মোস্তফা চরিত

A+ A-
প্রথম পরিচ্ছেদ / 1
প্রথম পরিচ্ছেদ / 2
প্রথম পরিচ্ছেদ / 3
প্রথম পরিচ্ছেদ / 4

উপক্রমণিকা


কোন ধর্ম্মের বিশেষত্ব ও সত্যতার সম্যক উপলব্ধি করিতে হইলে, সেই ধর্ম্মের প্রবর্তক যিনি, সর্ব্বপ্রথমে তাঁহাকে সম্যরূপে চিনিয়া, বুঝিয়া লইতে হয়। কতকগুলি বিশ্বাস, কতকগুলি অনুষ্ঠান এবং কতকগুলি বিষয়ের জ্ঞান-এই ত্রিধারার একত্র সমাবেশ-ফলের নামই-"ধর্ম্ম”। আমরা মোছলেম এবং আমাদের ধর্ম্মের নাম-এছলাম। এছলামের বিষয় সম্যকরূপে অবগত হইতে হইলে-এছলামের সত্যতা ও বিশেষত্বে বিশ্বাস স্থাপন করিতে হইলে, সর্বপ্রথমে মোস্তফা-চরিতের মাহাত্ম্য ও বৈশিষ্ট্যগুলিকে সম্যকরূপে জ্ঞাত হইতে-অন্ততঃ জ্ঞাত হইবার চেষ্টা করিতে হইবে।


ঐতিহাসিক হিসাবে (ভক্তের হিসাবে নহে) জগতের সাধুসজ্জন ও মহাপুরুষগণের জীবন ও চরিত্র আলোচনার চেষ্টা করিলে, প্রায়ই দেখিতে পাওয়া যায় যে, কিংবদন্তি-সঙ্কলক ঐতিহাসিক ও অন্ধভক্তগণের দ্বারা তাঁহাদের প্রকৃত জীবন ও জীবনের আদর্শস্থানীয় আসল জিনিষগুলি হয়ত একেবারে ঢাকা পড়িয়া গিয়াছে, অথবা এমন পৰ্ব্বতপরিমাণ কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের আবর্জনারাশির তলে তাহা চাপা পড়িয়া গিয়াছে- যাহার উদ্ধার একেবারে অসাধ্য না হইলেও সহজসাধ্যও নহে।
   


মানুষের দেহের ন্যায় তাহার আভ্যন্তরীণ প্রবৃত্তিগুলিও খুব বাবু। এই বাবুগিরির খাতিরে আমাদের জ্ঞান ও বিবেক, স্বাধীন আলোচনা ও গবেষণার দ্বারা, অসত্যের পুঞ্জীকৃত ন্যাক্কারজনক আবর্জনারাশির নিম্ন হইতে সত্যের উদ্ধার সাধন করার জন্য, বড়একটা পরিশ্রম স্বীকার করিতে

প্রথম পরিচ্ছেদ / 5

চাহে না। তাহা, কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের গাড়ী পাল্কীগুলিতে আরোহণ করতঃ পরমানন্দে গা ছাড়িয়া দিয়া শুইয়া পড়ে। ইহা মানবীয় দুর্ব্বলতার সর্ব্বাপেক্ষা মারাত্মক দিক। মহাপুরুষগণের জ্ঞানের গভীরতা, তাঁহাদের চরিত্রের মহিমা, তাঁহাদের জীবনের ব্রত ও সাধনা-এ সব লইয়া আলোচনা করিতে গেলে অনেক হাঙ্গামা উপস্থিত হয়। পক্ষান্তরে মহাপুরুষকে ভক্তি করিতে হইলে, তাঁহার জীবনীকে একেবারে বাদ দিয়া, গেলেও চলে না। তাই ভক্তগণ খুব সহজে উভয় কুল রক্ষা করার জন্য, কতকগুলি আজগৈবী অনৈতিহাসিক অলৌকিক ও অস্বাভাবিক গল্পগুজব ও উপকথার আবিষ্কার করেন এবং উচ্চকণ্ঠে মহাপুরুষের নামের জয়জয়কার করিয়া মনে করিয়া লন যে, তাঁহাকে যথেষ্ট ভক্তি করা হইল। ক্রমে কথিত কুসংস্কারমূলক উপকথা ও অলৌকিক কেচ্ছা-কাহিনী, মহাপুরুষগণের জীবনের প্রকৃত শিক্ষণীয় বিষয়গুলিকে দূরে সরাইয়া দিয়া ইতিহাস ও পুরাণ পুস্তকসমূহের পৃষ্ঠায় স্থায়ীভাবে অধিকার জমাইয়া বসে। কালক্রমে তাহাই 'শাস্ত্র' হইয়া দাঁড়ায় এবং সেগুলি সম্বন্ধে সাধারণ সংস্কারের বিপরীত কোন কথা বলিতে চেষ্টা করিলে, তাহাকে শাস্ত্রদ্রোহী ধর্মদ্রোহী ও কাফের বলিয়া নির্দ্ধারণ করা হয়। যুক্তির দিক দিয়া কোন কথা বলিয়া এখানে উদ্ধার পাইবার আশাও খুব কম। তুমি ঐতিহাসিক, দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক যুক্তি প্রদান করিয়া এমন কি মূল শাস্ত্রগ্রন্থের শত শত অকাট্য প্রমাণ উদ্ধৃত করিয়া দেখাও, কিন্তু 'ভক্তের'" নিকট সবই বিফল! তিনি এক কথায় সকল যুক্তির উত্তর দিয়া বলিবেন-প্রাচীন মুনি ঋষি ও শাস্ত্রকারগণ 'ছালফে ছালেহীন'-কি এসকল কথা বুঝিতেন না? তোমরা বাপু কি তাঁহাদের অপেক্ষা অধিক বিদ্বান হইয়াছ? বাপ পিতামহ চৌদ্দপুরুষ যাহা করিয়া ও বলিয়া গয়াছেন- তাহাকেই আঁড়াইয়া জড়াইয়া ধরিতে হইবে, 'স্বধৰ্ম্মে নিধনং শ্রেয়ঃ পরোধৰ্ম্মো ভয়াবহঃ।' ইহাই হইতেছে মানুষের জ্ঞান ও বিবেকের অতি শোচনীয় অধঃপতন।


জগতের সমস্ত উন্নত ও প্রাচীন জাতির পতন ও মৃত্যু, মূলতঃ একমাত্র এই রোগেই সংঘটিত হইয়াছে। রোমান ও গ্রীকের মৃত্যু, এহুদি ও হিন্দুর সর্ব্বনাশ এই অন্ধবিশ্বাস তাক্লিদ (গতানুগতি) ও স্থিতিস্থাপকতার জন্যই সংঘটিত হইয়াছে। খৃষ্টান যতদিন গির্জার বাহিরেও খৃষ্টানধর্ম্মের প্রভাব স্বীকার করিয়াছিল, ততদিন তাহার দুর্দশার ইয়ত্তা ছিল না। এখন সেই খৃষ্টান ধর্ম্মের সমস্ত উপকথা ও আজগৈবী আলৌকিকতাগুলিকে গির্জার গুদামঘরে পুরিয়া চাবিতালা বন্ধ করিয়া দিয়াছে। তাহার কর্মজীবনের সহিত ধর্ম্মের আর কোন সম্বন্ধ নাই।


যিনি জীবনে একবারও কোরআন শরীফের কোন একটি অধ্যায় পাঠ করিয়াছেন, তিনি স্বীকার করিতে বাধ্য হইবেন যে, এই শ্রেণীর গতানুগতি স্থিতিস্থাপকতা ও অন্ধবিশ্বাসের প্রতিবাদ ও মূলোচ্ছেদ করাকেই কোন নিজের প্রধান ও প্রথম কর্তব্য বলিয়া নির্ধারিত করিয়াছে। কিন্তু, হইলে কি হইবে, আজ মুছলমান নিজের জন্মগত ও পারিপার্শ্বিক কুসংস্কাবের চাপে তাহা একেবারে ভুলিয়া বসিয়াছে-ভুলিয়া বসাকেই, এমনকি তাহার বিরুদ্ধাচরণ করাকেই, আজ তাহার

প্রথম পরিচ্ছেদ / 6