিজের ভালোলাগা। (অর্থাৎ যেটাকে তার ভালো মনে হতো সেটাই নিজের মতাদর্শ রূপে সে গ্রহণ করত।) হোক সেটা কুরআন ও হাদিসের সুস্পষ্ট বিপরীত। এভাবেই সে একত্রিত করেছিল কিছু পরস্পর বিরোধী মূলনীতি। যার থেকে বের হয় পরস্পরবিরোধী কিছু মাসআলা। এ ধরনের কাণ্ড অস্থির প্রকৃতির কারো দ্বারাই কেবল সম্ভব। তার এই প্রচেষ্টাটা ছিল গরু বা অন্য কোনো প্রাণীর পেট থেকে মানুষ জন্ম দেওয়ার মতো একটি প্রচেষ্টা।
আপনি দেখবেন কিয়াস অস্বীকার করতে গিয়ে ইবনে হাযম দলিল দিয়েছেন নুআইম ইবনে হাম্মাদ বর্ণিত হাদিস দ্বারা। যে নুআইমের বর্ণনা অধিকাংশ রাবি বিশেষজ্ঞদের মতে অগ্রহণযোগ্য। ইবনে হাযমের সে সম্পর্কে খবরই নেই। অথচ প্রাচ্যের ছোট ছোট মুহাদ্দিসেরাও এই বিষয়টা জানে। নুআইম বর্ণিত হাদিসটি হলো এই: নবিজি বলেন, ৭২র চেয়ে বেশি দলে বিভক্ত হয়ে যাবে আমার উম্মত। তন্মধ্যে সবচেয়ে বেশি গোমরাহ হবে সেই দল যারা শরিয়তের বিধানকে কিয়াস (তুলনা) করবে নিজস্ব মতামত দিয়ে।... (মুসনাদে বাযযার: ২৭৫৫) তাছাড়া উক্ত হাদিসের সনদে হারিষ (মৃত্যু: ১৬৩ হি.) নামের বিদআতি এক রাবিও আছে। যদিও সেই নব্য গবেষক পত্রিকাওয়ালা লোকটি এই 'হারিয'কে লিখেছে জারির! এমনকি ইবনে হাযমের চেয়ে আগ বেড়ে আরো একটি দলিল পেশ করেছে সে। সেটি হলো এই হাদিস: বনি ইসরাঈলের যাবতীয় সবকিছুই ঠিকঠাক চলছিল। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে আত্মপ্রকাশ করল বিজাতীয় বা লুণ্ঠনকৃত নারীর সন্তানেরা। তারা নিজেদের মতানুযায়ী রায় প্রদান করে নিজেরাও পথভ্রষ্ট হয় এবং অন্যদেরকেও পথভ্রষ্ট করে। (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৫৬) এই হাদিসটি সেই পত্রিকাওয়ালার মতে 'হাসান' পর্যায়ের। অথচ এই হাদিসের সনদে সুওয়াইদ (মৃত্যু: ৮১ হি.) নামের এক লোক রয়েছে। তার সম্পর্কে ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন (১৫৮-) বলেন, তাকে হত্যা করা হালাল। আর ইমাম আহমদ বলেছেন, তার বর্ণিত হাদিস পরিত্যজ্য। রাবিদের সমালোচনায় অত্যন্ত শিথিল শিহাব বৃসিরি রহ. ও তাকে যঈফ সাব্যস্ত করেছেন নিজের রচিত 'মিসবাহুয যুজাজাহ' কিতাবে।
তাছাড়া উপরোক্ত হাদিসের সনদে আছেন ইবনু আবির রিজাল নামের আরেক রাবি। ইমাম নাসাঈর মতে যিনি হলেন পরিত্যজ্য এক রাবি। আর বুখারির মতে মুনকার তথা অপছন্দনীয়।
অনেকে মনে করে, ফকিহগণ দুই ভাগে বিভক্ত। আহলুর রায় এবং আহলুল হাদিস। মূলত এর কোনো ভিত্তি নেই। এটা বিচ্ছিন্ন কিছু উত্তরসূরিদের ধারণা মাত্র। যেটা তারা পেয়েছে খলকে কুরআনের ফেতনার পরে আবির্ভূত কিছু জাহিল রাবির বক্তব্য থেকে। আর ইবরাহিম নাখঈ এবং তাঁর সমাপর্যায়ের কিছু লোক যে বলেছেন, আহলুর রায় হলো সুন্নতের শত্রু। এখানে 'আহলুর রায়' দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, সেই সমস্ত লোক যারা যুগ পরম্পরায় চলে আসা সুন্নাহসম্মত আকিদার বিপরীতে নিজস্ব মতপোষণ করে। তারা হচ্ছে, খারেজি, ক্বাদরিয়্যাহ, মুশাব্বিহাহ ইত্যাদিসহ নতুন সৃষ্ট বিভিন্ন ভ্রান্ত দল। (আলি রা.র বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদেরকে বলা হয় খারেজি। ভাগ্য অস্বীকারকারীদেরকে বলা হয় ক্বাদরিয়্যাহ। আল্লাহকে যারা সৃষ্টিজীবের সাথে তুলনা দেয় সেই গ্রুপের নাম হলো মুশাব্বিহাহ।)
শাখাগত বিভিন্ন মাসআলায় ইজতিহাদকারীগণ উনাদের বক্তব্য দ্বারা উদ্দেশ্য নন। উনাদের বক্তব্য থেকে কেউ এমনটা বুঝলে সেটা হবে বাক্যের প্রায়োগিক বিকৃতি। তাছাড়া এমন উদ্দেশ্য কী করে হতে পারে, যেখানে এই কথার প্রবক্তা ইবরাহিম নাখঈ এবং সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (মৃত্যু: ৯৩ হি.) নিজেই ছিলেন শাখাগত মাসআলায় কিয়াসকারী। বিরুদ্ধবাদীদের জন্য যদিও এটা খুবই কষ্টের খবর। কিন্তু এটাই সত্য। কিয়াসের স্বপক্ষে সাহাবায়ে কেরাম থেকে বর্ণিত সব বর্ণনা মিথ্যা সাব্যস্ত করতে চেয়েছেন ইবনে হাযম যাহিরি। বিশেষত ওমর রা. বর্ণিত একটি হাদিসকে মিথ্যা বলতে চেয়েছেন তিনি। অথচ সেই হাদিসটি উমর রাদিয়াল্লাহুর থেকে কাছাকাছি শব্দে একাধিক সূত্রে বর্ণনা করেছেন খতিবে বাগদাদি রহ.সহ আরো অনেকে। তেমনি অন্যান্য সাহাবি থেকেও বর্ণিত আছে সেটি।
খতিবে বাগদাদি তাঁর রচিত 'ফকিহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ' কিতাবে কিয়াসের স্বপক্ষে মুআয রা. (মৃত্যু: ১৮ হি.) বর্ণিত হাদিস উল্লেখ করে বলেন, হারিস ইবনে আমরের উচ্চারিত "মুআযের একাধিক শাগরিদ থেকে বর্ণিত" বাক্য থেকে বুঝা যাচ্ছে, হাদিসটি প্রসিদ্ধ এবং এর বর্ণনাকারী অনেক। আর মুআযের শ্রেষ্ঠত্ব ও দুনিয়াবিমুখতা তো প্রসিদ্ধ। তাঁর শাগরিদরাও স্বাভাবিকত দ্বীনদার ও নির্ভরযোগ্য এবং দুনিয়াবিমুখ ও নেককারই হবে।
কেউ কেউ বলেন, এই হাদিসটি উবাদাহ ইবনে নুসাঈ আব্দুর রহমান ইবনে গান্মের সূত্রে মুআয থেকে বর্ণনা করেছেন। আর এই সনদটি মুত্তাসিল। (অবিচ্ছিন্ন) এই সনদের সকল রাবিগণ নির্ভরযোগ্যতায় প্রসিদ্ধ। তাছাড়া উলামায়ে কেরামও এই হাদিসটি গ্রহণ করে দলিল দিয়েছেন এর মাধ্যমে। এ থেকেই আমরা বুঝতে পারি, হাদিসটি তাদের নিকট বিশুদ্ধ।"
এরকমই বরং এর চেয়েও আরো পরিপূর্ণ বক্তব্য রয়েছে আবু বকর রাযী প্রণীত 'ফুসূল' গ্রন্থে। কিয়াস অস্বীকারকারীদের সম্পর্কে তাঁর কিছু বক্তব্যও আমি তুলে ধরেছি ইতোপূর্বে। এখানে আর এই কিয়াস নিয়ে লম্বা কথা বলার সুযোগ নেই। যতটুকু বলেছি ততটুকুই যথেষ্ট হবে ইনশাআল্লাহ। কিয়াসের স্বপক্ষে বর্ণিত হাদিসগুলোর সনদ সম্পর্কে আরও বিশদভাবে কেউ জানতে চাইলে সে আবু বকর রাযি প্রণীত 'ফুসূল' এবং খতিবে বাগদাদি রচিত 'ফকিহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ' পাঠ করতে পারে। তাহলেই সে বুঝতে পারবে কিয়াস অস্বীকার করতে গিয়ে হাদিস সম্পর্কে যাহিরীদের অনুমানভিত্তিক কথাবার্তার প্রকৃত রূপ।
ইসতিহসান
ইলমের সাথে নিবিড় সম্পর্কহীন অবুঝ কিছু লোকের ধারণা হলো, জনগণ যা চায় এবং কামনা করে সে অনুযায়ী হুকুম বলে দেওয়াটাই হচ্ছে হানাফিদের মতে ইসতিহসান। এমনকি ইবনে হাযম যাহিরি তাঁর 'ইহকাম' কিতাবে ইসতিহসানের সংজ্ঞা দিয়েছে এভাবে, "ইসতিহসান হলো সেই হুকুম যেটা মনের চাহিদা এবং প্রবৃত্তির অনুগামী হবে। সেই হুকুমটা ভুলও হতে পারে সঠিকও হতে পারে।" অথচ ইসতিহসানের এমন সংজ্ঞা আজ পর্যন্ত কোনো ফকিহই দেননি। সত্যিই যদি হানাফিরা ইসতিহসান বলতে এমন কিছু বুঝতেন তাহলে বিরোধীদের তিরস্কার ও প্রত্যুত্তরের যোগ্য হতেন তারা। (কিন্তু ইসতিহসান মানে তো এমন কিছু নয় হানাফিদের নিকট।) তবে বিরোধীদের মানসিকতা নষ্ট হয়ে গেছে। তাদের জ্ঞানবুদ্ধি সব উড়ে গেছে। তা-ই তো তারা তির তাক করেছে হানাফিদের দিকে। যে তির আবার ফিরে যাচ্ছে তাদেরই দিকে। এটার কারণ হলো, হানাফিদের উদ্দেশ্য এবং শুধু এই অধ্যায়ের অতিসূক্ষ্মতা বুঝতে না পারা।
কিয়াসের প্রবক্তাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে হানাফিদের উদ্দিষ্ট ব্যাখ্যানুযায়ী ইসতিহসান করে না। ইসতিহসানকে দলিল হিসেবে ধরার অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে সব মাযহাবেই। সেগুলো উল্লেখের জায়গা এটা নয়। (তা-ই উল্লেখ করলাম না।) আর ইমাম শাফেয়ী যে ইসতিহসানকে বাতিল সাব্যস্ত করেছেন সেটা তার লেখার স্খলন মাত্র। কেননা ইসতিহসানকে বাতিল সাব্যস্তকরণে তার উপস্থাপিত দলিলগুলোকে সঠিক ধরলে সেগুলো প্রথমেই খাটে কিয়াসের ক্ষেত্রে। অথচ কিয়াস তো তার মতে বিশুদ্ধ। (তা-ই তাঁর ইসতিহসান বাতিল সাব্যস্ত করণটাকে তাঁর লেখার স্খলনই ধরতে হবে।)
ইবরাহিম ইবনে জাবিরের ঘটনাটি এ সংক্রান্ত একটি মজার ঘটনা। সেটা হলো, আব্বাসী খলিফা মুত্তাকি লিল্লাহর আমলে একজন বড় বিচারক শাফেয়ি মাযহাব ছেড়ে যাহিরী মাযহাব গ্রহণের কারণ জানতে চাইলেন তাঁর কাছে। তিনি উত্তরে বললেন, ইসতিহসানকে বাতিল সাব্যস্তকরণে ইমাম শাফেয়ির উপস্থাপিত দলিলগুলোকে সঠিক মনে হয়েছে আমার কাছে। তবে হুবহু সেই দলিলগুলো দ্বারা বাতিল সাব্যস্ত হয় কিয়াসও। তা-ই সেই দলিলসমূহের আলোকে আমার কাছে কিয়াসকেও বাতিল মনে করা সঠিক মনে হয়েছে। (ফলে কিয়াস অস্বীকারকারী যাহিরি হয়ে গেছি আমি।) মূলত তিনি এমন মাযহাবে থাকতে চাননি যে মাযহাবের মূলনীতিগুলো পরস্পরবিরোধী। তাই তিনি সেই মাযহাব গ্রহণ করে নেন যেখানে বাতিল মনে করা হয় কিয়াস ও ইসতিহসান উভয়টাকেই।
আসলে কিয়াস ও ইসতিহসান উভয়টাই ভালো জিনিস। সমর্থকরা এ দুটোর যে ব্যাখ্যা করেন সে অনুযায়ী কোনোটাই বাতিল সাব্যস্ত হয় না। ইসতিহসানের ব্যাপারে কিয়াস সমর্থকদের মাঝে যে মতবিরোধ রয়েছে তা শুধু শাব্দিক। (অর্থগত দিক থেকে কোনো বিরোধ নেই তাদের মাঝে।) এখানে আবু বকর রাযি প্রণীত 'ফুসূল' থেকে ইসতিহসানসংক্রান্ত কিছু আলোচনা তুলে ধরতে চাই আমি। কেননা আমার জানা মতে এ বিষয়ে সবচেয়ে বোধগম্য সুন্দর আলোচনা করেছেন তিনিই। 'ফুসূল' গ্রন্থের ইসতিহসান অধ্যায়ে তিনি বলেন, যে সমস্ত মাসআলায় উলামায়ে কেরাম ইসতিহসানের কথা বলেছেন সেখানে দলিল, প্রমাণের ভিত্তিতেই বলেছেন। মানুষের চাহিদা ও কামনার ভিত্তিতে নয়। ইসতিহসান সমৃদ্ধ মাসআলাগুলোতে দলিল উপস্থাপনের পথ ও পন্থাসমূহের আলোচনা পাওয়া যাবে আমাদের ইমামগণের লিখিত কিতাবের ব্যাখ্যায় আমাদের রচিত ব্যখ্যাগ্রন্থগুলোতে। এখানে আমরা এমন কিছু কথা আলোচনা করব যেটা পড়লে ইসতিহসান সম্পর্কে উলামায়ে কেরামের মূল বক্তব্যটা সম্পর্কে জানা হয়ে যাবে।
প্রথমেই 'ইসতিহসান' শব্দটি ব্যবহারের বৈধতা প্রসঙ্গে কিছু কথা বলব আমরা। আর তা হচ্ছে এই: আল্লাহ তাআলা দলিলের আলোকে যেটাকে সুন্দর ও উত্তম সাব্যস্ত করেন সেটাকে বলা হয় মুসতাহসান। (অর্থাৎ যাকে উত্তম সাব্যস্ত করা হয়েছে।) তা-ই আমরাও সঠিকতার দলিল সমৃদ্ধ বিষয়ে 'ইসতিহসান' (তথা উত্তম সাব্যস্ত করা) শব্দ প্রয়োগ করতেই পারি। আল্লাহ তাআলাও বলেছেন উত্তম ও সুন্দরের উপর আমল করতে। আর হেদায়েত অপরিহার্য করে দিয়েছেন তেমন আমলকারীর জন্য। আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন, (অর্থ) (হে নবি! আপনি সুসংবাদ দিন আমার সেই সকল বান্দাকে যারা মনোযোগ সহকারে কথা শোনে। অতঃপর যা উত্তম, তার অনুসরণ করে। তাদেরকেই আল্লাহ সৎপথ প্রদর্শন করেন এবং তারাই বুদ্ধিমান। (সুরা যুমার: ১৮)
বর্ণিত আছে, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, মুসলমানরা যেটাকে উত্তম মনে করে আল্লাহর কাছেও সেটা উত্তম। আর তারা যেটাকে খারাপ মনে করে আল্লাহর কাছেও খারাপ সেটা। (আল মু'জামুল আওসাত্ব: ৩৬০২) তো কুরআন ও হাদিসে এই 'ইসতিহসান' শব্দ ব্যবহারের একটা দলিল যখন আমরা পেয়ে গেলাম তখন দলিলসমৃদ্ধ কোনো বিষয়ে এটা ব্যবহার করতে আর কোনো বাধা রইল না। সুতরাং এই শব্দটাকে ব্যবহার করা যাবে শাব্দিক এবং পারিভাষিক উভয় দিক থেকেই।
ইসতিহসান বিরোধীদের আপত্তি এই শব্দ নিয়েও থাকতে পারে। আবার এর ব্যাখ্যা নিয়েও থাকতে পারে তাদের ঘোর বিরোধিতা। আপত্তিটা যদি শব্দকেন্দ্রিক হয়ে থাকে তাহলে আমরা বলব, শব্দের ক্ষেত্রে ছাড় আছে। নিজ ইচ্ছামত যেকোনো শব্দই ব্যক্ত করতে পারে সে। শব্দকেন্দ্রিক বিরোধিতার কোনো মানে নেই। কারণ, যেকোনো বিষয় নিজ ইচ্ছামত বোধগম্য কোনো শব্দে ব্যক্ত করার অধিকার প্রত্যেকেরই রয়েছে। বিশেষত শরিয়ত এবং ভাষাগত দিক থেকে অর্থের সাথে মানানসই শব্দ হলে তো কথাই নেই। মানুষ তো নিজের কথা অনেক সময় আরবিতেও ব্যক্ত করে। আবার ফারসিতে করে। এটাকে তো আমরা দোষণীয় মনে করি না।
আর এই 'ইসতিহসান' শব্দটিকে বহু ক্ষেত্রেই ব্যবহার করেছেন ফুকাহায়ে কেরাম। ইয়াস ইবনে মুআবিয়া (মৃত্যু: ১২১ হি.) বর্ণিত, তিনি বলেন, জনগণ যতদিন সৎ থাকবে ততদিন সমাধানের ক্ষেত্রে কিয়াসের আশ্রয় নিবে। এরপর যখন মানুষ নষ্ট হয়ে যাবে তখন আশ্রয় নিবে ইসতিহসানের। (যেন সহজতর সমাধান বের হয়ে আসে।) মালিক ইবনে আনাস রহ.র কিতাবাদিতেও পাওয়া যায় এই 'ইসতিহসান' শব্দের ব্যবহার। ইমাম শাফেয়ি রহ. (১৫০-২০৪ হি.) বলেছেন, মুতআ (সহবাসের পূর্বেই স্ত্রীকে তালাক দিলে আর মোহর নির্ধারিত না থাকলে তাকে যা দিতে হয়।) ৩০ দিরহাম হওয়াটা 'ইসতিহসান' তথা ভালো মনে করি আমি। আমাদের উপরোক্ত আলোচনার মাধ্যমে শব্দকেন্দ্রিক আপত্তির সুযোগ আর রইল না।
পক্ষান্তরে ইসতিহসান বিরোধীদের আপত্তি এর ব্যাখ্যাকেন্দ্রিক হয়ে থাকলে তো দলিল ছাড়া আমাদের কোনো ব্যাখ্যা তারা মানবেন না। ইসতিহসানের যে ব্যখ্যাগুলো আমাদের ইমামগণ সমর্থিত সেই সবই বিশুদ্ধ দলিল প্রমাণ সমৃদ্ধ।
ইসতিহসানের ব্যাখ্যা মোট দুটি:
১. আমাদের মতামতের উপর ছেড়ে দেওয়া পরিমাণ নির্ধারণে ইজতিহাদ ও গবেষণা চালানো। তেমনি কয়েকটি পরিমাণের কথা তুলে ধরা হলো এখানে:
ক. তালাক প্রাপ্তা নারীদের মুতআর পরিমাণ।
আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন, (অর্থ) তোমরা তাদেরকে (স্ত্রীদেরকে কিছু) উপহার দিয়। সচ্ছল ব্যক্তি দিবে নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী এবং অসচ্ছল ব্যক্তি নিজ সাধ্যানুযায়ী। এ উপঢৌকন উত্তম পন্থায় দিয় তোমরা। এটা নেককার লোকদের কর্তব্য। (সুরা বাকারা: ২৩৬) তো এখানে মুতআ ওয়াজিব করা হয়েছে ব্যক্তির সামর্থ্য পরিমাণ। আর সেই পরিমাণটা জানা যাবে কেবল ইজতিহাদ এবং গবেষণার
মাধ্যমে।
খ. স্ত্রীদের ভরণপোষণের পরিমাণ। আল্লাহ পাক বলেছেন, (অর্থ) শিশুর পিতার দায়িত্ব হলো, তাদের (শিশুর মায়ের) ন্যায়সংগত ভরণপোষণের ব্যবস্থা করা। (সুরা বাকারা: ২৩৩) ন্যায়সংগত ভরণপোষণের পরিমাণ নির্ধারণের দায়িত্বটা কিন্তু ছেড়ে দেওয়া হয়েছে আমাদের হাতে। আর সেটা নির্ধারণের একমাত্র উপায় হচ্ছে ইজতিহাদ করা।
গ. জরিমানার পরিমাণ নির্ধারণ। আল্লাহ তাআলা বলেন, (অর্থ) তোমাদের মধ্যে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে এটা (শিকার-জন্ত) হত্যা করলে তার বিনিময় প্রদান ওয়াজিব হবে, যা হতে হবে নিহত জন্তুর অনুরূপ। যার ফয়সালা করবে তোমাদের মধ্যে দুজন ন্যায়বান লোক। বিনিময়ের জন্তুটি উৎসর্গ হিসেবে পৌঁছাতে হবে কা'বায়। অথবা তার কাফফারা হবে দরিদ্রকে খাদ্য দান করা কিংবা সমসংখ্যক সিয়াম পালন করা। (সুরা মায়িদা: ৯৫)
এই আয়াতে 'নিহত জন্তুর অনুরূপ বিনিময়' মানে সেই জন্তুর মতোই আরেকটা জন্তু হতে পারে। অথবা তার সমপরিমাণ মূল্যও হতে পারে। ফুকাহায়ে কেরামে মতবিরোধ রয়েছে এই ক্ষেত্রে। যেটাই হোক সেটা নির্ধারণ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দুইজন ন্যায়বান লোককে। তারা ইজতিহাদ ও গবেষণা করে বের করবে সেটা। এছাড়াও যেসব অপরাধের জরিমানার পরিমাণ উল্লেখ নেই কুরআন কিংবা হাদিসে, এমনকি তার পরিমাণ নির্ধারণে নেই কোনো ঐক্যবদ্ধ মতামত, সেগুলো নির্ধারণের একমাত্র পদ্ধতি ইজতিহাদ। ইসলামি আইনশাস্ত্রে এমন দৃষ্টান্ত অসংখ্য রয়েছে। এখানে আমরা একটি দৃষ্টান্তই উল্লেখ করলাম শুধু। এধরনের ইজতিহাদকে ইসতিহসান নাম দিয়েছেন আমাদের বিজ্ঞ উলামায়ে কেরাম। ইসতিহসানের এই ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে কোনো ফকিহেরই মতদ্বৈততা নেই। সম্ভবও নয় সেটা।
২. ইসতিহসানের আরেকটি ব্যাখ্যা হলো, কিয়াস ছেড়ে আরো উত্তম কিছুর দিকে যাওয়া। এটি আবার দুই প্রকার:
ক. শাখাগত একটি মাসআলাকে মৌলিক দু'ধরনের মাসআলার সাথে মিলানোর সুযোগ থাকা। আর উভয় মৌলিকের সাথেই সেই শাখা-মাসআলার সাদৃশ্য থাকা। এমন ক্ষেত্রে আবশ্যক হলো, সেই শাখা- মাসআলাকে দলিলের আলোকে যেকোনো একটির সাথে সংযুক্ত করা। উলামায়ে কেরাম এটাকে ইসতিহসান নামে অভিহিত করেছেন। ইসতিহসান বলার কারণ হলো, যদি সেই মাসআলার সাদৃশ্য দুটির সাথে না থেকে একটির সাথে থাকত তাহলে তার সাথে সংযুক্ত করাই আবশ্যক হয়ে যেত। (সেক্ষেত্রে এটাকে বলা হতো কিয়াস) শাখা-মাসআলার মধ্যে এই ধরনের ইসতিহসান সমৃদ্ধ মাসআলার সঠিক সমাধান বের করাই সবচাইতে জটিল ও কুটিল। কারণ এ ধরনের ক্ষেত্রে কোনো একটি দিক প্রাধান্য দিতে গিয়ে প্রয়োজন পড়ে প্রচুর চিন্তাভাবনা, ধীর স্থিরতা আর গভীর অধ্যাবসার।
এধরনের একটি মাসআলার বিবরণ নিম্নরূপ:
এক লোক তার স্ত্রীকে বলল, ঋতুবতী হলেই তুমি তালাক। পরে সেই স্ত্রী বলল, আমি ঋতুবতী হয়েছি। এই মাসআলায় কিয়াসের চাহিদা হলো, মহিলার ঋতুবতী হওয়াটা ভিন্নভাবে প্রমাণিত না হলে কিংবা স্বামী তার কথা সমর্থন না করলে তাকে সত্যবাদী ধরা হবে না। (অর্থাৎ তাকে ঋতুবতী ধরে তালাক পতিত হয়েছে, বলা যাবে না।)
তবে আমরা এই ক্ষেত্রে ইসতিহসানের ভিত্তিতে তালাক হয়েছে বলে ফতোয়া দেই। ইমাম মুহাম্মাদ বলেছেন, এই ইসতিহসানে কিছুটা কিয়াসকেও অন্তর্ভুক্ত করি আমরা।
আবু বকর রাযি বলেন, কিয়াসের চাহিদা অনুযায়ী সেই স্ত্রীর কথা সত্যায়িত না হওয়ার কারণ হলো, ঐকমত্যপূর্ণ একটি মৌলিক মাসআলার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে, এ ধরনের অবস্থায় তালাক পতিত হওয়ার ক্ষেত্রে স্ত্রীর কথা সত্যায়িত হয় না। সেই ঐকমত্যপূর্ণ মৌলিক মাসআলাটি হচ্ছে এই:
কেউ তার স্ত্রীকে বলল, তুমি ঘরে প্রবেশ করলে তালাক। অথবা বলল, যায়েদের সাথে কথা বললে তুমি তালাক। পরে এক সময় স্ত্রী বলল, আমি ঘরে প্রবেশ করেছি অথবা যায়েদের সাথে কথা বলেছি। কিন্তু স্বামী মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করে তাকে। তাহলে সেই মহিলার কথাকে সত্য ধরে তালাক পতিত হয়েছে বলে হুকুম দেওয়া যাবে না। হ্যাঁ, ভিন্ন কোনো প্রমাণ বা স্বামীর স্বীকারোক্তির মাধ্যমে সেই কাজগুলো ঘটেছে বলে প্রমাণিত হয় তখন তালাক পতিত হওয়ার ফতোয়া দেওয়া যাবে।
এই মাসআলা হিসেবে তো ঋতুবতী হওয়ার ক্ষেত্রেও সেই স্ত্রীর কথা গ্রহণযোগ্য না হওয়াটাই কিয়াসের দাবি। (কারণ, উভয়টা একই ধরনের মাসআলা। কিয়াস তথা তুলনার ভিত্তিতে ভয় তার একই হুকুম হওয়া উচিত।)
এই দাবিটা কিন্তু রক্ষা হয়েছে নিম্নোক্ত ক্ষেত্রগুলোতে:
কেউ তার স্ত্রীকে বলল, তুমি ঋতুবতী হলে আমার দাস আজাদ। অথবা বলল, আমার অন্য এক স্ত্রী তালাক। পরে যদি সেই মহিলা বলে, আমি ঋতুবতী হয়েছি। কিন্তু স্বামী সেটাকে সমর্থন না করে তাহলে তার দাস আজাদ হবে না। কিংবা অন্য স্ত্রীও তালাক হবে না।
তো 'ঋতুবতী হলেই তুমি তালাক।' এই মাসআলাটিও তো উপরোক্ত মাসআলাগুলোর মতোই। (তা-ই হুকুমও একই হওয়ার কথা।) যদি এই মাসআলার সাদৃশ্য শুধু উপরোক্ত মাসআলাগুলোর সাথেই থাকত তাহলে সেগুলোর সাথে মিলিয়ে একই হুকুম দেওয়া যেত এখানেও। কিন্তু এই মাসআলাটি আরেকটি মৌলিক মাসআলার সাথেও মিল রাখে। সেই কারণে পূর্বোক্ত মাসআলাগুলোর সাথে এটিকে না মিলিয়ে অপর মাসআলার সাথে সংযুক্ত করে তার মতো বিধান এখানে প্রয়োগ করা আবশ্যক।
তো সেই অপর মৌলিক মাসআলাটি বুঝে আসে এই আয়াত থেকে, (অর্থ) আল্লাহ তাআলা তাদের (মহিলাদের) গর্ভাশয়ে কী সৃষ্টি করেছেন তা গোপন করা বৈধ নয় তাদের জন্য। (সূরা বাকারা: ২২৮) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় পূর্বসূরিরা বলেছেন, ঋতুবতী হওয়া এবং গর্ভবতী হওয়া গোপন করা যাবে না। উবাঈ ইবনে কা'ব রা. বর্ণিত, নারীদের নিজ লজ্জাস্থানের হেফাজত করা আমানতের অন্তর্ভুক্ত। আর নারীদের গর্ভাশয়ে কী আছে তা গোপন করতে আল্লাহ তাআলা নিষেধ করেছেন তাদেরকে। এ থেকেই বুঝে আসে, গর্ভবতী হওয়া না হওয়া এবং ঋতুবতী হওয়া না হওয়ার ব্যাপারে মহিলার কথা গ্রহণযোগ্য হবে। যেমন আল্লাহ তাআলা ঋণগ্রহীতা ব্যক্তির ব্যাপারে বলেছেন, (অর্থ) সে যেন নিজ প্রভু আল্লাহকে ভয় করে এবং (ঋণের পরিমাণ লেখায়) কোনো কমতি না করে। (সুরা বাকারা: ২৮২)
এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা যেহেতু ঋণগ্রহীতাকে কোনো কমতি করতে নিষেধ করে দিয়েছেন, তা-ই বুঝা গেল, ঋণের পরিমাণ নির্ধারণে ধর্তব্য হবে তার কথাই। সুতরাং পূর্বোল্লিখিত আয়াত থেকে কিছু মৌলিক একটি মাসআলা বুঝা গিয়েছে। তা হলো, মহিলা যদি বলে, আমি এখন ঋতুবতী, (তার কথাকে সত্য ধরে) এই অবস্থায় তার সাথে সহবাস করা হারাম। তেমনি সে যদি বলে আমি ঋতু থেকে পবিত্র হয়ে গেছি স্বামীর জন্য তার সাথে সহবাস করা বৈধ। (ঋতুর হিসেবে) ইদ্দত পালনরত অবস্থায় সে যদি বলে আমার ইদ্দতের মেয়াদ শেষ তাহলে তার কথাই সত্য ধরা হবে। (তালাকে রজঈ দিয়ে থাকলে) তাকে আর (বিয়ে ছাড়া) ফিরিয়ে নিতে পারবে না স্বামী। তাদের মাঝে দাম্পত্য সম্পর্ক একেবারেই শেষ হয়ে যাবে।
উপরোক্ত মাসআলাগুলোতে মহিলার কথা গ্রহণযোগ্য হওয়ার মূল কারণ হলো, ঋতুবতী হওয়ার বিষয়টা মহিলার সাথেই নির্দিষ্ট। এ বিষয়টা একমাত্র তার পক্ষ থেকেই জানা সম্ভব। সেই হিসাবে স্বামী যদি স্ত্রীকে বলে, ঋতুবতী হলেই তুমি তালাক। পরে সেই মহিলা যদি বলে আমি ঋতুবতী হয়েছি তাহলে তার উপর তালাক পতিত হওয়ার ক্ষেত্রে তাকে সত্যায়িত করা হবে। যেমনটা সত্যায়িত তাকে করা হয়েছে ইদ্দত শেষ হওয়ার দাবির ক্ষেত্রে। উভয় ক্ষেত্রে স্বামী তার স্ত্রীর কথা সমর্থন না করলেও এই বিধান। কারণ হচ্ছে, ঋতুবতী হওয়ার বিষয়টা মহিলার সাথেই নির্দিষ্ট। অর্থাৎ ঋতুবতী হওয়া না হওয়াটা একমাত্র তার পক্ষ থেকেই জানা যায়। অন্য কেউ দেখতে পারে না সেটা। (তা-ই এ ব্যাপারে গ্রহণযোগ্য হবে তার কথাই।)
ঠিক এ কারণেই যদি কেউ কোনো মহিলাকে বলে, তুমি ঋতুবতী হলে আমার অমুক স্ত্রী তালাক কিংবা অমুক দাস আজাদ। পরে একসময় সেই মহিলা বলে, আমি ঋতুবতী হয়েছি। তাহলে তার কথা সত্যায়ন করা হবে না। কেননা তার বক্তব্যটাকে প্রমাণ হিসেবে ধরা হয়েছে কেবল তার ব্যক্তিগত বিধানাবলির ক্ষেত্রেই। অন্যের সাথে সম্পৃক্ত বিধানাবলির ক্ষেত্রে নয়। লক্ষ করে দেখুন, কোনো স্বামী যদি বলে, স্ত্রী আমাকে জানিয়েছে, তার ইদ্দত শেষ হয়ে গিয়েছে আমি এখন আমি তার বোনকে বিয়ে করতে চাই। ফকিহদের মতে এটা তার জন্য এটা বৈধ হবে। অন্যের ক্ষেত্রে সেই মহিলার ইদ্দত বাকি থাকার দাবি সত্যায়িত হবে না। তবে তার নিজের ব্যাপারে ধর্তব্য হবে সেটা। অর্থাৎ ইদ্দত থাকাকালীন তার নিজের সাথে যেসব বিধানাবলি সম্পর্ক রাখে সেগুলো বহাল থাকবে।
সুতরাং কোনো মহিলা যদি বলে, "আমি ঋতুবতী হয়েছি", তার এই কথার বিধান হবে দুই রকম:
১. তার নিজের ক্ষেত্রে হবে একরকম। অর্থাৎ তার উপর তালাক পতিত হওয়া, তার ইদ্দতের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়াসহ তার সাথে সম্পৃক্ত এ ধরনের ক্ষেত্রগুলোতে তার কথাটাই ধর্তব্য হবে প্রমাণ হিসেবে। ২. পক্ষান্তরে অন্যদের ক্ষেত্রে তার সেই কথার বিধান হবে আরেকরকম।
অর্থাৎ অন্য মহিলার উপর তালাক পতিত হওয়া কিংবা গোলাম আজাদ হওয়ার ক্ষেত্রে সে হবে একজন সাক্ষীর মতো। (আর একজন মহিলার সাক্ষ্যে কিছু প্রমাণিত হয় না।) এটা হবে এই মাসআলার মতো যে, কোনো স্ত্রীকে যদি স্বামী বলে, তুমি ঘরে প্রবেশ করলে কিংবা যায়েদের সাথে কথা বললে তালাক অথবা অমুক গোলাম আজাদ। পরে সেই মহিলা বলে, আমি ঘরে প্রবেশ করেছি অথবা যায়েদের সাথে কথা বলেছি তার কথা সত্যায়ন করা হবে না। (তবে অন্য কোনো প্রমাণ কিংবা স্বামীর স্বীকারোক্তি দ্বারা তার দাবিটা সাব্যস্ত হলে তখন হুকুমও পতিত হবে।)
এরপর আবু বকর রাযি আরো অনেক এমন দৃষ্টান্ত পেশ করেন যেগুলোতে মহিলার বক্তব্যের হুকুম হয় দুই ধরনের। দৃষ্টান্তগুলো তিনি খুব সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন। এক পর্যায়ে গিয়ে ইসতিহসানের আরেকটি প্রকারের আলোচনা করেছেন তিনি। তা হলো, ইল্লত বা কারণ বিদ্যমান থাকলে হুকুমও পাওয়া যাবে। এ বিষয়ে হৃদয় শীতল করা ব্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি। সেইসঙ্গে এই ব্যাপারে সন্দেহের কোনো অবকাশ রাখেননি যে, শাখাগত সকল মাসআলায় প্রয়োগকৃত ইসতিহসানের এই প্রকারটির সঙ্গে মিশে আছে কুরআন, হাদিসের কোনো ভাষ্য কিংবা 'ইজমা' অথবা কিয়াসের মতো শক্তিশালী কোনো দলিল। যে দলিলটি সেই মাসআলায় ভিন্ন কোনো হুকুমকে আবশ্যক করে।
এতটুকু আলোচনাই এটা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট যে, ইসতিহসান বিরোধীদের আপত্তি বাস্তবতা বিবর্জিত।