নূতন ভারতীয় সংস্করণের ভূমিকা
'বিশ্বনবী'র নূতন ভারতীয় সংস্করণের ভূমিকা লিখিতে বসিয়া আজ শুধু বারে বারে আল্লাহ তালার করুণার কথাই মনে পড়িতেছে। কোন পুস্তকের আটটি সংস্করণের ভূমিকা লিখিবার সৌভাগ্য খুব কম লেখকের ভাগ্যেই ঘটিয়া থাকে।
এই সংস্করণের আগাগোড়া এবার আমি দেখিয়া দিয়াছি, স্থানে স্থানে বিছু কিছু সংশোধন, পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করিয়াছি। কিছু কিছু নূতন তথ্যও সংযোজিত হইয়াছে। গতবার পুস্তকের জ্যাকেট না দেওয়ায় অনেকেই ক্ষুন্ন হইয়াছিলেন। এবার সে অভাব পূর্ণ করা হইল। মুদ্রণ-পারিপাট্যও পূর্বাপেক্ষা এবার উন্নত হইয়াছে।
বিশ্বনবীর অনেক স্থানে কুরআন শরীফের আয়াত উদ্ধৃত করা হইয়াছে: মূল আরবী আয়াত না দিয়া শুধু বাংলা তর্জমা দিয়াছি। সেই সব তর্জমার কোন কোন স্থানে আল্লাহ সম্বন্ধে 'আমরা' (বহুবচন) ব্যবহৃত হইয়াছে। যেমন:
"এবং যে কেহ এই দুনিয়ার পুরস্কার চায়, তাহাকে আমরা তাহাই দেই এবং যে কেহই পরকালের পুরস্কার চায়, তাহাকেও আমরা তাহাই দেই। আমরা কৃতজ্ঞদিগকে পুরস্কৃত করিব।" -(৩:১৪৪)
এখানে আল্লার পরিবর্তে 'আমরা' শব্দের ব্যবহার দেখিয়া অনেক পাঠকের মনেই প্রশ্ন জাগে। তাঁহারা ভাবেন: আল্লাহ্, এক, অদ্বিতীয় ও লা-শরীক; কাজেই তাঁহার সম্বন্দ্বে 'আমরা' (বহুবচন) ব্যবহার করা যাইতে পারে না। তাই অনেকের ধারণা ইহা তর্জমার ভুল। কিন্তু তর্জমায় কোন ভুল হয় নাই। তর্জমা ঠিকই আছে। অন্য একটি গূঢ় কারণে 'আমি' স্থলে 'আমরা' লিখিতে হইয়াছে। আরবী ভাষায় সম্মানীয় ব্যক্তিদিগের বেলায় বহুবচন ব্যবহৃত হয়। ইহাকে সম্মানার্থে বহুবচন বলে। অন্যান্য ভাষাতেও এ বাক্-রীতি প্রচলিত আছে। কোন রাজকীয় ঘোষণায় সম্রাট, সম্রাজ্ঞী বা রাষ্ট্রপতি উত্তম পুরুষের বহুবচন (আমরা) ব্যবহার করেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ মহারাণী ভিক্টোরিয়ার ঘোষণা-পত্রের (Queen's Proclamation) উল্লেখ করা যাইতে পারে। লেখানে 'We' (আমরা) ব্যবহৃত হইয়াছে। বলা বাহুল্য, এই রীতি কুরআন শরীফের নিজস্ব। আল্লাহ, নিজেই এই বাচন-ভংগী শিক্ষা দিয়াছেন। 'আমি’
না বলিয়া 'আমরা' বলিয়াছেন। কাজেই, তর্জমার ভুল হইয়াছে-পাঠক- যেন সেরূপ মনে না করেন। মূলে বহুবচন আছে বলিয়াই তর্জমাতেও বহুবচন আসিয়াছে। উপরের আয়াতের ইংরাজী তর্জমাতেও 'We' শব্দ আছে:
"And whoever desires the reward of this world We will give him of it and whoever desires the reward of the hereafter, We will give him of it, and We will reward the grateful."
-Moulana Muhammad Ali
আল্লামা ইউসুফ আলি একই রীতি অনুসরণ করিয়াছেন। উপরোক্ত আয়াতের অনুবাদে তিনি লিখিতেছেন: "If any do desire a reward in this life, We shall give it to him......".
বস্তুতঃ অনুবাদ ঠিক রাখিতে হইলে মূলের সহিত তাহার মিল রাখিতেই হইবে। বলা বাহুল্য, এই কারণেই বাংলা তর্জমায় আল্লার স্থানে বহুবচন ব্যবহার করা হইয়াছে। বহু সতর্কতা সত্ত্বেও এবারেও কিছু কিছু ছাপার ভুল রহিয়া গেল। তবে লেগুলি বিশেষ মারাত্মক নয়। পাঠক-পাঠিকা সেগুলি নিজেরাই সংশোধন করিয়া লইবেন। আরয ইতি-
বিনীত
গোলাম মোস্তফা
প্রকাশকের নিবেদন
অনেক চেষ্টার পরে বহু আকাঙ্ক্ষিত 'বিশ্বনবী'র তৃতীয় মুদ্রণ প্রকাশিত হল। 'বিশ্বনবী'র পুরাতন সংস্করণ বহুদিন নিঃশেষিত হয়ে যাওয়ায় গ্রন্থকার এই পুস্তকের পরিকল্পনা সম্পূর্ণ নূতন করে করেন; তারই সঙ্গে সঙ্গতি রেখে 'বিশ্বনবী'র পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত সংস্করণ প্রকাশিত হল।
আশা করি বহুদিনের অদম্য পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের ফল এই 'বিশ্বনবী' পড়ে হযরত মুহম্মদ ও ইসলামধর্ম সম্বন্ধে পাঠকের সুস্পষ্ট ধারণা জন্মাবে। সাফল্য ও অসাফল্যের বিচার পাঠকবর্গই করবেন। কাগজের মূল্য ও মুদ্রণজনিত অন্যান্য আনুসঙ্গিক খরচ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় বইয়ের দাম সঙ্গত কারণেই বাড়াতে বাধ্য হলাম। যাঁরা এই কাজে আমাদের সহযোগিতা করেছেন তাঁদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
পরিচ্ছেদ: ১
আবির্ভাব
রবিউল্-আউয়াল মাসের বারো তারিখ। সোমবার।
শুক্লা-দ্বাদশীর অপূর্ণ-চাঁদ সবেমাত্র অন্ত গিয়াছে। সুবহে সাদিকের সুর্খ নূরে পুব-আসম্মান রাঙা হইয়া উঠিতেছে। আলো-আঁধারের দোল খাইয়া ঘুমন্ত প্রকৃতি আঁখি মেলিতেছে।
বিশ্ব-জগত আজ নীরব। নিখিল সৃষ্টির অন্তর-তলে কি-যেন-একটা অতৃপ্তি ও অপূর্ণতার বেদনা রহিয়। রহিয়া হিল্লোলিত হইয়া উঠিতেছে। কোন্ স্বপ্নসাধ আজও যেন তার মিটে নাই। যুগযুগান্তের পুঞ্জীভূত সেই নিরাশার বেদনা আজ যেন জমাট বাঁধিয়া দাঁড়াইয়া আছে।
আরবের মরু-দিগন্তে মক্কা-নগরীর এক নিভৃত কুটীরে একটি নারী ঠিক এই সময়ে সুখস্বপ্ন দেখিতেছিলেন।
নাম তাঁর আমিনা।
তিনি দেখিতেছিলেন: অসীম আকাশের ওপার হইতে জ্যোতির্ময়
ফিরিশতারা যেন মিছিল করিয়া অগ্রসর হইতেছে। মুখে তাহাদের অপূর্ব উল্লাস, কণ্ঠে তাহাদের 'মারহাবা' ধ্বনি। কোন্ অনাগত পথিকের আগমন-
১
মূহুর্ত যেন আসন্ন হইয়া উঠিয়াছে; নিখিল ধরণী অনিমেষ নয়নে তাই তাঁহার আসা-পথ চাহিয়া আছে। দিকে দিকে পুলক-স্পন্দন জাগিয়া উঠিতেছে। চন্দ্রসূর্য, গ্রহতারা, আকাশ-বাতাস, নদ-নদী, বন-উপবন-সবাই আজ পুলকিত, শিহরিত-হিল্লোলিত। একটা লার্থকতা ও পূর্ণতার সম্ভাবনায় সারা সৃষ্টি আজ চঞ্চল।
গ্রহনক্ষত্র ছাড়িয়া আকাশ ঘুরিয়া মিছিল অবশেষে আরব-গগনে আশিয়া দাঁড়াইল; তারপর ধীরে ধীরে আমিনার কুটীর-প্রাংগণে অবতরণ করিল। এক অপূর্ব জ্যোতিতে ঘরখানি আলোকিত হইয়া গেল। আমিনা অবাক হইয়া চাহিয়া রহিলেন। কেন আজ তাঁহার ক্ষুদ্র গৃহে এত আলো- এত সমারোহ? বিবি হাজেরা, বিবি রহিমা, বিবি মরিয়ম-কেন এই পুণ্যময়ী নারীরা বিহিশত ছাড়িয়া তাঁহার শিয়রে আজ দণ্ডায়মান? বিস্ময়ে ও আনন্দে আমিনার হৃদয় ভরিয়া গেল।
এই সুন্দর মুহূর্তে আমিনা এক পুত্ররত্ব প্রসব করিলেন। আঁখি মেলিয়া চাহিয়া দেখিলেন: কোলে তাঁহার পূণিমার চাঁদ হাসিতেছে।
সঙ্গে সঙ্গে সারা সৃষ্টির অন্তর ভেদিয়া ঝঙ্কত হইল মহা-আনন্দধ্বনি: "খুশ, আমদিদ, ইয়া রসুলুল্লাহ।" "মারহাবা ইয়া হাবীবুল্লাহ্!" বিহিশতের ঝরোকা হইতে ছর-পরীরা পুষ্পবৃষ্টি করিতে লাগিল; অনন্ত আকাশের অনন্ত গ্রহনক্ষত্র তস্লিম জানাইল। বিশ্ববীণাতারে আগমনী-গান বাজিয়া উঠিল। নীহারিকা-লোকে, তারায় তারায়, অণুমরমাণুতে আজ কাঁপন লাগিল। সবারই মধ্যে আজ যেন কিসের একটা আবেগ, কিসের একটা চাঞ্চল্য। সবারই মুখে আজ বিস্ময়! সবারই মুখে আজ কি-যেন-এক চরম পাওয়ার পরম তৃপ্তি সুপ্রকট। প্রভাত-সূর্য রশ্মি-করাঙ্গুলি বাড়াইয়া নব-অতিথির চরণ-চুম্বন করিল; বনে বনে পাখীরা সমবেত কণ্ঠে গান গাহিয়া উঠিল; সমীরণ দিকে দিকে তাঁহার আবির্ভাবের খুশ-খবর লইয়া ছুটিয়া চলিল। ফুলেরা স্নিগ্ধ হাসি হাসিয়া তাহাদের অস্তরের গোপন সুষমা নজরানা পাঠাইল! নদ-নদী ও গিরি-নির্ঝ'র উচ্ছ্বসিত হইয়া আনন্দ-গান গাহিতে গাহিতে সাগর- পানে ছুটিয়া চলিল। স্থলে-জলে, লতায়-পাতায়, তৃণে-গুন্মে, ফুলে ফলে আজ এমনি অবিশ্রান্ত কানাকানি আর জানাজানি। যার আসার আশায় যুগযুগান্ত ধরিয়া লারা সৃষ্টি অধীর আগ্রহে প্রহর গণিতেছিল সে যেন আসিয়াছে-এই অনুভূতি আন্ত সর্বয় প্রকট।
আরবের মরুদিগন্তে আজ এ কী আনন্দোজ্জাল! মরি! মরি! আজ তার কী গৌরবের দিন। সবচেয়ে যে নিঃস্ব, সবচেয়ে যে রিক্ত তাহারই অন্তর আজ এমন করিয়া ঐশ্বর্যে ভরিয়া গেল! চরম রিক্ততার অধিকারেই কি আজ সে এমন চরম পূর্ণতার গৌরব লাভ করিল! বেদুঈন বালারা অকস্মাৎ ঘুম হইতে জাগিয়া উঠিয়া অবাক বিস্ময়ে চাহিয়া রহিল। দিগন্ত- বিস্তৃত উষর মরুর দিকে দিকে আজ এ কী অপূর্ব দৃপ্ত। এত আলো, এত রূপ কোথা হইতে আসিল আজ? আজিকার প্রভাত এমন স্নিগ্ধ পেলব হইয়া দেখা দিল কেন? খর্জুর-শাখায় আজ এত শামলিমা কে ছড়াইয়া দিল? মেষ-শিশুরা আজ এত উল্লসিত কেন? নহরে-নহরে এত স্নিগ্ধ বারিধারা আজ কোথা হইতে আসিল? কিসের উল্লাস আজ দিকে দিকে?
আকাশ-পৃথিবীর সর্বত্র আজ এমনই আলোড়ন। ছন্দ-দোলায় সারা সৃষ্টি আজ যেন দোল খাইতে লাগিল। জড়-চেতন সকলের মধ্যেই আজ যেন অভূতপূর্ব এক শান্তির হিল্লোল বহিয়া গেল। কোথাও ব্যথা নাই, বেদনা নাই,, দুঃখ নাই, অভাব নাই; সব রিক্ততার আজ যেন অবসান ঘটিয়াছে, সব অপূর্ণতা আজ যেন দূরীভূত হইয়াছে। বিশ্বভুবনে আল্লার অনন্ত আশীর্বাদ ও অফুরন্ত কল্যাণ নামিয়া আসিয়াছে। আকাশে-বাতাসে, জলে-স্থলে, লতায়-পাতায়, জড়-চেতনে আজ যেন সার্থকতা ও পরিপূর্ণতার এক মহাতৃপ্তি ভাসিয়া বেড়াইতেছে। মহাকাল-ঋতুচক্রে আজ কি প্রথম বসন্ত দেখা দিল? প্রকৃতির কুঞ্জবনে তাই কি আজ এত শোভা, এত সমারোহ? সেই বনে আজ নানা রঙের ফুল ফুটিয়াছে, আর সবার মাঝখানে কেবলমাত্র একটি গুলাবই রূপে-রসে-বর্ণে-গন্ধে পূর্ণ বিকশিত হইয়া বিশ্বভূবন উজালা করিয়া আছে!
কে এই নব অতিথি-কে এই বিহিশতী নূর-যাহার আবির্ভাবে আজ দ্যুলোক-ভূলোকে এমন পুলক শিহরণ লাগিল?
এই মহামানবশিশুই আল্লার প্রেরিত সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সর্বশেষ পয়গম্বর- নিখিল বিশ্বের অনন্ত কল্যাণ ও মূর্ত আশীর্বাদ-মানবজাতির চরম এবং পরম আদর্শ-স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি-বিশ্বনবী-
-হযরত মুহম্মদ-
(সাল্লাল্লাহু আলায় হি অ-সাল্লাম!)
পরিচ্ছেদ: ২
কোন্ আলোকে?
কে এই মুহম্মদ? তাঁহার প্রকৃত স্বরূপ কী? সত্য পরিচয় কী?
একদিকে দেখিতেছি তিনি আল্লার প্রেরিত রসুল। অপরদিকে দেখিতেছি তিনি পৃথিবীর মানুষ-রক্তমাংস দিয়া গড়া তাঁর শরীর। একদিকে তিনি স্রষ্টার, অপরদিকে তিনি সৃষ্টির। কোন্ আলোকে এখন আমরা তাঁহাকে গ্রহণ করিব? কোন্ চক্ষে দেখিব? তিনি কি মানুষ, না অতিমানুষ?
এই জটিল দার্শনিক তত্ত্বের অবতারণা আমরা এখানে করিব না। এই পুস্তকের দ্বিতীয় খণ্ডে পাঠক ইহার বিস্তৃত আলোচনা দেখিতে পাইবেন। তুবে এ সম্বন্ধে এখানে দুই-একটি কথা না বলিয়াও আমরা অগ্রসর হইতে পারিতেছি না। হযরত মুহম্মদের জীবনালোচনা করিতে হইলে আমাদের দৃষ্টিকোণ সম্বন্ধে প্রথমেই সজাগ হইতে হইবে; অন্যথায় আমরা তাঁহাকে সম্যকরূপে চিনিতে ও বুঝিতে পারিব না-তাঁহার জীবনের অনেক ঘটনাই আমাদের কাছে হয়ত বিসদৃশ বোধ হইবে।
হযরত মুহম্মদকে সত্য করিয়া চিনিবার পক্ষে সবচেয়ে বড় বাধাই হইতেছে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গীর এই বিভ্রম। আমরা দোষে-গুণে জড়িত মানুষ, সীমাবদ্ধ আমাদের জ্ঞান। তাই স্বভাবতই তাঁহাকে আমাদের মত করিয়া দেখি এবং আমাদের মাপকাঠিতে বিচার করি। কিন্তু সত্যই কি তিনি 'আমাদের মত' মানুষ ছিলেন?
কেমন করিয়া বলি? যাঁহার জীবনে এত অতিমানবিক উপাদান রহিয়াছে, তাঁহাকে শুধুই 'মানুষ' বলিতে পারি কি?
তবে তিনি কি মানুষ ছিলেন না? তাহাই বা কি করিয়া বলা যায়? তাঁহার জীবনের প্রতিটি ঘটনা ইতিহাসের আলোকে সমুজ্জল। কে ইহা অস্বীকার করিবে?
• হযরত মুহম্মদের নামোল্লেখের সঙ্গে সঙ্গে তাঁহার উপর দরুদ পাঠ করা প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য। আশা করি পাঠক-পাঠিকা নিষ্ঠার সহিত সে কর্তব্য পালন করিবেন।
অতএব একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, হযরত মুহম্মদকে যাহারা কেবলমাত্র 'অতিমানুষ' রূপে মানব-গণ্ডীর উর্ধ্বে তুলিয়া ধরিবেন, তাহারাও যেমন ভুল করিবেন, যাহারা তাঁহাকে আমাদেরই মত 'মাটির মানুষ' বলিয়া ধরার ধুলায় টানিয়া রাখিবেন, তাহারাও ঠিক তেমনই ভুল করিবেন।
হযরত মুহম্মদ ছিলেন মানুষ ও অতিমানুষের মিলিত রূপ। স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে তিনি ছিলেন যোগসূত্র। অন্য কথায়: তিনি ছিলেন আজার রাজপ্রতিনিধি বা খলিফা (viceregent) এই ভঙ্গিতে দেখিলেই তাঁহাকে চেনা সহজ হয়।
আল্লাহ্, নিরাকার। তিনি কাহাকেও জন্ম দেন না, কাহারও দ্বারা তিনি জাতও নহেন। তিনি এক, অথচ সৃষ্টি বহু ও বিচিত্র। স্রষ্টা নিরাকার, অথচ সৃষ্টি লাকার।
কেমন করিয়া 'অরূপ হইতে রূপে, নিরাকার হইতে সাকারে পৌঁছা যায়? এপারে-ওপারে কি করিয়া সংযোগ রাখা সম্ভব হয়?
একজন বাহন বা medium-এর এখানে নিতান্ত প্রয়োজন। খেয়াতরীর মাঝির মতন এপারে-ওপারে সে পারাপার করে।
এই মাধ্যমই হইতেছেন হযরত মুহম্মদ। স্রষ্টা ও সৃষ্টির মাঝে তিনি মিলনসূত্র। একদিকে যেমন তিনি আল্লার প্রতিনিধি, অপরদিকে তেমনই তিনি আমাদেরও প্রতিনিধি। একদিকে তিনি আল্লার বাণী বহন করিয়া আনিয়া সৃষ্টির প্রাণের দুয়ারে পৌঁছাইয়া দেন, অপরদিকে তেমনি সৃষ্টির ব্যথা- বেদনা ও অভাব-অভিযোগ আল্লার দরবারে পেশ করেন। কাজেই তাঁহাকে লইয়া স্রষ্টা ও সৃষ্টি-উভয়েরই এত প্রয়োজন।
কুরআন শরীফে তাই বলা হইয়াছে:
"কূল ইয়া আইওহায়াসে। ইন্নি রাসুলুল্লাহি ইলাইকুম্ জামীয়া"
অর্থাৎ: হে মানবজাতি, আমি তোমাদের সকলের নিকট আল্লার প্রেরিত রসুল।
অন্যত্র তেমনি বলা হইয়াছে:
"কূল ইন্নামা আনা বাশারুম মিলুকুম ইউহা ইলাইয়া"
অর্থাৎ বল, হে মুহম্মদ! নিশ্চয়ই আমি তোমাদের মত একজন মানুষ যা'র উপর অহি-নাজিল হয়।