আল্লাহর আইন পরিবর্তনে পৃথিবীর কী ক্ষতি হলো?

A+ A-

 


 


 


 


বই: আল্লাহর আইন পরিবর্তনে পৃথিবীর কী ক্ষতি হলো


রচনা: ড. উমার সুলায়মান আশকার


অনুবাদ: ওয়াহিদ আমিম


প্রথম প্রকাশ: নভেম্বর ২০২৪

Chapter 001 / 1

উৎসর্গ


মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ গোলাম কাদির। আমার পরম শ্রদ্ধেয় দাদা। আমাদের দেখে যার চক্ষু শীতল করার খুব ইচ্ছে ছিল। কিন্তু আমাদের দেখার আগেই আল্লাহ তাকে নিজের কাছে ডেকে নিয়েছেন।


হে আল্লাহ! তুমি তার কবরের জীবনকে সুন্দর করে দাও; তার কবরকে জান্নাতের টুকরো বানিয়ে দাও। জান্নাতে তার সম্মান ও মর্যাদাকে বৃদ্ধি করে দাও। জান্নাতের বাড়িতে আমাদের একসাথে রেখো। এটাই তোমার কাছে আমার বিনীত প্রার্থনা।

Chapter 001 / 2

 


সূচিপত্র


অনুবাদকের কথা: ১১


লেখকের কথা: ১৩


ভূমিকা: ২৪


 


আইনের পরিচয়, উৎপত্তি ও প্রয়োজন ২৪


আইনের পরিচয় ২৫


ইসলামী শরী‘আহই প্রকৃত আইন ২৯


মানবসৃষ্ট আইনের উৎস ৩১


আইন বিজ্ঞানের পরিধি ও ক্ষেত্র ৩৬


আইনের উৎপত্তি ৩৭


পশ্চিমা বিজ্ঞানীদের মতে মানুষের আবির্ভাব ও বংশবৃদ্ধি ৩৮


এ দৃষ্টিভঙ্গির ওপর কুরআনের বিধান ৪২


কুরআনের দৃষ্টিতে মানুষের ইতিহাস ৪৭


আইনের প্রয়োজনীয়তা ৫০


কুরআনের দৃষ্টিতে মানুষের প্রকৃতি ৫১


প্রথম পরিচ্ছেদ: ৫৫


কিছু মানবসৃষ্ট বিখ্যাত আইন ৫৫


কিছু মানবসৃষ্ট বিখ্যাত আইন ৫৬


হাম্মুরাবি আইন ৫৭


মনুর আইন/মনুস্মৃতি ৫৮


বুখুরিসের আইন ৫৯


এথেন্স তথা প্রাচীন গ্রিক আইন ৫৯


রোমান আইন ৬০


জাহেলি যুগে আরবদের আইন ৬৩


ইউরোপীয় আইন ৬৪


এ আইনগুলো ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন আইন ৬৫


দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: ৭০


মুসলিম রাষ্ট্রে মানবসৃষ্ট আইনের ইতিহাস ৭০


মুসলিম রাষ্ট্রে মানবসৃষ্ট আইনের ইতিহাস ৭১


রাজনৈতিক শাসন ৭২


একটি গুরুত্বপূর্ণ টীকা ৭৪


তাতারী আইন ৭৭


তাতারি আইনের পরিণতি ৭৮


খেলাফত আমলে মানবসৃষ্ট আইন ৭৯


উসমানী সাম্রাজ্যের পরিণতি ৮২


মিশরে মানবসৃষ্ট আইন ৮৩


মিশর থেকে শরী‘আহ আইনের অবসান ৮৪


মিশরী আদালতে শরী‘আহ আইনের বিকৃতি ৮৭


ইরাকে মানবসৃষ্ট আইন ৯০


লেবাননে মানবসৃষ্ট আইন ৯১


সিরিয়ায় মানবসৃষ্ট আইন ৯৩


জর্ডানে মানবসৃষ্ট আইন ৯৪


ভারত ও পাকিস্তানে মানবসৃষ্ট আইন ৯৫


মানবসৃষ্ট ফৌজদারি আইন ৯৬


মানবসৃষ্ট ফৌজদারি আইনে ব্যভিচারের শাস্তি ৯৮


তৃতীয় পরিচ্ছেদ: ১০২


শরী‘আহ আইন পরিবর্তনে খ্রিষ্টানদের চক্রান্ত ১০২


শরী‘আহ আইন পরিবর্তনে খ্রিষ্টানদের চক্রান্ত ১০৩


ইসলামী আইন পরিবর্তনে খ্রিষ্টানদেও গৃহীত পদক্ষেপ ১০৬


প্রথম পদক্ষেপ ১০৭


মানসিক পরাজয় ১১০


তারা গোলযোগ সৃষ্টিকারী ১১১


আমরা কখনোই পশ্চিমা সভ্যতাকে গ্রহণ করবো না ১১৪


দ্বিতীয় পদক্ষেপ ১১৫


তৃতীয় পদক্ষেপ ১১৭


চতুর্থ পদক্ষেপ ১২১


পঞ্চম পদক্ষেপ ১২৫


ষষ্ঠ পদক্ষেপ ১২৮


মিশরে বিদেশিদের বিশেষ সুবিধা প্রদান ১৩৩


বিশেষ সুবিধা বাতিল করণ ১৩৪


সপ্তম পদক্ষেপ ১৩৫


প্রতারণার ধরন ১৩৫


আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা দিয়েছেন ১৩৬


মানবসৃষ্ট আইন ও শরী‘আহ’র মাঝে সমন্বয় সাধন ১৩৯


এ সম্মেলনের উদ্দেশ্য ১৪০


এ বিষয়ে আলেমদের পর্যালোচনা ১৪২


আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের শরী‘আহ অনুষদের ডীন ১৪২


শায়খ আহমাদ আবু সানা ১৪৪


ড. সুলাইমান তামাবী ১৪৫


শায়খ বদর মুতাওয়াল্লী আব্দুল বাসেত ১৪৬


শায়খ মুহাম্মাদ আবু যাহরা ১৪৭


চতুর্থ পরিচ্ছেদ: ১৪৯


মিশরীয় নাগরিক আইন ১৪৯


মিশরীয় নাগরিক আইন ১৫০


প্রাচীন মিশরীয় নাগরিক আইন ১৫১


এ বিকৃত আইনকে মিশরে কার্যকর করার কারণ ১৫৩


১৯৪৯ সালে প্রণীত মিশরের নাগরিক আইন ১৫৫


মিশরীয় নতুন আইনের মূল উৎস ১৫৭


নাগরিক আইন ইসলামী শরী‘আহর অনুরূপ ছিল না ১৫৯


যেভাবে শরী‘আহ আইনকে তৃতীয় উৎসে পরিণত করা হলো ১৬৪


মিশরীয় আইন শরী‘আহ আইনের অনুযায়ী হওয়ার দাবি ১৬৫


ইউরোপীয় আইন ও ইসলামী আইনের মাঝে কোনো ধরনের সম্পর্ক না থাকার ব্যাপারে ইউরোপীয় আইনবিদদের স্বীকারোক্তি ১৬৭


মিশরীয় নাগরিক আইন নিয়ে কয়েকজন আইনজীবীর সমালোচনা১৬৮


মুসতাশার হাসান হাযিবীর সমালোচনা১৬৯


শায়খ আব্দুল ওহহাব তাল‘আত পাশার সমালোচনা১৭২


সাইয়েদ আব্দুল্লাহ আলী হোসাইনের সমালোচনা১৭৩


মিশরীয় নাগরিক আইনের সারকথা১৭৭


পঞ্চম পরিচ্ছদ: ১৮০


মানবসৃষ্ট আইনের ব্যাপারে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি১৮০


মানবসৃষ্ট আইনের ব্যাপারে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি১৮১


দিনশাওয়াই আদালতের বিচার১৮৭


দুই শ্রেণীর মানুষ কাফির২১৯


ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ : ২৩৪


মানবসৃষ্ট আইনের ব্যাপারে আলেমদের অভিমত২৩৪


মানবসৃষ্ট আইনের ব্যাপারে আলেমদের অভিমত২৩৫


শায়খুল ইসলাম আল্লামা ইবনে তায়মিয়্যাহর অভিমত২৩৫


আল্লামা ইবনে কায়্যিম রহ. এর অভিমত২৩৯


আল্লামা ইবনে কাসীর রহ. এর অভিমত২৪১


শায়খ আব্দুর রহমান বিন হাসান রহ. এর অভিমত২৪৩


শায়খ আহমাদ শাকেরের অভিমত২৪৪


সৌদী আরবের গ্র্যান্ড মুফতী শায়খ মুহাম্মাদ বিন ইবরাহীম বিন আব্দুল লতিফের অভিমত২৪৭


শায়খ মুহাম্মাদ আমীন শানকিতী রহ. এর অভিমত২৫৯


শায়খ আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বাযের অভিমত২৬৬


শায়খ আব্দুল্লাহ বিন যায়েদ আল-মাহমূদের অভিমত - ২৮২

Chapter 001 / 3
Chapter 001 / 4
Chapter 001 / 5
Chapter 001 / 6
Chapter 001 / 7
Chapter 001 / 8
Chapter 001 / 9
Chapter 001 / 10

অনুবাদকের কথা


সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য নিবেদিত। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক বিশ্বমানবতার মুক্তির দূত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর; তাঁর পরিবার-পরিজনের ওপর; তাঁর সাহাবিগণের ওপর। আম্মাবা‘দ।


আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে সৃষ্টির সেরা বানিয়েছেন। নিজের ইবাদতের জন্য তাদেরকে মনোনীত করেছেন। তাদের হিদায়াতের জন্য যুগেযুগে নবি ও রাসূল প্রেরণ করেছেন। নবি ও রাসূলগণ আল্লাহর কাছ থেকে ইসলামী শরী‘আহ নিয়ে এসেছেন। মানুষকে শরী‘আতের আইন শিক্ষা দিয়েছেন; ইবাদতের পদ্ধতি বাতলে দিয়েছেন।


রাসূলদের মধ্যে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল হলেন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে সর্বশ্রেষ্ঠ শরী‘আহ প্রদান করেছেন। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যক্তি জীবন থেকে নিয়ে রাষ্ট্র জীবনের সর্বত্র শরী‘আহ আইনকে কার্যকর করেছিলেন। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তিরোধানের পর, আবু বকর রা.-এর খিলাফত আমল থেকে নিয়ে উসমানী খিলাফত আমল পর্যন্ত ইসলামী রাষ্ট্রের একমাত্র সংবিধান ছিল শরী‘আহ আইন। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে উসমানী সাম্রাজ্যের পতনের মধ্য দিয়ে ইসলামী ভূখণ্ড থেকে শরী‘আহ আইন বিদায় গ্রহণ করে। মুসলমানদের সংবিধানে মানবসৃষ্ট আইন এসে কর্তৃত্ব শুরু করে।


আরব বিশ্বের এক কিংবদন্তি লেখক হলেন ড. উমার সুলায়মান আশকার। তিনি তার এ গ্রন্থে ইসলামী ভূখণ্ড থেকে কীভাবে শরী‘আহ আইন বাতিল করা হলো? কারা চক্রান্ত করে শরী‘আহ আইন বাতিল করল, কীভাবে মানবসৃষ্ট আইনকে কার্যকর করা হলো, মানবসৃষ্ট আইন প্রণয়নকারীদের ব্যাপারে ইসলামের বিধান কী, ‘আল্লাহর আইন পরিবর্তনে পৃথিবীর কী ক্ষতি হলো’ ইত্যাদি বিষয়গুলো সবিস্তারে আলোচনা করেছেন।


আশা করি, এ গ্রন্থটি পাঠক মহলকে নতুন করে এমন অনেক কিছু জানার সুযোগ করে দেবে, যা না জানলে মানুষের ঈমান পরিপূর্ণ হয় না; ব্যক্তি আল্লাহর একনিষ্ঠ আবেদে পরিণত হতে পারে না। এ নতুন বিষয়গুলো জানা সবার জন্য অত্যন্ত জরুরি। আমি মনে করি, নিজেদের ঈমানকে পরিপূর্ণ

Chapter 001 / 11

করার জন্য হলেও এ গ্রন্থটি নিদেনপক্ষে সবার জন্য একবার করে হলেও পড়া উচিত।


সবশেষে এ গ্রন্থটি প্রকাশের আনন্দঘন মুহূর্তে আমি বিশেষভাবে স্মরণ করছি রাশেদুল আলম ভাইকে। যিনি গ্রন্থটি প্রকাশের দায়িত্ব গ্রহণ করে আমাকে চিরকৃতজ্ঞতার বন্ধনে আবদ্ধ করেছেন। আল্লাহ তাঁকে দুনিয়া ও আখিরাতে জাযায়ে খাইর দান করুন। ধন্যবাদ জানাচ্ছি ‘হাসানাহ’ পরিবারকে, যারা গ্রন্থটি প্রকাশের পেছনে অক্লান্ত পরিশ্রম ব্যয় করেছেন। আল্লাহ তাদেরকেও উত্তম প্রতিদান দান করুন।


বিশেষভাবে আমার জীবনসঙ্গিনী আসমা নিশাত পায়েলের প্রতি আমি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। যে গ্রন্থটির কাজ শেষ করার ক্ষেত্রে নানাভাবে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দিয়ে আমাকে সহযোগিতা করেছে। আল্লাহর কাছে বিনীত প্রার্থনা, আল্লাহ তাকে ও বিশেষভাবে আমাকে দ্বীনদার হিসেবে কবুল করে নিন। এ গ্রন্থটির ওসিলায় আমাদের দুনিয়ার জীবনকে কল্যাণে ভরে দিন এবং আখিরাতের জীবনকে ক্ষমা ও মাগফিরাতের ছায়া দিয়ে ঢেকে দিন। আমীন! সুম্মা আমীন।


বিনীত


ওয়াহিদ আমিম


২৯/০১/২০২১


রাত এগারোটা।

Chapter 001 / 12
{:en}

লেখকের কথা


সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য নিবেদিত। তিনি এক, একক, অদ্বিতীয়, অমুখাপেক্ষী। সমস্ত প্রশংসা তাঁরই প্রাপ্য। সকল ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব তাঁরই; সকল সৃষ্টিও তাঁরই। তিনি সকল সৃষ্টিজীবের প্রভু; তাদের স্রষ্টা; তাদের ইলাহ। তাদের মাঝে তিনি কেবল নিজের আইনই কার্যকর করেন; নিজের আইন অনুযায়ীই তাদের বিচার ফয়সালা করেন। তার আইনের কোনো খণ্ডনকারী নেই; তার ফয়সালা বাতিল ও পরিবর্তনকারী কেউ নেই; তার নির্দেশ বদলে দেওয়ার মতো কেউ নেই। তিনি মহান ও পবিত্র। তিনি সর্বাধিক সহিষ্ণু ও মর্যাদার অধিকারী। বান্দার কাছে তিনিই কল্যাণ অবতরণ করেন; কিন্তু বান্দারা নিজেদের অকল্যাণ করতে তৎপর। তিনি বান্দাদের নিয়ামত দান করা পছন্দ করেন; কিন্তু বান্দারা গোনাহ করে আল্লাহর অপ্রিয় হয়ে ওঠায় ব্যস্ত। তিনি তাদেরকে কল্যাণ ও সৌভাগ্যের দিকে আহ্বান করেন, কিন্তু বান্দারা সেই কল্যাণ ও সৌভাগ্য থেকে পলায়ন করে।


দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর। তিনি আমাদের কাছে আল্লাহর আইন নিয়ে এসেছেন। সে আইনের আলোকে তিনি বান্দাদের মধ্যকার বিবাদের বিচার ও ফয়সালা করেছেন। আর যারা নবীজির বিচার ও ফয়সালা মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, ইসলামের তরবারী দিয়ে তাদের ফয়সালা করার জন্য আল্লাহ তাকে অনুমতি দিয়েছেন। ফলে অবাধ্যচারীদের তিনি নিন্দিত ও অপদস্থ করেছেন।


দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক তার সোহবত ধন্য সাহাবীগণের ওপর; তার পবিত্র পরিবার পরিজনের ওপর এবং তাদের ওপর, যারা কিয়ামত পর্যন্ত পরিপূর্ণভাবে সাহাবীদের অনুসরণ করবে; যারা পৃথিবীর কোনো আইনের বিনিময়েই আল্লাহর আইনকে পরিবর্তন করতে রাজী হবে না; আল্লাহর আইন নিয়েই যারা সন্তুষ্ট; যারা সহজ সরল পথের ওপর প্রতিষ্ঠিত; বাতিল থেকে বিচ্যুত। আম্মাবাদ:-


আজ মুসলিম বিশ্ব একটি উত্তপ্ত কড়াইয়ের মতো, যার সর্বত্র তেল টগবগ করে ফুটছে। বরং বলা যায়, প্রত্যেক স্থানে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত চলছে। কোথাও যদি আপাত প্রশান্ত দেখা যায়, তাও আসলে আরও ভয়াবহ বিস্ফোরণের পূর্বপ্রস্তুতিমাত্র। মুসলমানরা আজ সর্বত্র নির্যাতিত ও নিপীড়িত হচ্ছে; প্রবঞ্চকদের দ্বারা প্রতারিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত।  এ প্রতারণার আশ্রয়েই শত্রুরা ধূর্ততার সাথে মুসলমানদের ঘাড়ে চেপে বসে আছে এবং মুসলমানদের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা দখল করে তাদের ধ্বংসের সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে।


অথচ একদা আমাদের গৌরবোজ্জ্বল স্বতন্ত্র খিলাফাহ ছিল। এই স্বাধীন সাম্রাজ্য টিকে ছিল হিজরি চতুর্দশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত। ছিল  নিজস্ব  সেনাবাহিনী, যারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করত। আমাদের সাম্রাজ্যের  একমাত্র আইন ছিল আল্লাহর নাজিল করা শরী‘আহ আইন। এই যে আজ  আমরা চারদিকে লাঞ্ছিত, নির্যাতিত, আর নিপীড়িত।   এর কারণ, আমাদের মাঝে  আর নেই  সেই  শরী‘আহ আইন,  নেই সেই  স্বতন্ত্র স্বাধীন  সাম্রাজ্য ও  ঐক্যবদ্ধ  খিলাফাহ ।


শেষ সময়ে এসে উসমানী সাম্রাজ্য অসুস্থ ও রুগ্ণ হয়ে পড়েছিল। অজ্ঞতা, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, স্বজনপ্রীতি, উন্নতির চেষ্টা থেকে দূরে থাকা ইত্যাদি রোগগুলো গোপনে উসমানী সাম্রাজ্যকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল। কিন্তু শত্রুরা সময় হওয়ার আগেই তার গলায় ছুরি চালিয়ে তার মৃত্যুকে আবশ্যক করে তুলেছিল এবং তার দেহকে খণ্ডবিখণ্ড করেছিল। তারপরও তারা ভয় পাচ্ছিল, হয়তো মুসলমানদের ঘুমন্ত সিংহ শার্দুলেরা জেগে উঠবে, তাদের নিথর ধমনিতে প্রাণের সঞ্চার হবে। ফলে তারা তাদের সাম্রাজ্যকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করে ফেলবে। এই ভয়ে শত্রুরা সবাই একতাবদ্ধ হলো; নিজেদের শয়তান বুদ্ধিজীবীদের সাথে পরামর্শ করল। বুদ্ধিজীবীরা তাদেরকে অত্যন্ত অশুভ ও নিন্দনীয় পরামর্শ দিলো। তারা বলল, তোমরা মুসলমানদের নিজেদের হাত দিয়েই তাদের সাম্রাজ্যের প্রাসাদ গুঁড়িয়ে দাও। আর এটাকে তোমরা সভ্যতা, নগরায়ণ ও আইনের উন্নয়ন বলে নাম দাও। তোমরা তাদের খিলাফতকে গুঁড়িয়ে দাও, তাদেরকে ইসলামী শিক্ষা থেকে দূরে সরিয় নাও।


মুসলমানদের এ দুর্দশার সময় কাফিররা ক্রন্দন করে মুসলমানদের সান্ত্বনা দিলো। অথচ এটা তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার ও সমব্যথী হওয়ার ক্রন্দন ছিল না। বরং এটা ছিল তাদের প্রতারণার কৌশল। যেভাবে বদরের নিহতদের ব্যাপারে ইহুদিরা কেঁদেছিল। অথচ সেটা তাদের প্রকৃত কান্না ছিল না, ওটা ছিল তাদের প্রতারণার কৌশল। এ কৌশলের মাধ্যমেই শত্রুরা প্রতারণা করে থাকে।


একদল মুসলমান তাদের এ মেকি কান্নাকে সত্য ভেবে বসল। তারা মনে করল, এ হিংস্র জন্তুরা তাদের রক্ষা করতে এসেছে। তারা তাদের কল্যাণই করতে চাচ্ছে। ফলে তারা তাদের আনুগত্য করে বসল।


আমরা এ কথা অস্বীকার করি না, অতীতে মুসলমানরা অনেক বিপদের মধ্য দিয়ে দিন কাটিয়েছে; মুসলিম শাসকরাও তাদের ওপর জুলুম নির্যাতন করেছে; শাসকরা স্বৈরাচারীর মতো দেশ শাসন করেছে; আলেমদের অকেজো করে রেখেছে; মুসলিম সন্তানদের অজ্ঞ করে রেখেছে। কিন্তু তারপরও সে সময় মুসলমানরা সম্মান ও মর্যাদার সাথে জীবন যাপন করতে পেরেছে। তখন তাদেরকে ইসলামকে পরিত্যাগ করতে হয়নি; কাফির খ্রিষ্টান কুচক্রীদের পায়ে পড়তে হয়নি। সে সময় খ্রিষ্টানরা মুসলমানদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো নাক গলানোরও সুযোগ পায়নি।


কাফিররা মুসলমানদের বলল, তোমরা তোমাদের সম্মুখের কঠিন বাঁধাকে না সরালে আমরা তোমাদের কোনো সহযোগিতা করতে পারব না। সেই কঠিন বাঁধাটি হলো ইসলামী খিলাফত। যারা খিলাফতকে ধ্বংস করেছিল তারা জানতেও পারেনি, ইসলামের কেল্লাকে হেফাজতকারী সর্বশেষ দেওয়ালটিকে তারা নিজ হাতে ধ্বংস করছে। খিলাফত বিলুপ্তির সাথে সাথে মুসলমানদের কাছ থেকে ইসলামী শরী‘আহ আইনও বিলুপ্ত করা হয়; ইসলামী ভূখণ্ডকে ভেঙে টুকরো টুকরো করা হয়। এর পরে এসে মুসলমানরা বুঝতে পারে, তাদের সাথে প্রতারণা করা হয়েছে; তারা প্রতারিত হয়েছে। তারা নিঃস্ব, এতিম ও অসহায় হয়ে পড়েছে। তারা অপমান, নিন্দা ও দাসত্বের শৃঙ্খলের বেড়ি পড়ে ধীরে ধীরে হাঁটছে। মুসলমানরা বুঝতে পারে, এতদিন যারা তাদের কল্যাণকামী হওয়ার অভিনয় করেছে, তারা আজ সম্পূর্ণরূপে স্বৈরাচারী ও স্বার্থপর হয়ে গেছে। তুরস্কের যে ঐক্যফ্রন্ট সুলতান আব্দুল হামিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল; সংবিধান প্রণয়ন করতে পেরে যারা গৌরববোধ করেছিল; উসমানী সাম্রাজ্যকে বিলুপ্ত করে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করাকে যারা স্বাধীনতা বলে ভেবেছিল; সংবিধানের আলোকে জাতির মাঝে যারা সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার অঙ্গীকার করেছিল, তারাই ক্ষমতার মসনদে বসে জাতির সাথে স্বেচ্ছাচারিতা ও স্বার্থপরতার আচরণ করেছিল; তারা নিজেদের চিন্তাচেতনাকে প্রবৃত্তির অনুগামী করেছিল; তারা এমনভাবে জাতির নেতৃত্ব দিয়েছিল, যেভাবে রাখাল পশুপালকে পরিচালনা করে। নিজেদের গন্তব্যে পৌঁছার সবগুলো মাধ্যম রুগ্ণ হয়ে পড়েছিল। নির্বাচনে প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল; আল্লাহর বান্দাদের ধ্বংস করা হয়েছিল। এমনকি মানুষের ঘরবাড়িতে পর্যন্ত আগুন দেওয়া হয়েছিল। সরকারি আমলাদের প্রলুব্ধ করা হয়েছিল। জনতার আন্দোলনকে দমন করা হয়েছিল। হিংসা, ঘৃণা ও বিদ্বেষের আগুনকে উত্তপ্ত করা হয়েছিল। সাধারণ মানুষের বিপক্ষে বিচারের রায় দেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল। মুসলিম উম্মাহকে সংশোধনের কথা বলে তাদের মধ্যে এক যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি করা হয়েছিল। আর এসব কাজকে তারা রাজনীতি নাম দিয়েছিল। 


যদি বিষয়টি এ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকত, তাহলে তা ভুলে গিয়ে খুশি হওয়ার চেষ্টা করতাম। কিন্তু তারা পরবর্তী সময়ে আরও অনেক বড়ো ষড়যন্ত্র করেছে। বিদ্বেষী ও কুচক্রী ইহুদি খ্রিষ্টানদের চক্রান্তে তারা এ ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করেছে। এ ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের জন্য তারা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। মানবসৃষ্ট আইন প্রণয়ন করে তা কার্যকর করার মাধ্যমে এ ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করেছে।


প্রথমে এ ষড়যন্ত্রকে সুন্দর পোশাক পরিয়ে তারা নেককার লোকদের কাছে উপস্থাপন করেছে। কিন্তু তারা তাদের সাথে একমত হয়নি বলে, তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে। নির্যাতন করে তাদেরকে নমনীয় হতে বাধ্য করা হয়েছে।


এ আইন বাস্তবায়নের পথে এ উম্মতের যারা প্রতিবন্ধক ছিল, তারা অর্থের বিনিময়ে তাদেরকে ক্রয় করে নিজেদের মতাদর্শী বানিয়েছে। ফলে তারা ঐ আহ্বানকারীকে পরিণত হয়েছে, যাদের ব্যাপারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে সতর্ক করে বলেছেন, ‘কিছু লোক জাহান্নামের দরজায় দাঁড়িয়ে মানুষকে আহ্বান করবে, যারা তাদের ডাকে সাড়া দেবে তারাই জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।’ তাদের গুণাগুণ সম্পর্কে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘তারা হবে আমাদের স্বজাতির মানুষ এবং তারা আমাদের ভাষাতেই কথা বলবে।’ 


শত্রুরা প্রথমে আমাদের কাছে তাদের গুরুত্বপূর্ণ কিছু লোককে পাঠিয়েছে, যাতে তারা আমাদের মধ্যকার সেই আহ্বানকারীদের প্রস্তুত করতে পারে যারা আমাদেরকে জাহান্নামের দিকে ডাকবে। তারা পর্দার আড়ালে থেকে আমাদের মস্তিষ্ককে ধোলাই করেছে; আমাদের শিক্ষা পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনেছে; আমাদের আদালত থেকে ইসলামী শরী‘আহ আইন বিলুপ্ত করেছে।


সর্বপ্রথম তারা আমাদের ব্যক্তিত্বকে ধ্বংস করার উদ্যোগ নিয়েছে; দ্বীনের ব্যাপারে আমাদের ফিতনায় ফেলেছে, এরপর আমাদের ওপর কাফিরদের আইনকে বাধ্যতামূলক করে চাপিয়ে দিয়েছে; মুসলমানদের খলিফাকে বিতাড়িত করেছে; দেশ থেকে শায়খুল ইসলামের পদকে বিলুপ্ত করেছে; মুসলিম দেশকে ভেঙে টুকরো টুকরো করেছে; আমাদের পরস্পরকে পরস্পরের বিরুদ্ধে বিদ্বেষী করে তুলেছে। ফলে কাফিরদের পরিকল্পনা অনুযায়ীই আমরা একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছি। আর তখনি তারা নিজেদের চেহারা থেকে ভালো মানুষির গুমটাকে সরিয়ে ফেলেছে। তুর্কি জাতিকে তারা প্রথমে ক্যাপ পরিধান করতে বাধ্য করেছে; আলেম সমাজকে নিন্দিত ও অপমানিত করেছে। এ রকম আরও অনেক জঘন্য কাজ তারা করেছে। তাদের কর্মকাণ্ডে মুসলমানরা যতটা হেসেছে, তারচেয়ে বেশি ক্রন্দন করেছে। কবি মুতান্নাবীর ভাষায়, 


مَنْ يَهُنْ يَسْهُلِ الْهَوَانُ عَلَيْهِ * مَا لِجُرْحٍ بِمَيِّتٍ إِيْلاَمُ


অপমানে যে জর্জরিত, অপমান তার গিয়েছে সয়ে,


মৃত দেহে ফের হানলে আঘাত, কীসের ব্যথা নতুন ক্ষতে! 


শত্রুরা এভাবেই ধীরে ধীরে নিজেদের কার্যসিদ্ধি করেছে। ১৮৮৩ সালে মিশরে যে আইন পাশ করা হয়েছিল, তা ছিল ফরাসি আইন (খধি ড়ভ ঋৎধহপব)। প্রথমে ফরাসি ভাষায় কাফিররা এ আইন প্রণয়ন করেছিল। এরপর সেটাকে আরবিতে অনুবাদ করেছিল। কিন্তু তারা এই বিশ্বাস করিয়েছিল, আইনের আরবী কপিটিই হলো আসল ও মূল। আর ফরাসি কপিটি হলো তার অনুবাদ মাত্র।  অথচ এ কথাটি ছিল ডাহা মিথ্যা ও বানোয়াট।


ইরাকেও এমন ঘটনা ঘটেছিল। ১৯১৮ সালে ইরাকে যে দণ্ডবিধি আইন পাশ করা হয়, তা প্রথমে ইংরেজিতে প্রণয়ন করা হয়েছিল। পরে তা আরবীতে অনুবাদ করা হয়েছিল। কিন্তু মানুষকে ধারণা দিয়েছিল, আরবী কপিটিই হলো আসল ও মূল। 


১৯৫৬ সালে লিবিয়া স্বাধীনতা অর্জন করে। স্বাধীনতার অর্জনের পর তড়িঘড়ি করে সেখানে আইন প্রণয়ন করা হয়। স্বাধীনতা অর্জনকারীরা আত্মভোলার ভাব নিয়ে জনগণকে বুঝালো, আমরা নিজেরা এ আইন তৈরি করিনি। বরং তা মিশরীয় আইন থেকে নকল করা হয়েছে। লিবিয়ার আইন প্রণয়ন কমিটির প্রধান ছিলেন ড. আব্দুর রাযযাক সানহুরী। আসলেই এ আইন মিশরীয় আইন থেকেই নকল করা হয়েছিল। কিন্তু তড়িঘড়ি করে নকল করায় এই আইনের মূলনীতিতে ছিল হাস্যকর ভুলের সমারোহ। মিশরের নাগরিক আইনকে হুবহু লিবিয়ার নাগরিক আইন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল। পরিকল্পনা আইনে বিশেষভাবে কায়রোর পরিকল্পনা আইনের শব্দগুলোই হুবহু উদ্ধৃত করা হয়েছিল। 


তড়িঘড়ি করে এ আইন প্রণয়নের মূল উদ্দেশ্য ছিল, লিবিয়া থেকে শরী‘আহ আইনকে বাতিল করা। যাতে আল্লাহর দ্বীন ও শরী‘আহর সাথে কী জঘন্য আচরণ করা হচ্ছে এবং এটি কত বড়ো অপরাধ? লিবিয়ার মানুষ তা জেনে সোচ্চার হওয়ার আগেই তারা নিজেদের তৈরি এ নতুন আইনকে কার্যকর করে ফেলে এবং শরী‘আহ আইনকে বাতিল করে দেয়।


তুরস্ক থেকেও হঠাৎ করে ইসলামী আইনকে বাতিল করা হয়; সেখানে সুইস আইন কার্যকর করা হয়। তুরস্কের বিচারকরাও দীর্ঘদিন পর্যন্ত এ সুইস নাগরিক আইন ভালোভাবে বুঝে উঠতে পারেনি। আঙ্কারার পার্লামেন্টও এ কথা স্বীকার করেছে। দণ্ডবিধির ক্ষেত্রে তুরস্ক ইতালির আইন গ্রহণ করেছিল। তুরস্ক এ আইন কার্যকর করার কিছুদিন পরেই ইতালি এ আইনে ব্যাপক পরিবর্তন আনে। এ সংশোধনীতে গির্জার নীতিগুলোকেই আইন হিসেবে কার্যকর করা হয়। 


গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টিকেই আমি আমার এ গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনার প্রয়াস চালিয়েছি। ভূমিকাতে আমি আইনের আভিধানিক ও পারিভাষিক পরিচয় উল্লেখ করেছি। ভূমিকার সারকথা হলো, পৃথিবীতে ইসলামী আইনই হলো একমাত্র আইন যাকে আইন নামে অভিহিত করা যায়। সমাজে বিচার ফয়সালা করার জন্য কেবল এ আইনই বাধ্যতামূলক হওয়ার যোগ্য ও উপযুক্ত। আমি আইনবিদদের কাছে আশা করবো, তারা যেন আইনের প্রকৃত পরিচয় জানার চেষ্টা করে, তাহলে তারা অবশ্যই ইসলামী আইনকে আইন হিসেবে গ্রহণ করবে।


এরপর আমি মানবসৃষ্ট আইনের উৎসগুলো আলোচনা করেছি। মানবসৃষ্ট আইনের উৎস হলো সেসব সামাজিক প্রথা, ঐতিহ্য, বিজ্ঞজনদের প্রবচন ও বাণী যা সমাজ বিজ্ঞানীরা লিপিবদ্ধ করেছেন। অন্যদিকে ইসলামী শরী‘আহর উৎস হলো স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামিন।


এরপর আমি আইন বিজ্ঞানের পরিধি নিয়ে আলোচনা করেছি। আইন বিজ্ঞান হলো সমাজ বিজ্ঞানেরই একটি অংশ। তবে ইসলামে আইন বিজ্ঞান অন্যান্য বিজ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্য ও সংগতিপূর্ণ। এসবের মাঝে পরস্পর কোনো দ্বন্দ্ব নেই। এরপর আমি আইনের ইতিহাস ও আইনের প্রয়োজনীয়তা আলোচনা করেছি। ইতিহাসের আলোকেও একমাত্র কুরআনই যে বিশুদ্ধ আইন, তাও প্রমাণ করেছি।


ভূমিকার পর আমি আমার গ্রন্থটিকে ছয়টি পরিচ্ছেদে বিভক্ত করেছি।


প্রথম পরিচ্ছেদ: আধুনিক ও প্রাচীন যুগের প্রসিদ্ধ মানবসৃষ্ট আইনগুলো এ পরিচ্ছেদে আলোচনা করেছি। তাতে দেখিয়েছি, সবগুলো মানবসৃষ্ট আইনই মানুষের ওপর জুলুম ও অত্যাচার করেছে। কোনো আইনই ইনসাফ করেনি।


দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: এ পরিচ্ছেদে আমি মুসলিম দেশগুলোতে মানবসৃষ্ট আইন প্রবর্তনের ইতিহাস আলোচনা করেছি। তাতে দেখিয়েছি, শাসকরা সর্বপ্রথম রাজতন্ত্রের নামে ইসলামী আইন থেকে দূরে যাওয়া শুরু করেছে এবং সর্বপ্রথম মুসলিম দেশে তাতারী আইন কার্যকর করা হয়েছে।


পরবর্তী সময়ে তুরস্ক, মিশর, লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, জর্ডান, ইন্ডিয়া ও পাকিস্তানে কীভাবে মানবসৃষ্ট আইন অনুপ্রবেশ করেছে তাও বর্ণনা করেছি। অথচ পূর্বে এসব দেশগুলো ইসলামী শরী‘আহ আইন অনুযায়ীই পরিচালিত হতো। মুসলিম দেশগুলোতে আধুনিক দণ্ডবিধি আইন কার্যকর করার ঘটনা দিয়ে এ পরিচ্ছেদের আলোচনা শেষ করেছি। আধুনিক দণ্ডবিধি আইন জিনা ও ব্যভিচারের মতো অপরাধকে কোন দৃষ্টিতে দেখে এবং অপরাধীকে কী শাস্তি দেয় তাও বর্ণনা করেছি। যাতে আধুনিক দণ্ডবিধি আইন ও ইসলামী শরী‘আহর দণ্ডবিধি আইনের মধ্যকার পার্থক্য সুস্পষ্ট হয়ে যায়।


তৃতীয় পরিচ্ছেদ: শরী‘আহ আইনকে বাতিলের জন্য কুচক্রী খ্রিষ্টানরা যে পরিকল্পনা ও উদ্যোগগুলো গ্রহণ করেছিল, আমরা সেগুলো এ পরিচ্ছেদে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। তাদের সে পরিকল্পনা ও উদ্যোগগুলো জেনে পাঠক খুব সহজেই বুঝতে পারবেন, তারা কীভাবে আমাদের সাথে চক্রান্ত করেছে; কীভাবে আমাদেরকে প্রতারিত করেছে। এসব জেনে আমরা তাদের ভবিষ্যৎ চক্রান্ত ও প্রতারণা সম্পর্কে খুব সহজেই সচেতন হতে পারব বলে আশাবাদী।


চতুর্থ পরিচ্ছেদ: এ পরিচ্ছেদে আমরা মিশরের নাগরিক আইন নিয়ে আলোচনা করেছি। আমাদের এ পরিচ্ছেদের আলোচনা থেকে পাঠক সহজেই জানতে পারবেন, কীভাবে কাফিররা আমাদের ওপর মানবসৃষ্ট আইনকে বাধ্যতামূলক করেছে; কীভাবে তা কার্যকর করেছে; কীভাবে এই খোদাদ্রোহী আইন প্রণয়নে আমাদের নেতৃবৃন্দকে বাধ্য করেছে; কীভাবে তারা সত্য গোপন করেছে; কীভাবে মুসলিম জাতিকে প্রতারিত করেছে। কাফিররা সর্বপ্রথম মিশরে মানবসৃষ্ট আইনের ভিত স্থাপন করেছিল। কারণ মিশর ছিল আরব বিশ্বের প্রবেশ দ্বার। ফলে খুব সহজেই মিশরের আইন অন্যান্য আরবদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। এ মানবসৃষ্ট আইন ও আইন প্রবর্তনকারীদের ব্যাপারে আলেমদের অবস্থান কী, তাও আমরা এ পরিচ্ছেদে আলোচনা করেছি।


পঞ্চম পরিচ্ছেদ: মানবসৃষ্ট আইনের ব্যাপারে মুসলমানদের দৃষ্টিভঙ্গি কী, তা আমরা এ পরিচ্ছেদে আলোচনা করেছি। আমরা মনে করি, এ মানবসৃষ্ট আইন আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনে অক্ষম। কাফিররা আমাদের মুসলিম দেশসমূহে যে আইন কার্যকর করে স্থায়ী করে দিয়েছে, তা আল্লাহর নাজিল করা শরী‘আহ আইন বিরোধী। মুসলিম উম্মাহর কল্যাণের জন্যই কাফিরদের প্রবর্তিত আইনকে বাতিল করে আল্লাহর নাজিল করা শরী‘আহ কার্যকর করা জরুরি। এ মহতি কাজের জন্য মুসলিম উম্মাহর ঐক্যবদ্ধ হওয়া জরুরি। প্রত্যেকেই যদি এই মানবসৃষ্ট আইনকে বাতিল বলে ঘোষণা করে এবং তা বাতিল হওয়ার স্বপক্ষে প্রমাণ উপস্থাপন করে, তাহলেই কেবল এ আইনকে অকার্যকর করা সম্ভব। যারা মানবসৃষ্ট আইনের আলোকে বিচার ফয়সালা করে; এ আইনকে কার্যকর করে; এ আইন প্রণয়ন করে, তাদের ব্যাপারে ইসলামের বিধান কি? তাও আমরা এ পরিচ্ছেদে আলোচনা করেছি। এ আইনের অনুসরণ করায় ব্যক্তি কখন কুফরি করে মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত থাকে, আর কখন মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত থাকে না, তা আলোচনার মধ্য দিয়েই এ পরিচ্ছেদের সমাপ্তি টেনেছি।


ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ: এ পরিচ্ছেদের আলোচনা পূর্ববর্তী পাঁচটি পরিচ্ছেদের আলোচনাকে জোরালো ও শক্তিশালী করেছে। মানবসৃষ্ট আইনের ব্যাপারে আধুনিক ও প্রাচীন যুগের বিখ্যাত আলেমদের অভিমতগুলো এ পরিচ্ছেদে আলোচনা করেছি। আলেমদের এ অভিমতগুলো ইতিঃপূর্বে কোথাও একসাথে গ্রন্থবদ্ধ হয়নি। এ অভিমতগুলো আমি বিভিন্ন গ্রন্থে বিক্ষিপ্ত অবস্থায় পেয়েছি। এগুলো আমাদের আলোচ্য বিষয়কে আরও সুস্পষ্ট করেছে। মানুষ ও জিনদের শয়তান বুদ্ধিজীবীরা রাতদিন পরিশ্রম করে যে প্রতারণার কৌশলগুলো আবিষ্কার করেছিল, আলেমদের এ অভিমতগুলো সে কৌশলগুলোকে উন্মোচন করে দিয়েছে। এ সবগুলো অভিমতের মূলকথা একটিই এবং তা একটি বিষয়কেই শক্তিশালী করে। মানবসৃষ্ট আইনের ব্যাপারে যারা এখনও সন্দিহান, তাদের সে সন্দেহ দূরীকরণে আলেমদের এ অভিমতগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আমি আশাবাদী।


আমি আল্লাহর কাছে বিনীত প্রার্থনা করছি, তিনি যেন এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আলোচনা করার; ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে যে শৃঙ্খল পরিয়ে মুসলমানদের আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে, তা উন্মোচন করার আল্লাহ তা‘আলা আমাকে তাওফিক দান করেন। হে আল্লাহ! তুমি আমার এ কাজটিকে কবুল করো; এর মাধ্যমে তোমার বান্দাদের উপকৃত করো। আমার এ কাজে যে ত্রুটি ও অসম্পূর্ণতা রয়েছে, তা ক্ষমা করে দাও। তুমিই তো আমার সর্বোত্তম বন্ধু ও সর্বোত্তম সাহায্যকারী।


বিনীত


ড. উমর সুলায়মান আশকার, কুয়েত, ২ই জিলহজ, ১৪০৩ হিজরি, ৯ই সেপ্টেম্বর, ১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দ।



 


 


আল-কুরআনের নুরের ছটা


اِنِ الۡحُكۡمُ اِلَّا لِلّٰهِ‌ اَمَرَ اَلَّا تَعۡبُدُوۡۤا اِلَّاۤ اِيَّاهُ‌ ذٰلِكَ الدِّيۡنُ الۡقَيِّمُ


‘আইন জারি করার অধিকার একমাত্র আল্লাহর। আর (এ আইনের বলেই) তিনি আদেশ দিচ্ছেন, তোমরা আল্লাহ ছাড়া আর কারও ইবাদত করো না। এটাই হচ্ছে সঠিক জীবনবিধান।’ 


اَفَحُكۡمَ الۡجَـاهِلِيَّةِ يَـبۡغُوۡنَ‌ؕ وَمَنۡ اَحۡسَنُ مِنَ اللّٰهِ حُكۡمًا لِّـقَوۡمٍ يُّوۡقِنُوۡنَ.


‘তবে কি তারা পুনরায় জাহেলিয়াতের বিচার ব্যবস্থা তালাশ করছে? অথচ যারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, তাদের কাছে আল্লাহ তা‘আলার চাইতে উত্তম বিচারক আর কে হতে পারে?’ 


فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤۡمِنُوۡنَ حَتّٰى يُحَكِّمُوۡكَ فِيۡمَا شَجَرَ بَيۡنَهُمۡ ثُمَّ لَا يَجِدُوۡا فِىۡۤ اَنۡفُسِهِمۡ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيۡتَ وَيُسَلِّمُوۡا تَسۡلِيۡمًا‏.


‘না, তোমার মালিকের শপথ, তারা কিছুতেই ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না তারা তাদের যাবতীয় মতবিরোধের ফয়সালায় তোমাকে বিচারক মেনে নেবে। অতঃপর তুমি যা ফয়সালা করবে সে ব্যাপারে তাদের মনে আর কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকবে না। বরং তোমার সিদ্ধান্ত তারা সর্বান্তঃকরণে মেনে নেবে।’ 


اَمۡ لَهُمۡ شُرَكٰٓؤُا شَرَعُوۡا لَهُمۡ مِّنَ الدِّيۡنِ مَا لَمۡ يَاۡذَنۡۢ بِهِ اللّٰهُ‌ؕ.


‘তাদের কি এমন কোনো শরিক আছে, যারা তাদের জন্য এমন কোনো জীবন বিধান প্রণয়ন করে দিয়েছে, যার অনুমতি আল্লাহ তা‘আলা দেননি।’ 


فَبَدَّلَ الَّذِيۡنَ ظَلَمُوۡا قَوۡلاً غَيۡرَ الَّذِىۡ قِيۡلَ لَهُمۡ فَاَنۡزَلۡنَا عَلَى الَّذِيۡنَ ظَلَمُوۡا رِجۡزًا مِّنَ السَّمَآءِ بِمَا كَانُوۡا يَفۡسُقُوۡنَ.


‘অতঃপর জালিমরা এমন কিছু ব্যাপার রদবদল করে ফেলল, যা না করার জন্যই তাদের বলা হয়েছিল। এরপর আমিও আসমান থেকে তাদের ওপর গজব নাজিল করলাম, যারা জুলুম করেছিল। এটা ছিল তাদের গুনাহের ফল।’ 



ভূমিকা 


আইনের পরিচয়, উৎপত্তি ও প্রয়োজন


আইনের পরিচয়


আভিধানিক পরিচয়: অভিধানবেত্তাদের মতে (قانون) তথা ‘‘কানূন” শব্দটি মূলত আরবি শব্দ নয়। ইবনে মানযুর রহ. লিসানুল আরব গ্রন্থে বলেছেন, قانون (কানূন) শব্দটি একবচন। অর্থ হলো বিধান, অনুশাসন, আইন ইত্যাদি। বহুবচনে قوانين (কাওয়ানীন) ব্যবহৃত হয়। শব্দটি মূলত আরবি শব্দ নয়।  তিনি আরও বলেছেন, প্রসিদ্ধ ভাষাবিদ ইবনে সাইয়্যিদিহি মনে করেন, এ শব্দটি বিদেশি ভাষা থেকে আরবিতে এসেছে। 


আবুল বাকা আল-কুফী মনে করেন, কানূন শব্দটি আরবিতে সুরিয়ানী (সিরীয় ভাষা) ভাষা থেকে এসেছে।  আইনের অনেক অধ্যাপক মনে করেন, ল্যাটিন শব্দ কঅঘঙঘ থেকে আরবি কানূন শব্দটি গৃহীত হয়েছে। আবার অনেকের মতে ফরাসি শব্দ ঈঅঘঙঘ থেকে আরবি কানূন শব্দের উৎপত্তি।  আমার মতে এ মতটি বিশুদ্ধ নয়। কারণ ল্যাটিন ভাষার সাথে আরবদের সম্পর্ক বিরল ও অপ্রতুল। ইসলামের শুরু যুগে আরবরা ল্যাটিন ভাষা সম্পর্কে কিছুই জানত না, যদিও আমরা এমনটি বলছি না। আরবরা প্রথম যুগেই কানূন শব্দটির ব্যবহার করেছে। আইনের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করে বেশ কয়েকজন গবেষক এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছেন, কানূন শব্দটি মূলত ইউনানি (গ্রিক) শব্দ। সুরিয়ানী ভাষার মাধ্যমে এটি আরবিতে প্রবেশ করেছে। 


সুরিয়ানী ভাষায় কানূন শব্দটি প্রথমে কার্যপ্রণালি অর্থে ব্যবহৃত হতো। পরবর্তী সময়ে এটি সব ধরনের বিচার আচার সংক্রান্ত বিষয়ে ব্যবহৃত হওয়া শুরু হয়। এভাবেই বিচারের জন্য মৌলিক ও শাখা নীতিমালা প্রণয়ন শুরু হয়। আর বিচার সংক্রান্ত এসব নীতিমালাকে আইন, বিধান, অনুশাসন ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হয়। পরবর্তী সময়ে প্রতিনিয়ত আইনের উৎকর্ষ হতে থাকে এবং তার নানা শাখা প্রশাখা বের হতে থাকে। 


ল্যাটিন ভাষায় কানূন শব্দটি নীতি, রীতি, ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা অর্থে ব্যবহৃত হতো। আর খ্রিষ্টীয় আমলে ফরাসি ঈঅঘঙঘ শব্দটি ইউরোপীয় গির্জাগুলোর সিদ্ধান্ত বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত হতো। 


আরবি ভাষায় কানূন শব্দটি এসব অর্থের পাশাপাশি আরও অন্য অর্থেও ব্যবহৃত হয়। জুরজানি বলেন, কানূন হলো এমন সামষ্টিক নিয়ম, যা তার সকল সদস্যের ওপর সমানভাবে প্রয়োগ করা হয়। যেমন নাহুবিদরা বলে থাকে, ফায়েল বা কর্তা সব সময় মারফু’ তথা (সাধারণত) পেশযুক্ত হয়; মাফঊল তথা কর্তৃবাচ্য সব সময় মানসুব বা (সাধারণত) জবরযুক্ত হয়; আর মুজাফ ইলাইহি  সব সময় মাযরুর বা (সাধারণত) জেরযুক্ত হয়। 


সুতরাং কানূন হলো সুবিন্যস্ত রীতিনীতি, সামষ্টিক রায় ইত্যাদি। ফিরোজ আবাদী সংক্ষিপ্ত আকারে অত্যন্ত চমৎকারভাবে কানূনকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তিনি বলেছেন, কানূন হলো সবকিছুর পরিমাপক। 


উলামা ও জ্ঞানী ব্যক্তিগণ এই কানূন শব্দকে ধর্মীয় ক্ষেত্রে, চিকিৎসার ক্ষেত্রে, প্রচলিত রীতি পদ্ধতি বোঝানোর ক্ষেত্রে, এমনকি বিশ্ব পরিচালনার নীতি বা সূত্র বোঝানোর ক্ষেত্রেও ব্যবহার করে থাকেন। বিভিন্ন মাহফিল, সভা, সমাবেশ, বক্তৃতার মঞ্চে, বইয়ের পৃষ্ঠায়, পত্রিকার পাতায় বারবার এ শব্দটির ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। যেমন মাধ্যাকর্ষণ সূত্র (খধি ড়ভ এৎধারঃধঃরড়হ) (কানূন), স্ফুটনাঙ্ক (খধি ড়ভ ইড়রষরহম ঢ়ড়রহঃ) (কানূন), প্লবতা আইন (খধি ড়ভ ইঁড়ুধহপু) (কানূন) ইত্যাদি।  এসব ক্ষেত্রে কানূুন দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, বহুল প্রচলিত মূলনীতি। যে মূলনীতির ওপর ভিত্তি করেই বারবার একটি নির্দিষ্ট শৃঙ্খলা রক্ষিত হয়। এগুলোকে অন্য অর্থে ঐশী নীতি বলা হয়। যে নীতির ওপর ভিত্তি করেই বিশ্ব পরিচালিত হয়; পরিচালিত হয় পৃথিবীর মানুষ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,


سُنَّةَ اللّٰهِ فِى الَّذِيۡنَ خَلَوۡا مِنۡ قَبۡلُۚ وَلَنۡ تَجِدَ لِسُنَّةِ اللّٰهِ تَبۡدِيۡلًا‏.


‘(তোমার) আগে যারা অতিবাহিত হয়ে গেছে, তাদের ব্যাপারেও এ ছিল আল্লাহ তা‘আলার নীতি। আল্লাহ তা‘আলার এ নিয়মে তুমি কখনো কোনো ব্যতিক্রম দেখবে না।’ 


আল্লাহ প্রদত্ত এ রীতিনীতির কখনো কোনো পরিবর্তন পরিবর্ধন হয় না। তবে আল্লাহ যদি পরিবর্তন পরিবর্ধনের ইচ্ছা করেন তাহলে ভিন্ন কথা।  যেমন আল্লাহ তা‘আলা বনী ইসরাইলের জন্য সমুদ্রকে বিদীর্ণ করেছিলেন; ইবরাহীম আলাইহিস সালাম আগুনে নিক্ষিপ্ত হলে আগুনের পোড়ানোর শক্তি উঠিয়ে নিয়েছিলেন।


আইনের পারিভাষিক পরিচয়:


আইন বিজ্ঞানীদের মতে কানূন দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সামষ্টিক মূলনীতি বা নিয়ম। যার মাধ্যমে একের বৈশিষ্ট্যকে সমগোত্রীয় সবার বৈশিষ্ট্য বলে চি‎িহ্নত করা হয়। এবং এ বৈশিষ্ট্যটি স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় সমগোত্রীয় সবার মাঝে বিদ্যমান থাকে। কোনো সদস্য যখন এ বৈশিষ্ট্যের অনুগামী হতে অস্বীকার করে, তখন রাষ্ট্র তাকে এ বৈশিষ্ট্যের অনুগামী হতে বাধ্য করে। 


আইন বিজ্ঞানীদের মতে কানূনের পারিভাষিক সংজ্ঞা হলো নিম্নরূপ:-



  • কারও মতে, পারস্পরিক আচরণের প্রত্যেক ঐ নিয়মকে কানূন বলা হয়, যা সাধারণভাবে সবার জন্য পালন করা বাধ্যতামূলক।

  • কারও মতে, প্রত্যেক ঐ সামষ্টিক নিয়মকে কানূন বলে, যা একটি নির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। যেমন, ফৌজদারি আইন, নাগরিক আইন, উত্তরাধিকার আইন ইত্যাদি। এমন নির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে যত মূলনীতি বা নিয়ম প্রবর্তিত হয়েছে, তার সবগুলোই তাদের মতে আইন বা কানূন।

  • কারও মতে, কানূন বলতে যেকোনো শরয়ী বিধানকে বোঝায়। যা সমন্বিতভাবে সমস্ত অধিকার সংক্রান্ত আইনকে অন্তর্ভুক্ত করে। উদাহরণ হিসেবে ইসলামী শরী‘আহ ফৌজদারি আইন, নাগরিক আইন, রাষ্ট্রীয় আইন এককথায় সমস্ত আইনকেই অন্তর্ভুক্ত করে। সুতরাং ইসলামী শরী‘আহ হলো এসবগুলো আইনের সমন্বিত নাম।

  • উসমানী শাসনামলে রাষ্ট্রীয় আইন বোঝানোর ক্ষেত্রে কানূন শব্দটি অধিক পরিমাণে ব্যবহৃত হওয়া শুরু হয়। এ সময় থেকেই রাষ্ট্রীয় আইন ও শরী‘আহ আইনের মধ্যে পার্থক্য করার প্রচলন হয়। বিশেষ করে যখন কোনো বিষয়ে রাষ্ট্রীয় আইন ও ইসলামী আইন মতবিরোধপূর্ণ হতো, তখন এই পার্থক্য পরিলক্ষিত হতো। 


ইসলামী শরী‘আহই প্রকৃত আইন


আইন বিজ্ঞানীদের মতে, আইন যেসব হুকুম বা বিধানকে অন্তর্ভুক্ত করে তা এমন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রকাশিত হয়, মানুষের ওপর যাদের বলপ্রয়োগ করার ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব রয়েছে; প্রবর্তিত বিধানের বিরোধিতা করলে শাস্তি দেওয়ারও ক্ষমতা রয়েছে। আইন বিজ্ঞানীগণ আরও মনে করেন, আইন যেসব বিধানকে অন্তর্ভুক্ত করে তা সাধারণভাবে সবার জন্য প্রযোজ্য ও স্থিতিশীল হয়। 


আইন বিজ্ঞানীদের আইনের সংজ্ঞাগুলো পর্যালোচনা করে আমরা বলবো, ইসলামী শরী‘আহ আইন ছাড়া পৃথিবীর কোনো আইনই আইন হওয়ার যোগ্য ও উপযুক্ত নয়। কারণ ইসলামী শরী‘আহ আইনগুলোই কেবল প্রবর্তিত হয়েছে রাব্বুল ইবাদ তথা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের থেকে। আর বিশ্বজগতের প্রভু আল্লাহ তা‘আলাই কেবল মানুষের জন্য আইন প্রণয়নের যোগ্যতা ও অধিকার রাখেন। তার প্রবর্তিত আইনের যারা বিরোধিতা করে, তিনিই কেবল তাদের শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। আইন প্রণয়নের এ অধিকার আল্লাহ তা‘আলা তার বান্দাদের কাউকেই দেননি। ফেরেশতাদেরকেও দেননি; কোনো মানুষকেও দেননি। সুতরাং এ মূলনীতির আলোকে আমরা বলতে পারি, মানুষের প্রণীত সকল আইনই অগ্রহণীয়, অকার্যকর ও বাতিল। কারণ, তাদের আইন প্রণয়নের কোনো অধিকারই নেই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,


اَمۡ لَهُمۡ شُرَكٰٓؤُا شَرَعُوۡا لَهُمۡ مِّنَ الدِّيۡنِ مَا لَمۡ يَاۡذَنۡۢ بِهِ اللّٰهُ‌ؕ.


‘তাদের কি এমন কোনো শরিক আছে, যারা তাদের জন্য এমন কোনো জীবন বিধান প্রণয়ন করে দিয়েছে, যার অনুমতি আল্লাহ তা‘আলা দেননি।’  


মানুষের প্রণীত আইন বাতিল ও অকার্যকর হওয়ার আরেকটি কারণ হলো, তা সবার জন্য সমান উপযোগী ও সমভাবে সবার ওপর প্রযোজ্য হয় না; তা স্থিতিশীলও হয় না। কারণ আইন বিজ্ঞানীদের মতে কোনো বিধান আইন হওয়ার জন্য শর্ত হলো, অবশ্যই তা স

Chapter 001 / 13