কিছু কথা না বললেই নয়
এক.
জমানাটা আবু হানীফা, মালেক, শাফেয়ী ও আহমদ ইবনে হাম্বল রাহিমাহুমুল্লাহকে নিয়ে লেখার জমানা নয়। এর কারণ দু'টি ১. হিজরি শতাব্দীতে এসে তাঁদের মকাম ও মর্যাদার মাঝে নতুন করে সংযোজনের মতো কিছুই নেই। আর সলফের কিতাবাদিতে উল্লিখিত বক্তব্যমালার পুনরাবৃত্তিতে তাঁদের সম্মানের কোনো অংশ বৃদ্ধি পাওয়ার কোনো আশা নেই। ২. চার ইমামের বিষয় নিয়ে মুসলিম-অমুসলিমের কোনো বিতর্ক নেই। অথচ যামানাটা হচ্ছে এখন কুফরি শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করার।
এরপরও লিখতে হলো। পরিস্থিতির তাগিদেই লিখতে হলো। যখন বেদ্বীনী ও বদদ্বীনীর সয়লাবের বিপরীতে রাসূল-এর উম্মতকে মসজিদে টেনে আনাটাই বড় জটিল বিষয়, তখন তাদেরকে মসজিদ থেকে বের করার বহুমুখী অনাকাঙ্ক্ষিত ষড়যন্ত্রের মুখে আমরা পড়ে আছি। তাও আবার হাদীস অনুসরণের শিরোনামে, রাসূলের আনুগত্যের শিরোনামে।
হাদীস সংকলনের প্রচলিত ধারার যিনি উদ্ভাবক তাঁর ব্যাপারে বলা হতে লাগল, তিনি হাদীস জানতেন না। জারহ ও তা'দীলের ক্ষেত্রে যিনি সর্বপ্রথম স্পষ্ট বক্তব্য দিলেন, তাঁর ব্যাপারে বলা হতে লাগল, তিনি হাদীস বর্ণনাকারীদের সবল-দুর্বল চিনেন না। সহীহ ও দুর্বল হাদীস নিরূপণের সবচেয়ে শক্তিশালী মূলনীতি যিনি উদ্ভাবন করলেন এবং বাস্তবায়ন করলেন, তাঁর ব্যাপারে বলা হতে লাগল, তিনি দুর্বল হাদীস দিয়ে দলিল দেন।
কুরআন ও হাদীসের আলোকে যেসব মাসআলার উপর সাহাবা, তাবেয়ীন ও সালাফে সালেহীন শতাব্দীর পর শতাব্দী আমল করে আসছেন, সেসব মাসআলার ব্যাপারে বলা হতে লাগল, এগুলো হাদীস পরিপন্থি। আমলকারীদেরকে বলা হতে লাগল, তারা হাদীস বিরোধী। তাওহীদের যে কালিমা পড়ে সবাই মুসলমান হলো সে কালিমার কারণে মুসলমানদেরকে মুশরিক বলা হতে লাগল।
পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। শোনা যাচ্ছে, হাদীসের অনুসরণের পতাকা হাতে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় কালেমার 'মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ' অংশটি মুছে দেওয়া হচ্ছে। হোদায়বিয়ার সন্ধির সময় কাফেররা কালেমার যে অংশটি মুছে দেওয়ার জন্য জেদ ধরেছিল, মুছে ফেলতে বাধ্য করেছিল; সে অংশটি মুছে
ফেলার জন্য একটি পক্ষ খুবই তৎপর হয়ে উঠেছে। বোঝা যাচ্ছে না কাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য এতটা তৎপরতা। না জানি কোনো অদৃশ্য হাতের খেলনা হয়ে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট পক্ষটি।
মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ-এর বিশ্বাসকে একজন মুসলমানের মন থেকে মুছে দিয়ে সেই বিশ্বাসের স্থলে তারা কী বসাতে চায়? তাওহীদের বিশ্বাসের সঙ্গে মুহাম্মদের রেসালাতের প্রতি বিশ্বাসের সর্ম্পক কি তাদের দৃষ্টিতে খুবই বেমানান? প্রশ্নগুলো খুবই জটিল এবং পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ। এ সব কিছুই চলছে হাদীস অনুসরণের নামে।
তাই ইমাম আবু হানীফাকে নিয়ে লেখা শুধুই একজন মাযহাবের ইমামকে নিয়ে লেখা নয়; বরং এ লেখা হচ্ছে, কোটি কোটি ঈমানদারের ঈমানের হেফাজত, অযাচিত সংশয়ের নিরসন, অবিশ্বাসের বীজ উৎপাটন, কুরআন-হাদীস সঠিক অর্থে বাস্তবায়নের প্রতি আহ্বান, সাহাবা-তাবেয়ীনসহ দ্বীনের সকল ধারকবাহকগণের প্রতি আস্থা সৃষ্টি, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের সঠিক মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ প্রত্যেক ব্যক্তি ও দলের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তৈরি এবং নিরক্ষর কিংবা ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত নন- এমন সাধারণ মানুষের ঈমান ও আমল নিয়ে যারা ছিনিমিনি খেলছে, তাদের প্রকৃত চেহারা উন্মোচনের প্রচেষ্টা।
দুই.
২০০৮ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে অথবা ২০০৯ খ্রিস্টাব্দের শুরুর দিকে ইমাম আবূ হানীফা রহিমুহুল্লাহকে নিয়ে লেখার শখ জেগেছে। বিশেষত হাদীস বিষয় নিয়ে আবু হানীফা (র.)-এর উপর যে জুলুম হয়েছে, সেই জুলুমের বিভৎস চেহারা দেখেই মূলত আগ্রহটা তীব্রতর হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ! হিম্মত করে ফেললাম এবং লিখেও ফেললাম। বিষয়ের জটিলতার কিছুটা অনুভব থাকলেও দ্বীনের ধারকবাহকদের প্রতি জুলুমের এ ধারা কোনোভাবেই চলতে দেওয়া যায় না-কমপক্ষে আমার কাছে বিষয়টি এমনই মনে হয়েছে। এছাড়া কোনো ইলমি কাজে হাত দিতে একজন মুহাক্কিক আলেমের যতটা হিম্মতের প্রয়োজন হয়, আমার মতো যারা বাঘ-ছাগলের ব্যবধান বোঝে না, তাদের জন্য ততটা হিম্মতের প্রয়োজন হয় না। তাই ইলম ও ইলমের উপকরণ থেকে অনেক দূরে থেকেও সাহস করে কাজটিতে হাত দিয়েছি।
হাত দিয়ে বুঝতে পেরেছি জটিলতা এক জায়গায় নয়। এমন কিছু জটিলতারও মুখোমুখি হয়েছি, যার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম না। যাহোক, এরই মাঝে ছয়/সাত বছর কেটে গেছে। মনে হচ্ছে, সূর্যের মুখ এবার দেখা যাবে। আল্লাহ কবুল করুন! দেরি হোক, তবু হোক!
তিন.
এ বইয়ে আমরা যে কাজগুলো করার চেষ্টা করেছি, সেগুলো হচ্ছে-
১. আবু হানীফা (র.)-এর জন্মের প্রেক্ষাপটসহ তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনী উপস্থাপন।
২. তাঁর হাদীস বিষয়ক খেদমতগুলোকে বিশেষভাবে তুলে ধরা।
৩. হাদীস বিষয়ে তাঁর অবস্থানকে সমকালের অন্যান্যদের অবস্থানের সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণ।
৪. প্রতিটি উদ্ধৃতিকে তার মূল উৎস পর্যন্ত বা তার কাছাকাছি পর্যন্ত নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
৫. ভুল বোঝাবুঝির আশঙ্কা থেকে মুক্ত থাকার জন্য অনেক ছোটখাটো বিষয়কেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে খুলে খুলে বলা হয়েছে।
৬. ইতিহাসের মূলনীতির আলোকে চলার চেষ্টা করা হয়েছে।
চার.
বইটির পরবর্তী সংস্করণেকাজগুলো করার আশা আছে:
১. যেসব উদ্ধৃতিকে তার মূল উৎস পর্যন্ত পৌছানো যায়নি সেগুলোকে তার মূল উৎস পর্যন্ত পৌঁছানোর চেষ্টা করা।
২. উদ্ধৃত উদ্ধৃতিগুলোর বর্ণনাগত অবস্থান নির্ণয়।
৩. আবু হানীফাকে নিয়ে ছড়ানো সন্দেহ-সংশয়ের অপনোদনের জন্য একটি অধ্যায় তৈরি।
৪. পাঠকবর্গের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আরো কিছু বিষয়ের সংযোজন।
পরিশেষে পাঠকবর্গের জন্য সব ধরনের মন্তব্য, প্রতিক্রিয়া ও পরামর্শের দরজা উন্মুক্ত রেখে বইটি সবার হাতে তুলে দিলাম। আল্লাহ তা'আলা কবুল করুন! ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দিন! সহীহ কথাগুলো থেকে উপকৃত হওয়ার তাওফীক দান করুন! আমীন। ওয়ালহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন।
যুবায়ের হোসাইন
মুহাদ্দিস, জামেয়া মাদানিয়া দত্তের হাট, সদর, নোয়াখালী
বইটি যেভাবে সাজানো
বিষয়
নবীর ওয়ারিশ.
ইলমে ওহীর প্রহরী
ইমাম আবু হানীফা
উম্মতের তিনটি স্তর
প্রথম স্তর..
প্রথম উদারহণ
দ্বিতীয় উদাহরণ,
ইমাম আবু হানীফা (র.).
একটি হাদীসের ভবিষ্যদ্বাণী
শাফেয়ী মতাবলম্বী ইমাম সুয়ূতী (র.)-এর মন্তব্য।
শাফেয়ী মতাবলম্বী ইবনে হাজার মক্কী (র.)-এর মন্তব্য.
খায়রুল কুরূনের প্রদীপ,
ইমাম আবূ হানীফা (র.)-এর জন্মকালে যেসব সাহাবী বেঁচেছিলেন..
জন্মস্থানে ইলমের চর্চা.
সাহাবায়ে কেরামের শহর কুফা নগরী..
কৃষ্ণা নগরীর প্রতি ওমর (রা.)-এর মনোযোগ,
আলী (রা.) ও ইবনে মাসউদ (রা.)-এর কুফা নগরী,
ইলমের অপর নাম কৃষ্ণা নগরী.
সে কালের ইলম চর্চা..
আকীদা, আমল ও হাদীসচর্চা
আলকামা ইবনে কায়েস (র.).
আবূ হানীফা (র.)-এর জন্মকালে কৃষ্ণা নগরী...
ইবনে আব্বাস (রা.)-এর ভাষ্য......
আফফান ইবনে মুসলিম (র.)-এর বক্তব্য
ইমাম বুখারী (র.)-এর বক্তব্য....
ইলমের শহরে আবু হানীফা (র.)-এর বেড়ে ওঠা,
আবু বকর ইবনে আবু দাউদ (র.)-এর বক্তব্য...
শিক্ষাজীবন
নবীর ওয়ারিশ
আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ আরাবী ইরশাদ করেন-
إِنَّ الْعُلَمَاءَ وَرَثَةُ الْأَنْبِيَاءِ corate" وَإِنَّ الْأَنْبِيَاءَ لَمْ يُوَرَّثُوا دِينَارًا وَلَا دِرْهَمًا وَإِنَّمَا وَرَّثُوا الْعِلْمَ.
ওয়ারিশ। আর নবীগণ কোনো স্বর্ণমুদ্রা ও রৌপ্যমুদ্রার ওয়ারিশ বানান না; তাঁরা বরং ইলমের ওয়ারিশ বানান।"
রাসূল -]সুনানে আবূ দাউদ, কিতাবুল ইলম ২/৫১৩ ابَابٌ فِي فَضْلِ الْعِلْمِ থেকে প্রাপ্ত ইলমের এ মিরাশ-উত্তরাধিকারই ওলামায়ে কেরাম যুগে যুগে তাঁদের মাঝে বণ্টন করে আসছেন। فَمَنْ أَخَذَهُ أَخَذَ بِحَطَّ وَافِرِ “যিনি তা আহরণ করতে পেরেছেন তিনি উত্তম ভাগটিরই অধিকারী হয়েছেন।" কেউ কুরআনের তাফসীর আহরণ করেছেন, কেউ হাদীস আহরণ করেছেন, আবার কেউ কুরআন হাদীস থেকে উদ্ভাবিত মানবসমাজের শরয়ী জীবন তথা ইসলামি জীবন আত্মস্থ করেছেন, যে জীবনব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য নবী রাসূলগণকে পাঠানো হয়েছে।