মাসিক আল-আহনাফ - অক্টোবর ২০২৩

A+ A-

ইমাম আবূ হানীফাহ রহ. কি কোনো সাহাবীর সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন?


এম এ নূরুন্নবী 


 


ইমামুল আ'যম আবূ হানীফাহ রহ. এর তাবে'ঈ হওয়া নিয়ে যখনই আলোচনা উঠে তখনি লা-মাযহাবদের একাংশ সাফ বলে দেয় যে, তিনি তাবে'ঈ নন; কারণ, কোনো সাহাবীর সাথে আবূ হানীফা রহ. এর কোনোদিন সাক্ষাৎ হয়নি, এমনকি হযরত আনাস ইবনে মালিক রা.-এর সাথেও না। একথার প্রমাণ হিসেবে তারা হিজরী চতুর্থ শতকের মুহাদ্দিস ইমাম দারাকুতনী রহ. এর একটি বক্তব্য পেশ করে থাকে। সেটির উত্তরে একটু পরেই আসছি। এখানে যে ব্যাপারটি সর্বাগ্রে প্রণিধানযোগ্য, তা হচ্ছে, ইমাম আবূ হানীফাহ রহ. মুসলিম উম্মাহ'র সর্বসম্মতিক্রমেই একজন ‘তাবে'ঈ’। কাজেই ইমাম দারাকুতনী রহ.-এর একক ও নিজেস্ব কোনো মত কোনোভাবেই উম্মাহ’র সর্বসম্মত ও প্রতিষ্ঠিত কোনো সিদ্ধান্তের উপর জয়লাভ করতে পারে না।


প্রসঙ্গত, কুরবানীর শর'ঈ বিধান হচ্ছে ‘ওয়াজিব’। বিপরীতে লা-মাযহাবদের মতে কুরবানী হচ্ছে ‘নফল’। হানাফী, মালেকী এবং হাম্বলী তিন মাযহাবেরই ইমামগণ এবং লা-মাযহাবদের সব চেয়ে তুমুল জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব শায়খুল ইসলাম ইবনে তায়মিয়্যাহ (রহ.)-ও বলেছেন কুরবানী ওয়াজিব। যেমন, ইবনে তায়মিয়্যাহ রহ. বলেন -


و اما الأضحية ، فالاظهر وجوبها الخ


অর্থাৎ “অতিব সুস্পষ্ট কথা এ যে, কুরবানী ওয়াজিব।” [মাজমূ'উল ফাতাওয়া: ২৩/১৬২]


কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, লা-মাযহাবদের নিকট এ ক্ষেত্রে শায়খ ইবনে তায়মিয়্যাহ রহ. এর উক্ত মতের কানাকড়িও মূল্য নেই। কারণ, ইবনে তায়মিয়্যাহ সাহেবের ঐ মতটি হানাফী মাযহাবের পক্ষে। আর এদিকে উম্মাহ’র সর্বসম্মত মতের বিপরীতে ইমাম দারাকুতনী রহ. এর একক মতটি লা-মাযহাবদের নিকট মজবুত দলীল! কেননা এ মতটিকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলেই সম্ভব হবে (বাহ্যত) ইমাম আবূ হানীফাহ রহ.-কে তাবে'ঈর মর্যাদা থেকে বঞ্চিত রাখা! এবার মূল আলাপে যাওয়া যাক-


 


১. ইমাম আবূ যাকারিয়া ইবনে ইয়াহইয়া আল আযদী রহ.


ইমাম আবূ যাকারিয়া ইবনে ইয়াহইয়া ইবনে ইবরাহীম ইবনে আহমদ আল আযদী (মৃত: ৫৫০ হিজরী) তাঁর منازل الأئمة الأربعة للأزدي কিতাবে লিখেছেন-


قال أبو حنيفة: حججت مع أبي سنة ست وتسعين، ولي ست عشرة سنة، وإذا أنا بشيخ قد اجتمع الناس عليه، فقلت لأبي: من هذا الرجل؟ فقال: هذا رجل قد صحب محمدا صلى الله عليه وسلم يقال له عبد الله بن الحارث


অর্থ: আবূ হানীফা রহ. বলেন, আমি আমার পিতার সাথে ৯৬ হিজরীবর্ষে হজ্জ করেছি, তখন আমি ষোল বছরের তরুণ। ইত্যবসরে আমি একজন প্রবীণ (শায়খ) ব্যক্তিকে কাছে পেলাম। লোকজনও তাঁর নিকট এসে জমায়েত হল। তখন আমি আমার পিতাকে জিজ্ঞেস করলাম, এ লোকটি কে? তিনি বললেন, এ লোকটি হযরত মুহাম্মদ সা.-এর একজন সাহাবী, নাম আব্দুল্লাহ ইবনে হারেস।


তিনি আরও লিখেছেন,


فابو حنيفة أدرك الصحابة رضى الله عنهم فهو من التابعين


অর্থ: ইমাম আবূ হানীফাহ রহ. সাহাবীদের সাক্ষাৎ লাভ করেছেন। কাজেই তিনিও তাবে'ঈদের অন্তর্ভুক্ত। [মানাযিলুল আইম্মাহ: ৩৫]


 


২. আল্লামা জালালুদ্দীন আস-সুয়ূতী রহ.


ইমাম সুয়ূতী (রহ.) تبييض الصحيفة بمناقب أبي حنيفة কিতাবে লিখেছেন,


قال حمزة السهمي: سمعت الدارقطني يقول: "لم يلق أبو حنيفة أحدا من الصحابة إلا إنه رأى أنسا بعينه ولم يسمع منه


অর্থ: হামযাহ আস-সাহমী বলেন, আমি ইমাম দারাকুতনী রহ. থেকে শুনেছি, তিনি বলেন, ইমাম আবূ হানীফাহ রহ. সাহাবীদের মধ্যে আনাস ইবনে মালেক ছাড়া আর কারো সাথে সাক্ষাৎ লাভ করেননি, তবে তিনি আনাস রা.-কে স্বচক্ষে দেখেছেন, কিন্তু তিনি তাঁর কাছ থেকে শ্রবণ করেননি।


পাঠকবৃন্দ! ইমাম দারাকুতনী রহ. এর নাম ভেঙ্গে লা-মাযহাব বন্ধুরা যে মিথ্যা অভিযোগ করেছিলো, আলহামদুলিল্লাহ, ইমাম সুয়ূতি রহ. সেই উত্তর আজ থেকে প্রায় ৫৩৪ বছর আগেই দিয়ে যান। ইমাম দারাকুতনী রহ. মূলত হযরত আনাসের রা. (মৃত্যু: ৯৩ হিজরী) এর সাথে ইরাকের বসরা শহরে ইমাম আবূ হানীফা রহ. এর সাক্ষাৎ হওয়াকে অস্বীকার করেননি, বড়জোর আনাস থেকে কোনো কিছু রেওয়ায়েত করাকে অস্বীকার করা হয়েছে। একজন বরেণ্য ইমাম হিসেবে যেকোনো ইমামই নিজেস্ব মত পেশ করতে পারেন। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ঐতিহাসিক ক্ষেত্রে এর প্রশস্ততা ছিল, আছে এবং থাকবেই। আর এ ক্ষেত্রে উসূল বা মূলনীতি হচ্ছে, তাফারুদাত তথা কারো একক মতের উপর নয় বরং জমহূরের (সর্বসম্মত) মতের উপরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হবে। আফসোস! লা-মাযহাব বন্ধুদের এই মূলনীতি সম্পর্কে যদি কিঞ্চিৎ জ্ঞানও থাকতো!


 


৩. ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী রহ.


ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী রহ. লিখেছেন,


أدرك أبو حنيفة جماعةً من الصحابة؛ لأنه ولد بالكوفة سنة ثمانين من الهجرة، وبها يومئذٍ: عبد الله بن أبي أوفى، فإنه مات بعد ذلك بالاتفاق. وبالبصرة يومئذ أنس بن مالك، ومات سنة تسعين أو بعدها. وقد أورد ابن سعد بسند لا بأس به: أن أبا حنيفة رأى أنسا، وكان غير هذين من الصحابة بعِدَّةٍ من البلاد أحياء


অর্থ: আবূ হানীফা রহ. সাহাবীদের একটি জামা'আতের সাক্ষাৎ লাভ করেছেন। কারণ তিনি জন্মগ্রহণ করেন কূফায় ৮০ হিজরীতে আর সেখানেই ছিলেন (সাহাবী) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আবী আওফা রা.। তিনি সর্বসম্মতিক্রমে মারা গিয়েছিলেন ৮০ হিজরীর (অনেক) পরেই (অর্থাৎ ৮৭ হিজরীতে)। আর সে সময় বসরায় ছিলেন হযরত আনাস বিন মালেক রা.। তিনি ইন্তেকাল করেন ৯০ হিজরীর পরে। ইবনু সা'আদ এটি এমন সনদে বর্ণনা করেছেন যাতে কোনো সমস্যা নেই। মোটকথা হল, আবূ হানীফাহ রহ. আনাসকে দেখেছিলেন। এ দু'জন ছাড়া অধিক সংখ্যক সাহাবী সেই শহরে জীবিত ছিলেন।


ইমাম যাহাবী রহ. আরও লিখেছেন, 


و كان من التابعين لهم ان شاء الله باحسان فانه صح انه رأى انس بن مالك اذ قدمها أنس رضى الله عنه


অর্থ: তিনি (ইমাম আ'যম) ইন-শা-আল্লাহ তাবে'ঈগণের অন্তর্ভুক্ত। কারণ, এ কথা বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত, হযরত আনাস বিন মালেক যখন কূফায় আগমন করলেন তখন ইমাম আবূ হানীফাহ তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেন। [মানাকিবে ইমাম আবী হানীফাহ লিয-যাহাবী ৯-১০]


 


৪. ইবনে হাজার মাক্কী রহ. 


শারেহে মিশকাত ইমাম ইবনে হাজার মক্কী রহ. স্বীয় রচনা الخيرات الحسان في مناقب النعمان-এর মধ্যে লিখেছেন, 


أدرك الإمام الأعظم ثمانية من الصحابة، منهم أنس وعبد الله بن أبي أوفى وسهل بن سعيد، وأبو الطفيل، انتهى


অর্থ: ইমাম আবূ হানীফাহ রহ. যে আটজন সাহাবীর সাক্ষাৎ লাভ করেছিলেন তারা হলেন, হযরত আনাস ইবনে মালিক (মৃত: ৯৩ হিজরী), আব্দুল্লাহ ইবনে আবি আওফা (মৃত: ৮৭ হিজরী), সহল ইবনে সা'আদ (মৃত: ৮৮ হিজরী), আবু তুফায়েল (মৃত: ১১০ হিজরী), আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়দি (মৃত: ৯৯ হিজরী), জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (মৃত: ৯৪ হিজরী) এবং ওয়াসেলা ইবনুল আসকা (মৃত: ৮৫ হিজরী)।❞ [শরহে মুসনাদে আবী হানীফাহ লিল-মুল্লা, পৃষ্ঠা: ৫৮১]


 


৫. ইমাম হাফিয মুহাম্মাদ ইবনে ইউসূফ সালেহী আশ-শাফে'ঈ রহ.


ইমাম হাফিয মুহাম্মদ ইবনে ইউসুফ সালেহী আশ-শাফেয়ী (মৃত: ৯৪২হিজরী) বলেন,


اعلام رحمك الله تعالى أن الامام أبا حنيفة رضى الله عنه تعالى عنه من التابعين و صح كما قال الحافظ الناقد ابو عبد الله الذهبى أنه رأى أنس بن مالك رضى الله عنه و هو صغير


অর্থ: আল্লাহ তাঁর উপর রহম করুন। এ কথা জেনে নাও যে, ইমাম আবূ হানীফাহ রহ. তাবে'ঈগণের অন্তর্ভুক্ত, যেমনটি হাফিয যাহাবী বলেছেন; এ কথা বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত যে, ইমাম সাহেব শৈশবকালে হযরত আনাস বিন মালেক রা.-এর সাথে সাক্ষাৎ লাভ করেন। [উকূদুল জুমান লিস-সালেহী, পৃষ্ঠা: ৭০)।


 


৬. ইমাম আবূ ইসহাক ইবরাহীম ইবনে আলী আস-সিরাজী রহ.


ইমাম আবূ ইসহাক ইবরাহীম ইবনে আলী আস-সিরাজী রহ. (মৃত: ৪৭৬) طبقات الفقهاء নামীয় কিতাবে লিখেছেন, 


أبا حنيفة في فقهاء التابعين بالكوفة، فقال: كان في أيامه أربعة من الصحابة: أنس بن مالك وعبد الله بن أبي أوفى الأنصاري وأبو الطفيل عامر ين واثلة وسهل بن سعد الساعدي، وجماعة من التابعين كالشعبي والنخعي وعلي بن الحسين وغيرهم، وقد مضى تاريخ وفاتهم، ولم يأخذ أبو حنيفة عن أحد منهم


অর্থ: আবূ হানীফাহ রহ. ছিলেন কূফায় অবস্থানরত ফকীহ তাবে'ঈগণের একজন। তাঁর সময় চারজন সাহাবী ছিলেন। আনাস বিন মালেক, আব্দুল্লাহ বিন আবী আওফা আল আনসারী, আবূ তুফায়েল আমের বিন ওয়াসেলাহ, সাহাল বিন সা'আদ আস-সা'দী এবং তাবেয়ীদের বিরাট জামা'আত ছিলো। তন্মধ্যে শু'বাহ, নাখা'ঈ, আলী বিন হুসাইন প্রমুখ। সাহাবীদের তিরোধান হয়ে যায় কিন্তু আবূ হানীফাহ রহ. তাঁদের থেকে কোনো হাদীস বর্ণনা করেননি।


পরিশেষে আমি বলতে চাই, যুগশ্রেষ্ঠ উলামায়ে কেরামের সর্বসম্মতিক্রমে ইমামে আ'যম আবূ হানীফাহ রহ. একজন তাবে'ঈ ছিলেন। বড়জোর একটু মতভেদ শুধু এ ক্ষেত্রে যে, তিনি সাহাবীগণ থেকে সরাসরি হাদীস বর্ণনা করার মত সুযোগ পেয়েছিলেন কিনা? এ ক্ষেত্রে ইমামগণ নিজ নিজ গবেষণা ও অনুসন্ধানের আলোকে ভিন্ন ভিন্ন মত দিয়েছেন। কেউ বলেছেন, সাক্ষাৎ হলেও শ্রবণ হয়নি, আবার কেউ বলেছেন, সাক্ষাৎ এবং শ্রবণ দুটোই হয়েছে। আমাদের নিকট এটাই সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মত হিসেবে গৃহীত। পরন্তু কোনো কোনো ইমাম বলেছেন, ইমামে আ'যম রহ. এর জীবদ্দশায় ২১ জন সাহাবী বিদ্যমান ছিলেন। আল্লামা হাসান সাম্বুলি রহ. এ তালিকা ছাড়াও আরও ৯জন সাহাবীর সংখ্যা উল্লেখ করেছেন। আল্লাহু আ'লাম। 


 


চলবে…

মাসিক আল-আহনাফ / 1

ইমাম আবূ হানীফাহ রহ. এর প্রতি অযৌক্তি ও অবাস্তব সমালোচনা 


আবু হাফসা


 


ইমাম আবূ হানীফাহ রহ. এর ব্যাপারে এমন সব বর্ণনাও আছে, যা পড়লে তাঁকে আহলে সুন্নাত দূরের কথা মুসলিম মানতেও আপনার সন্দেহ আসতে পারে। কিন্তু এই সব বর্ননা যে বাতিল আর তিনি যে মুসলিম এটা কোনো বিবেকবানের সন্দেহ হওয়ার কথা নয়।ইমাম নাসাঈ রহ. তাঁকে হদীস বর্ননায় য'ঈফ বললেও তিনি তাকে ‘তাসমিয়াতু ফুকাহায়িল আমসার’ কিতাবে উম্মাহর ফক্বীহদের কাতারে উল্লেখ করেছেন। অতএব ঐ সব বর্ননা বিশুদ্ধ হলে ইমাম নাসাঈ ইমাম আবূ হানীফাহ রহ.-কে আহলে সুন্নাহর আলিম ও ফক্বীহদের কাতারে আনতেন না।


যাইহোক, ইমাম আবূ হানীফাহ রহ.-কে য'ঈফ বলা থেকে ইমাম নাসাঈর রুজুর (মত পরিবর্তন) একটা ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সেটা হচ্ছে এক হাদীসে ইমাম আবূ হানীফাহ রহ. থাকলেও তিনি তাতে শুধু অন্য রাবীর সমালোচনা করেন; ইমাম আবূ হানীফাহ রহ. এর করেননি। ধারণা করা হয়, ইমাম ত্বহাবীর সাথে ইমাম নাসাঈর সাক্ষাত হওয়া তাঁর রুজুর কারণ। কারণ ইমাম ত্বাহাবীর সাক্ষাতে ইমাম আবূ হানীফাহ সম্পর্কে তাঁর অনেক সংশয়ের নিরসন হয়।


ইমাম আবূ হানীফাহ রহ. এর সমালোচনাগুলো যে অগ্রহনযোগ্য ও বাতিল- তা বুঝতে বেশি দূর যেতে হয় না। সামান্য বিবেক খাটালেই বোঝা যায়। তাই তো পরবর্তী বড় বড় হাফিযুল হাদীস মুহাদ্দিসগণ, যেমন যাহাবী, মিযযী, ইবনু তায়মিয়্যাহসহ অন্যরা তা আমলেই নেননি। বরং ইমাম আবূ হানীফাহ রহ. এর পক্ষে বিভিন্ন মাযহাবের আলিমরা কিতাব লিখেছেন। পরবর্তীতে এসে তার বিরুদ্ধে করা জরাহগুলো নতুন করে নাড়াচড়া যারা দিয়েছেন তাদের মধ্যে মুকবিল বিন হাদী অন্যতম। 


বলা হয় আল্লামা কাউসারীর রহ. এর কারণে নাকি তিনি এমন করেছেন। পরবর্তীতে পাকিস্তানের যুবাইর আলী যাঈ রহ. এর মাধ্যমে তা আরো প্রচার পায়। 


ইমাম আবূ হানীফাহ রহ. এর একজন ছাত্র হচ্ছেন, আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা. এর মতো ফকীহ সাহাবীর নাতি। আল ক্বাসিম ইবনু মা'ন। তিনি রসূলুল্লহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা. এর পুত্র আব্দুর রহমানের ছেলে।অর্থাৎ তিনি কুফার ফকীহ সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা. এর নাতি।


ইমাম যাহাবী রহ. তার সম্পর্কে লিখেন,


الإمام الفقيه المجتهد ، قاضي الكوفة ، ومفتيها في زمانه ، أبو عبد الله الهذلي المسعودي الكوفي وكان عفيفا صارما ، من أكبر تلامذة الإمام أبي حنيفة وكان ثقة نحويا


অর্থ: তিনি হলেন ইমাম, ফকীহ, মুজতাহিদ, কুফার কাজী এবং তার যুগে সেখানকার মুফতি।আবু আব্দিল্লাহ আল হুযালী আল মাসউদী আল কুফী। তিনি ছিলেন সচ্চরিত্র, দৃঢ়সঙ্কল্প। তিনি ছিলেন ইমাম আবূ হানীফা'র শীর্ষস্থানীয় ছাত্রদের একজন। ছিকাহ এবং নাহুবীদ। [সিয়ারু আ'লামিন নুবালা: ৮/১৯০]


ইমাম আবূ হাতিম রহ. বলেন,


 ثقة ، كان أروى الناس للحديث والشعر ، وأعلمهم بالعربية والفقه


অর্থ: তিনি ছিলেন নির্ভরযোগ্য। লোকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী হাদীস ও কবিতা বর্ননাকারী এবং আরবি ভাষা ও ফিকহে তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী জ্ঞানী। [তারীখুল ইসলাম: ৪/৭০৯]


ইমাম ইবনু আব্দিল বার নিচের সনদে হুজর রহ. থেকে বর্ননা করেন,


ﻧﺎ ﻋﺒﺪ اﻟﻮاﺭﺙ ﺑﻦ ﺳﻔﻴﺎﻥ ﻧﺎ ﻗﺎﺳﻢ ﺑﻦ ﺃﺻﺒﻎ ﻧﺎ ﺃﺣﻤﺪ ﺑﻦ ﺯﻫﻴﺮ ﻧﺎ ﺳﻠﻴﻤﺎﻥ ﺑﻦ ﺃﺑﻲ ﺷﻴﺦ ﻗﺎﻝ ﻧﺎ ﺣﺠﺮ ﺑﻦ ﻋﺒﺪ اﻟﺠﺒﺎﺭ ﻗﺎﻝ ﻗﻴﻞ ﻟﻠﻘﺎﺳﻢ اﺑﻦ ﻣﻌﻦ ﺃﻧﺖ اﺑﻦ ﻋﺒﺪ اﻟﻠﻪ ﺑﻦ ﻣﺴﻌﻮﺩ ﺗﺮﺿﻰ ﺃﻥ ﺗﻜﻮﻥ ﻣﻦ ﻏﻠﻤﺎﻥ ﺃﺑﻲ ﺣﻨﻴﻔﺔ ﻓﻘﺎﻝ ﻣﺎ ﺟﻠﺲ اﻟﻨﺎﺱ ﺇﻟﻰ ﺃﺣﺪ ﺃﻧﻔﻊ ﻣﺠﺎﻟﺴﺔ ﻣﻦ ﺃﺑﻲ ﺣﻨﻴﻔﺔ


অর্থ: হুজর ইবনু আব্দিল জাব্বার রহ. বলেন, আল ক্বসিম ইবনু মা'নকে জিজ্ঞাসা করা হলো, আপনি আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদের নাতি হয়ে আবূ হানীফা'র বালকদের (অর্থাৎ ছাত্রদের) অন্তর্ভুক্ত হয়ে সন্তুষ্ট হচ্ছেন। তখন ক্বাসিম বললেন, লোকেরা এমন কারো মজলিসে বসেনি যার মজলিস আবূ হানীফা'র চেয়ে অধিক উপকারী মজলিস। [আল ইনতিকা: ১/১৩৪]


সনদের কোনো রাবীর ব্যাপারে সমস্যা নাই। হুজর ইবনু আব্দিল জাব্বার হচ্ছেন ওয়াইল ইবনু হুজর রা. এর নাতি। যিনি হুজর ইবনু আব্দিল জাব্বার আল হাজরামী নামে প্রসিদ্ধ। ইবনু হিব্বান তাঁর বিশ্বস্ততার সাক্ষ্য দিয়েছেন। এবং তাঁর ব্যাপারে কোনো জারাহও নেই। আর উসূল হলো, 


إن روى عنه اثنان فأكثر، ووثقه ابن حبان، و لم نجد لغيره فيـه جرحاً، فهو ممن يُحتج به.


অর্থ: যখন কোন রাবী থেকে দুইজন কিংবা ততোধিক মুহাদ্দিস বর্ণনা করেন এবং তাঁকে ইবনে হিব্বান ছিকাহ আখ্যায়িত করেন এবং তার ব্যাপারে কোন জারহও পাওয়া যায় না- তখন তিনি একজন মুমিন হিসেবে দ্বীনের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য। [আহলে হাদীস ফোরাম আর্কাইভ [২য় ভলিয়ম] : ১৫/৪৮৮]


তবে দুঃখজনক কথা হচ্ছে, কিছুদিনের মধ্যেই এই বিষয়ে  আহলে  হাদীসদের  পক্ষ   থেকে   কিতাব অনুবাদ হয়ে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। শুধু এতটুকু বুঝি যে, এগুলো দ্বারা একটা বেয়াদব জেনারেশন তৈরী হচ্ছে। মীমাংসিত বিষয় নতুন করে উস্কানি ফিতনার কারণ হতে পারে।


 

মাসিক আল-আহনাফ / 2

আমি কেন হুজুরের ভুল ধরতে পারবো না 


ফখরুল ইসলাম 





ইনবক্সে এক ডাক্তারকে নক করে বললাম “ভাই, আপনার ডাক্তারিতে ভুল হচ্ছে। আপনি সঠিক নিয়মে চিকিৎসা করেন।”


উনি মনে হয় আমার প্রশ্ন শুনে থ মেরে রইলেন। যদিও ইনবক্সে কারো চেহারা বোঝার উপায় নেই। উনি আমাকে প্রশ্ন করলেন, কে আপনি? আমি বললাম, আমাকে চিনেন না? আমি বিশিষ্ট মধু ব্যবসায়ী, আগে কাপড় বেচতাম। আপনি তো আমার কাছে থেকে বেশ কয়েকবার মধু কিনছিলেন। তিনি বললেন, তা জিজ্ঞেস করিনি; জিজ্ঞেস করছি আপনার লেখাপড়ার ব্যকগ্রাউন্ড কী?


উত্তর দিলাম, টেক্সটাইলে বিএসসি ও একই বিভাগে চাকরি করেছি ১৭ বছর! তারপরে ব্যবসায় নেমেছি। আপনি যেহেতু আমার ফ্রেন্ডলিস্টে অনেক বছর ধরে আছেন তাই আপনার তো জানার কথা। তিনি বললেন, সেটা তো জানি যে- আপনি টেক্সটাইলে পড়েছেন, আর আমি মেডিকেলে। এরপর আমি ডাক্তারি করছি ৮ বছর হলো। কিন্তু আপনি আমার ভুল ধরলেন কী করে? কোনো ডাক্তার আপনাকে বলেছে?


বললাম, ডাক্তারের ভুল ধরতে ডাক্তার হতে হবে কেন? অন্যেরা কি আপনার ভুল ধরতে পারবে না? তিনি বললেন, পারবে না কেন? যারা ফার্মাসিস্ট তারা আমাদের ভুল ধরতে পারবে। এবং যারা ঔষধ নিয়ে কাজ করে, যারা রোগতত্ব নিয়ে কাজ করে, যারা পুষ্টি নিয়ে কাজ করে- তারা আমাদের ভুল ধরতে পারবে। এছাড়া আরো অনেক সাব্জেক্ট আছে যারা আমাদের ভুল ধরতে পারবে। কিন্তু আপনার সাব্জেক্ট মানে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ যারা পড়ছে তারা কীভাবে ডাক্তারদের ভুল ধরবে সেটােই তো বুঝে আসছে না। বললাম, আমি একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের একটা ভিডিও দেখলাম। তিনি বিশেষ পদ্ধতিতে চিকিৎসা করে ওনার রোগীদের সুস্থ করছেন। কিন্তু আপনি করাচ্ছেন অন্য এক পদ্ধতিতে। আপনার চিকিৎসা পদ্ধতি ভুল, তাঁরটা সঠিক।


কিছুক্ষণ পরে উনি নক করে বললেন, তাঁর ভিডিওটা দেখলাম। ওনার চিকিৎসা পদ্ধতি সঠিক, তবে রোগীর অবস্থা বুঝে ঐ সিস্টেমে চিকিৎসা করাতে হয়। প্রতি লাখে এরকম একটা রোগী পাওয়া যায়। উনি যেহেতু ঐ বিষয়ে এক্সপার্ট তাই আমরা ডাক্তাররা ঐ লাখে একজন ঐ বিশেষ রোগী পেলে ওনাকে রেফার করি। কিন্তু লাখে একজন রোগীকে দিয়ে তো সামগ্রিক পরিস্থিতি বিচার করা যায় না। একই রোগের চিকিৎসা ডায়বেটিস থাকলে এক সিস্টেমে আগাই, হার্টে সমস্যা থাকলে আরেক সিস্টেমে আগাই! আর বার্ধক্য জনিত সমস্যা হলে আরেক সিস্টেমে আগাই। একই রোগের ট্রিটমেন্ট রোগী ভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয়। তার মানে আমারটা ভুল চিকিৎসা আর অন্যেরটা সঠিক চিকিৎসা- এটা ভাবা ভুল। বরং আমারটাও ঠিক আবার ওনারটাও ঠিক। 


তাছাড়া কাজ করলে ভুল হতেই পারে, আমরা ভুলের উর্ধে নই। সবচেয়ে বড় কথা, আমি ৫ বছর এমবিবিএস পড়েছি, এক বছর ইন্টার্নী করেছি, তারপরে বেসরকারী চাকরি করেছি ২ বছর। সরকারি চাকরি করছি ৮ বছর ধরে। সরকারি হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৫০ জন রোগী দেখলেও বছরে মিনিমাম ১৫ হাজার রোগী দেখা হয়ে যায়। প্রাইভেটে যেখানে ডিউটি করি সেখানেও বছরে কম হলে ৫ হাজার দেখি। মানে বছরে ২০ হাজার রোগী দেখি, সেই হিসেবে ৮ বছরে দেড় লাখ রোগী দেখেছি। এর মধ্যে উচ্চতর পড়াশোনা, ট্রেনিং তো আছেই। কিছু মনে করবেন না ভাই, মানে বলতে চাচ্ছিলাম- কেউ যদি আমার চিকিৎসার ভুল ধরতে চায় তাকেও এই সব প্রসেস উৎরে আসতে হবে।


মানে তাকে এমবিবিএস পাশ করতে হবে, ইন্টার্নি করতে হবে, আমার মত দেড় লাখ না হলেও ১ লাখ রোগী দেখার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। তারপরে আমার ভুল ধরা উচিৎ।


সুযোগটা হাতছাড়া করলাম না। আয়েশি ভঙ্গিতে বললাম, তাহলে আপনি হুজুরদের ভুল ধরছেন কেন? আমি আবার কোন হুজুরের ভুল ধরলাম? তিনি প্রশ্ন করলেন। বললাম, হুজুরের পোস্টে গিয়ে আপনার কমেন্ট দেখলাম। হুজুর একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছে। আপনি সেই আলোচনার বিরুদ্ধে বিভিন্ন যুক্তি দেখিয়েছেন। আমার জানামতে হুজুর মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেছে ১২ বছর। এরপরে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছে ৬ বছর। এরপরে পিএইচডি করেছেন। এখন সেই বিষয়েই লেখাপড়া করাচ্ছেন ১৪ বছর ধরে। আপনি যেমন ডাক্তারি লাইনে এক্সপার্ট, ঠিক তিনিও ইসলামিক স্টাডিজে ওস্তাদ। ফতোয়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে উনি যে জ্ঞান রাখেন স্বাভাবিকভাবেই ডাক্তারদের সেই জ্ঞান থাকার কথা নয়। ডাক্তারদের ভুল ধরলে যেমন কারো ৫ বছর এমবিবিএস ১ বছর ইন্টার্নিসহ আপনার মত অভিজ্ঞতার দরকার ঠিক তেমনি হুজুরদের ভুল ধরতে গেলেও তাদের মত না হলেও তাদের কাছাকাছি স্টাডি করার অভিজ্ঞতা থাকা দরকার। 


আপনি নিশ্চয়ই ২/৩ পাতা ফেইসবুক পোস্ট পড়া অথবা ইউটিউব ভিডিও দেখে শেখা ডাক্তারের কাছে বাড়ির ডিজাইন নেবেন না! নিশ্চয়ই একজন ফিশারিজ বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রী নিয়েছেন এমন কারো কাছ থেকে কীভাবে বাইপাস সার্জারি করা যায় তা শিখবেন না। ঠিক তেমনি...। তাৎক্ষণিক তিনি বলে উঠলেন, “বুঝেছি ভাই বুঝেছি, আমার ভুল হয়েছে, আমায় ক্ষ...”


ভদ্র ভাষায় বললাম, আপনি জানেন না, তাই আপনি মানেন না- এ কারণে গোনাহ করেছেন। আল্লাহর কাছে খাস দিলে  দোয়া করলে  এবং  ক্ষমা  চাইলে আল্লাহ মাফ করে দিতে পারেন। কিন্তু আপনি যদি ঈমানহারা হন তাহলে তো সেই বিষয়ে মাফই চাইবেন না। কারণ, আপনি মনে করেন আপনি ‘ভালো কাজ’ই করেছেন। সুতরাং যিনি যে বিষয়ে এক্সপার্ট তার কাছ থেকে সেই বিষয়ে জ্ঞান নেয়া উচিৎ।


 

মাসিক আল-আহনাফ / 3

তাক্বলীদের বিরূদ্ধে ইজমা'র দাবি ও বাস্তবতা


মুহাম্মাদ হাফিজুর রহমান


 


সেই শুরু থেকেই তথাকথিত আহলে হাদীস (লা-মাযহাব) ভাইয়েরা তাক্বলীদের বিরোধিতা করে আসছে। তাক্বলীদের বিরোধিতায় তাদের অনেকেই অনেক কিছু বলেন, লেখেন এবং প্রচার করেন। কেউ বই লিখছেন, কেউ প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখছেন, কেউ বা আবার ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব ইত্যাদিতে তাক্বলীদের দফারফা করার ভাব দেখাচ্ছেন এবং মুক্বাল্লিদদের মুণ্ডুপাত করার চেষ্টা করে চলেছেন! বিভিন্ন ঠুনকো কথাবার্তাও তারা এক্ষেত্রে পরম যত্নে লুফে নিচ্ছেন। তাক্বলীদের হাক্বীকত ও বাস্তবতার সাথে সম্পর্ক নেই— এমন বক্তব্যও তারা তাক্বলীদের বিরোধিতায় দাঁড় করাচ্ছেন। দেখা গেলো, কোনো একজন আহলে ইলম তাক্বলীদের বিরুদ্ধে এমন একটা কথা বলেছেন, যা বাস্তবতার নিরিখে দুনিয়ায় প্রচলিত তাক্বলীদের ধরন ও বিষয়বস্তুর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়; কিন্তু সেটাকেই তারা হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করছেন। 


আহলে হাদীসদের পরিচিতমুখ তেমনই একজনকে দেখলাম, তিনি তাঁর লিখিত এক বইয়ে 'ইজমা' এর মাধ্যমে তাক্বলীদকে খণ্ডন করার চেষ্টা করেছেন! অর্থাৎ তাঁর দাবি, কোনো মানুষের জন্য অন্যের তাক্বলীদ করা বৈধ নয়- এ ব্যাপারে ইজমা' সংঘটিত হয়েছে! তাঁর দাবির স্বপক্ষে তিনি ইবনে হাযম যাহেরী রহ. এর একটা বক্তব্য উল্লেখ করেছেন। এই প্রবন্ধে আমরা তাক্বলীদের বিরুদ্ধে ঐ ভাইয়ের ইজমা'র দাবি ও তার বাস্তবতা দেখবো ইন-শা-আল্লাহ। 


তিনি তাঁর “তাক্বলীদ বিভ্রান্তি নিরসন” বইয়ে ইজমা'র মাধ্যমে তাক্বলীদের খণ্ডন’ শিরোনামের অধীনে লিখেছেন- “হাফিয ইবনু হাযম (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সকল সাহাবী এবং শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সকল তাবে'ঈর ইজমা' সাব্যস্ত হয়েছে যে, তাদের মধ্য থেকে বা তাদের আগের কোনো ব্যক্তির সকল কথাকে কবুল করা নিষেধ এবং না-জায়েয। যে লোক নিজের ইলম থাকা সত্ত্বেও আবূ হানীফাহ, মালেক, শাফে'ঈ এবং আহমাদ (রহিমাহুমুল্লাহ)-এর মধ্য থেকে কোনো একজনের সকল কথা গ্রহণ করে, আর তাদের মধ্য থেকে যাকে নির্বাচন করে তার কোনো কথাকে বর্জন করে না। তবে সে জেনে রাখুক যে, সে পুরো উম্মতের ইজমা'র বিপরীতে রয়েছে। সে মু'মিনদের রাস্তা ত্যাগ করেছে। আমরা এ অবস্থা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই…” [দ্রষ্টব্য- তাক্বলীদ বিভ্রান্তি নিরসন, পৃ: ৩৫]


উল্লেখ্য, লেখক ইবনে হাযম যাহেরী রহ  এর বক্তব্যের আরবী পাঠও উল্লেখ করেছেন। প্রয়োজন না থাকায় আমরা এখানে তা উল্লেখ করিনি।  


 


আসুন, এবার এই ইজমা নিয়ে একটু আলাপ করা যাক। 


১. বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির সকল কথাকে কবুল করা এবং কোনো কথা-ই বর্জন না করা নিষেধ ও নাজায়েয-এটার উপর ইজমা' হয়েছে। অতএব কেউ যদি প্রমুখ ইমামগণের বলা সকল কথা গ্রহণ করে এবং তাঁদের কোনো কথা-ই (যে কথা বাস্তবেই সঠিক নয়, সেটাও) যদি বর্জন না করে তাহলে সে পুরো উম্মতের ইজমা'র বিরোধিতা করবে। ভালো কথা। কিন্তু এখানে তাঁদের তাক্বলীদের নিষেধাজ্ঞার ইজমা' কই? এটা তো তাঁদের তাক্বলীদ করার ক্ষেত্রে এক বিশেষ পদ্ধতির অনুসরণের নিষেধাজ্ঞা; অর্থাৎ এমনভাবে তাঁদের তাক্বলীদ করা যাবে না যে, তাঁদের ভুল-শুদ্ধ সবই গ্রহণ করা হবে। আর এমনটা তো আমরা করিও না! আমরা বহু ক্ষেত্রে ইমাম আবূ হানীফাহ রহ এর  বক্তব্য  ছেড়ে  ইমাম আবূ ইউসূফ ও ইমাম মুহাম্মাদ রহ. এর বক্তব্য গ্রহণ করি। অতএব, আমরা ইজমা' অমান্য কারী নই।


মোদ্দা কথা হলো, উপরিউক্ত বক্তব্যে আদৌ মুতলাকান (স্বতন্ত্রভাবে) তাক্বলীদের নিষেধাজ্ঞার ইজমা' বর্ণিত হয়নি! বরং তাক্বলীদের ক্ষেত্রে বাছ-বিছার না করার নিন্দা করা হয়েছে।


 


চলবে…


 

মাসিক আল-আহনাফ / 4

ইমাম আ'যম রহ. এর শানে মোকবেল বিন হাদীর গোস্তাখি: আমাদের বিশ্লেষণ


লুবাব হাসান সাফওয়ান


 



হানাফী বিদ্বেষীরা অনলাইনে প্রচার করছে যে “ইমাম মুকবিল বিন হাদী রহিমাহুল্লাহ বলেন-


“ইমাম আবু হানিফার পক্ষে গোঁড়া জাহেলরাই অধিকাংশ। আমি মদিনা ভার্সিটির একদল শিক্ষককে দেখেছি যারা (জারাহ প্রকাশকারীদের উপর) রেগে ফুলে আছে। (এমনকি) তারা জারাহ প্রকাশ করাকে ইসলামের ধ্বংস করার নামান্তর মনে করে থাকে। এই মিসকিনরা জানে না যে আবু হানিফার উপর কথা বলা মানে ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের কোন স্তম্ভকে বিদ্রুপ করা নয়।


আমরা এই জাহেলদের বলি, তোমরা কি আল্লাহ দ্বীন সম্পর্কে অধিক গয়রত ওয়ালা নাকি আহমাদ বিন হাম্বল, মুহাম্মাদ বিন ইসমাঈল আল-বুখারী, মুসলিম বিন হাজ্জাজ, দারাকুতনী এবং খতিব?


তাদের বলি: আবু হানিফা সম্পর্কে তোমরা বেশি জ্ঞানী নাকি মালিক বিন আনাস, শারিক বিন আব্দুল্লাহ, ইয়াহইয়াহ বিন সাঈদ আল কাত্তান, আব্দুল্লাহ বিন ইয়াযিদ আল মুকরি, সুফইয়ান ছাওরী, সুফইয়ান বিন উয়াইনাহ এবং আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারাক আর যারা এই ইমামদের পথে গিয়েছে?” [রেফারেন্স: নাশরুস সহিফা - 5]



পর্যালোচনা —১


তার উক্ত বক্তব্য নিয়ে মূল পর্যালোচনায় যাওয়ার আগে বলে নেওয়া জরুরী মনে করছি যে, মোকবেল বিন হাদী হচ্ছে একজন কট্টর হানাফী বিদ্বেষী মৌলবী। সে ইমাম আবূ হানীফা'র নিন্দায় 


ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত কিছ জঞ্জাল তুলে এনে পৃথকভাবে একটি গ্রন্থ (নাশরুস সহীফাহ) সংকলন করে। মূলত ইমাম আবূ হানীফা'র নিন্দা চর্চা করাই ছিলো তার পেশা। ফলে তার ওপর মদিনা ভার্সিটির শিক্ষকগণ রেগে ফুলে-ফেঁপে ছিলো। কিন্তু তাদের মুখের ওপর কিছু বলার মতো সাহস তার ছিলো না। এ কারণে সে নিজের ভিতরে লুকিয়ে থাকা সেই ক্ষোভ ঝাড়তে মদিনা ভার্সিটি শিক্ষকগণকে তার বইয়ের মধ্যে জাহেল বলে বলে চেঁচাচ্ছে! অথচ সে জানে না যে, সে নিজেই টাটকা জাহেল!


যাইহোক, তার উক্ত কথা অনুযায়ী হাফেয মিযযী, হাফেয ইবনে কাসীর, হাফেয যাহাবী, হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী, হাফেয সূয়ূতীসহ পরবর্তী কালের বড় বড় সকল মুহাদ্দিসীনে কেরামই গোঁড়া ও জাহেলদের অন্তর্ভুক্ত। কারণ, তাঁরাসহ পরবর্তী কালের সকল ইমামই ইমাম আবূ হানীফাহর পক্ষেই কথা বলেছেন! যেমন, তাঁর ব্যাপারে-


ইমাম আবু হানীফা রহ. এর ব্যাপারে ইবনে হাজার আসকালানী রহ. এর প্রশংসা


قال ابن حجر العسقلاني: مناقب الإمام أبي حنيفة كثيرة جدًّا؛ فرضِيَ الله تعالى عنه، وأسكنه الفردوسَ، آمين


অর্থ: ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন— ইমাম আবূ হানীফাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এর গুণাবলী ‘কাসীরাতুন জিদ্দান’ তথা তিনি অগণিত গুণাবলীর অধিকারী ছিলেন। আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হোন। তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউছে স্থান দিন। আমীন। [তাহযীবুত তাহযীব: ৫/৬৩১]


 


ইবনে হাজার আসকালানীর দৃষ্টিতে ইমাম আবূ হানীফাহ রহ. এর ব্যাপারে অন্যদের জারহ


হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রহ.-কে তাঁর ছাত্র হাফেয সাখাবী রহ. জিজ্ঞেস করলেন, “নাসাঈ ইমাম আবূ হানীফা'র ব্যাপারে বলেছেন যে, তিনি হাদীসে শক্তিশালী নন”। এ ব্যাপারে আপনার মতামত কী, তা কি আদৌ সঠিক? উত্তরে ইবনে হাজার রহ. বললেন, ““নাসাঈ যা বলেছেন, তা তাঁর বাহ্যিক জ্ঞান ও নিজস্ব ইজতিহাদ অনুযায়ী বলেছেন। মনে রেখো, প্রত্যেক ব্যক্তির প্রত্যেক কথাই মেনে নেওয়া হবে ব্যাপারটা এমন নয়। (অর্থাৎ ইমাম আবূ হানীফাহকে নাসাঈর দুর্বল বলাটা গ্রহণযোগ্য নয়।) এরপর তিনি আরো বলেন, প্রথমে তাঁর ব্যাপারে এমনটা বলা হলেও পরবর্তীতে নাসাঈ ও পরবর্তী কালের ইমামগণ ঐসব কথা থেকে ফিরেও এসেছেন। কারণ, তাঁরা দেখলেন যে, ইমাম আবূ হানীফাহ রহ. শ্রবণের পর থেকে হুবহু মুখস্থ রাখা ব্যতীত কোনো হাদীস বর্ণনা করতেন না। [আল-জাওহার ওয়াদ দুরার ফী তারজামাতি ইবনে হাজার: ২/৯৪৭]


ইমাম আবূ হানীফাহ সম্পর্কে তথাকথিত জারহ চর্চা করা যাবে কিনা- এ সম্পর্কে ইবনে হাজার আসকালানীর দৃষ্টিভঙ্গি


এ ব্যাপারে তিনি তাঁর ছাত্রের উদ্দেশ্যে বলেন-


وفي الجملة، تَرْكُ الخَوْضِ في مثل هذا أولى، فإنَّ الإمامَ وأمثالَه ممَّن قفزوا القَنْطَرَة، فما صار يُؤَثِّرُ في أحد منهم قولُ أحدٍ، بل هم في الدرجة التي رفعهم اللَّه تعالى إليها مِنْ كونهم متبوعين مقتدى بهم، فليُعتَمَدْ هذا، واللَّه ولي التوفيق


অর্থ: সারকথা হলো, এমন ধরনের বিষয়ে (ইমাম আ'যমের জারহ/সমালোচনায়) ডুবে থাকা ও অনর্থক কথাবার্তা ত্যাগ করাই উত্তম। কারণ, ইমাম আবূ হানীফাহ ও তাঁর মতো ইমামগণ সেতু পার করে ফেলেছেন। অতএব তাদের ব্যাপারে কারোরই কোনো সমালোচনা (জারহ) প্রভাব ফেলবে না। বরং, তারা তো সেই উঁচু স্তরে রয়েছেন যে স্তরে সর্বশক্তিমান আল্লাহই তাদের উঠিয়েছেন। ফলে তাঁরা মানুষের অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় হয়েছন! অতএব সকলকে এটিতেই বিশ্বাসী থাকতে হবে। আর আল্লাহই একমাত্র সফলতা দানকারী। [আল-জাওহার ওয়াদ দুরার ফী তারজামাতি ইবনে হাজার: ২/৯৪৭]


হাফেয যাহাবীর দৃষ্টিতে ইমাম আবূ হানীফাহ রহ.


জারাহ তা’দীলের অত্যুজ্জ্বল নক্ষত্র, ইমাম হাফেয যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ ইমাম আবূ হানীফাহ রহ. সম্পর্কে বলেন— “যদি কেউ দিবসের প্রমাণে দলীল খোঁজে, তবে না তার বুদ্ধি-বিবেক বলে কিছু আছে, আর না তার বিবেকের আদালতে সঠিক বলতে কিছু আছে।” [সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা: ৬/৪০৩]


হ্যাঁ , সত্যিই এমন! হাফেয যাহাবী রহ. ইমাম আবূ হানীফাহকে দিবসের সাথে তুলনা করেছেন। কেউ যদি সূর্যের আলোয় ঝলমল করা দিনকে অস্বীকার করে তবে এই মূর্খের সাথে ঝগড়া করার কোনো মানে নেই। পৃথিবীর সকল মানুষও যদি দিনকে দিন বলে স্বীকার না করে বরং রাত বলে সমালোচনা করে তবুও দিন তো দিনই থাকবে এবং পৃথিবীতে আলো ছড়িয়ে যাবে।


তেমনিভাবে ইমাম আবু হানীফা রহ. এর সমালোচনায়ও তাঁর কিছুই যায় আসে না। তিনি হিংসুকদের শত সমালোচনা উপেক্ষা করেও মুসলিম উম্মাহর মাঝে স্বমহিমায় উদ্ভাসিত যেমন ছিলেন তেমনি থাকবেন। এতে তাঁর ব্যক্তিত্বে বিন্দু পরিমাণ ঘাটতি আসবে না।


ইমাম হাফেয যাহাবী রহ. অত্যন্ত বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলেন— 


 قُلْتُ: الإِمَامَةُ فِي الفِقْهِ وَدَقَائِقِه مُسَلَّمَةٌ إِلَى هَذَا الإِمَامِ، وَهَذَا أَمرٌ لاَ شَكَّ فِيْهِ وَلَيْسَ يَصِحُّ فِي الأَذْهَانِ شَيْءٌ ... إِذَا احْتَاجَ النَّهَارُ  إِلَى دَلِيْلِ وَسِيْرَتُه تَحْتَمِلُ أَنْ تُفرَدَ فِي مُجَلَّدَيْنِ رضي الله عنه وَرَحِمَهُ


অর্থ: আমি বলি, ফিকহ ও ফিকহের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়ে ইমামত (নেতৃত্ব)-এর মর্যাদা এ ইমাম (আবূ হানীফা রহ.) এর প্রতিই উৎসর্গিত। আর এটি এমন একটি বিষয় যাতে কোনোই সন্দেহ নেই। দিবস প্রমাণে কেউ যদি দলিল খোঁজে, তবে তার বিবেকের আদালতে সঠিক বলতে কিছুই নেই। এবং তাঁর বর্ণাঢ্য জীবন নিয়ে পৃথকভাবে লিখতে গেলে দুই খণ্ডের বিশাল কলেবরের কিতাব রচনা করা যাবে। আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হোন। তাঁর উপর আল্লাহ রহম করুন। [সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা: ৬/৪০৩]


সুপ্রসিদ্ধ মালিকী ফকীহ ও মুহাদ্দিস ইবনু আব্দুল বার্র রহ. এর দৃষ্টিতে ইমাম আবূ হানীফা'র জারহ


তিনি ইমাম আবূ হানীফাহ রহ এর সমালোচনার ব্যাপারে বলেন-


أفرط أصحاب الحديث في ذم أبي حنيفة وتجاوزوا الحد في ذلك


অর্থ: মুহাদ্দিসগণ আবূ হানীফা'র নিন্দায় বাড়াবাড়ি করেছেন এবং এ বিষয়ে সীমালঙ্ঘন করেছেন। [জামি'উ বায়ানিল ইলম: ২/২৮৯]


 


ইমাম খুরায়বী রহ. এর দৃষ্টিভঙ্গি; তিনি বলেন -


ما يقع في أبي حنيفة إلا حاسد أو جاهل



অর্থ: ইমাম আবু হানীফার ব্যাপারে হিংসুক এবং মূর্খ ব্যতীত কেউ কটূক্তি (জারহ চর্চা) করে না। [ইসলাম কিউএ ইনফো: ফতোয়া নং: 158755]


ইমাম হাফস ইবনে গিয়াস রহ. এর দৃষ্টিভঙ্গি; তিনি বলেন-


وقال حفص بن غياث : كلام أبي حنيفة في الفقه أدق من الشعر ، لا يعيبه إلا جاهل


অর্থ: ফিকহের ক্ষেত্রে ইমাম আবূ হানীফা'র বক্তব্য চুলের চেয়ে সূক্ষ্ম। মূর্খ ব্যতীত কেউই তাঁর সমালোচনা করে না। [ইসলাম কিউএ ইনফো: ফতোয়া নং: 158755]


[হাফেয মিযযী, জালালুদ্দীন সুয়ূতী ও হাফেয ইবনে কাসীর এর মন্তব্য শেষের দিকে আসছে।]


তো, এ সকল মহামতি ইমামগণ ইমাম আবূ হানীফাহর পক্ষে কথা বলেন আর এ ছোট লোকটা বিপক্ষে বলে। আপনি কাকে জ্ঞানী বলবেন আর কাকে জাহেল বলবেন নিজেই ঠিক করুন! পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তা'আলা আল্লাহ বলেন, জ্ঞানী আর জাহেল কখনো সমান হয় না!


 


পর্যালোচনা —২


যেহেতু সে ইমাম আবূ হানীফা'র বিপক্ষে, সেহেতু যারাই তাঁর পক্ষে কথা বলবে তার দৃষ্টিতে তাদেরকে গোঁড়া ও জাহিলই মনে হবে। কারণ মানুষের স্বভাব হলো প্রত্যেক ভিন্ন মতাবলম্বীকে মূর্খ মনে করা। অতএব, তার কথায় হানাফী বিদ্বেষীদের খুশি হয়ে লাভ নেই। সত্যি কথা তো হচ্ছে, ইনসাফ-পছন্দ ইমামগণ ও জ্ঞানীরাই ইমাম আবূ হানীফা'র পক্ষে বলে আর গোঁড়া, বিদ্বেষী ও জাহিলরাই ইমাম আবূ হানীফা'র বিরুদ্ধে বলে।


 


মোকবেলের বক্তব্য বিশ্লেষণ 


১. আমি মদিনা ভার্সিটির একদল শিক্ষককে দেখেছি যারা (জারাহ প্রকাশকারীদের উপর) রেগে ফুলে আছে। (এমনকি) তারা জারাহ প্রকাশ করাকে ইসলামের ধ্বংস করার নামান্তর মনে করে থাকে।”


পর্যালোচনা: মোকবেল নিজ মুখেই স্বীকারোক্তি দিয়েছে যে, মদিনা ভার্সিটির একদল শিক্ষক ইমাম আবূ হানীফা'র জারহ প্রকাশ করাকে মোটেই পছন্দ করতেন না এবং যারা এসব অনর্থক কর্মকাণ্ডে জড়াতো তাদের উপর রেগে ফুলে যেতেন। এমনকি তাঁর সমালোচনা করাকে ইসলামের ধ্বংস মনে করতেন! সুতরাং এর থেকেই সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়ে গেল যে, মদিনা ভার্সিটির একদল শিক্ষকের মতে ইমাম আবূ হানীফাহর জারহ প্রকাশ করা খুবই নিন্দনীয় কাজ এবং তাঁর সমালোচনা করা ইসলাম ধ্বংসেরই নামান্তর! 


তো ইমাম আবূ হানীফা'র জারহ প্রকাশকারী জাহিলদেরকে বলি, যেখানে মদিনা ভার্সিটির মতো সেরা ইসলামী বিদ্যাপীঠের শিক্ষকরা ইমাম আবূ হানীফা'র সমালোচনা করা তো দূরে থাক বরং জারহ প্রকাশ করাও পছন্দ করেন না সেখানে তুমি/তোমরা কোন কচুর লতি যে, ইমাম আবূ হানীফা'র সমালোচনা করো? এবং ইমাম আবূ হানীফা'র নামে অর্থহীন জারহ প্রকাশ করে গ্রন্থ সংকলন করো?



মূলত ইতিহাসের সকল জ্ঞানীরাই ইমাম আবূ হানীফা'র সমালোচনা করাকে অপছন্দ করতেন। হোক সে মালেকী পণ্ডিত, হোক সে শাফে'ঈ পণ্ডিত, হোক সে হাম্বলী পণ্ডিত, হোক সে সালাফী পণ্ডিত! কিন্তু এইসব মতাদর্শের মধ্যে কিছু গোঁড়া গুবরে পোকা থাকে তারাই ইমাম আবূ হানীফা'র সমালোচনা করে বেড়ায়! 


মোকবেল বনাম মদিনা ভার্সিটির শিক্ষক মহোদয়গণ


ক. মোকবেলের এমন স্বীকারোক্তিতে মূলত মোকবেল নিজেই ধরা খেয়ে গেছে। কারণ, মদিনার ভার্সিটি শিক্ষকদের তুলনায় মোকবেল কিছুই না, কেবলই ধূলিকণা সমতুল্য! যদিও ইমাম আবূ হানীফা'র বিরোধিতা করার কারণে হানাফী বিদ্বেষীরা তাকে মাথায় তুলে নাচুক! সুতরাং তার মত ব্যক্তি মদিনা ভার্সিটির শিক্ষক মহোদয়গণকে জাহেল বলা আর ভিক্ষুক হয়ে কোটিপতিকে ভিক্ষুক বলা একই কথা! 


খ. তার কথা অনুযায়ী হয়তো মদিনা ভার্সিটির শিক্ষকরা মূর্খ নয়তো সে নিজেই মূর্খ! উভয় দিকেই কিন্তু সংকট! কারণ, মদিনা ভার্সিটির শিক্ষকরা মূর্খ হলে ওখান থেকে পড়াশোনা করে আসা তথাকথিত ডক্টরদেরও তেমন কোনো মূল্য নেই। কেননা যে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরাই মূর্খ, সে প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা মূর্খ হবে না তো আর কী হবে? তাছাড়া যে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরাই মূর্খ সে প্রতিষ্ঠান থেকে ছাত্ররা শিখবেই বা কী? এবং যে প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারগণ বেছে বেছে এক দল মূর্খ শিক্ষক নিয়োগ দেন সে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মানই বা কেমন!


 


২. “এই মিসকিনরা জানে না যে আবূ হানীফা'র ওপর কথা বলা মানে ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের কোন স্তম্ভকে বিদ্রুপ করা নয়।”


পর্যালোচনা —১: ‘ইমাম আবূ হানীফা'র সমালোচনা করা ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের কোনো স্তম্ভকে বিদ্রুপ করা নয়’ তার মানে তাঁর সমালোচনা করা যাবে- কী অদ্ভুত মূর্খতা রে ভাই! 


আমি তো বলি, ‘সাহাবীদের সমালোচনা করাও ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের কোনো স্তম্ভকে বিদ্রুপ করা নয়’- তার মানে কি সাহাবীদের সমালোচনাও করা 


যাবে?


 


পর্যালোচনা —২: হয়তো মোকবেল সাহেবের ধারণা যে, তাঁর সমালোচনা এমন বিষয় নয় যার কারণে রেগে ফুলে যেতে হবে! আমি বলি, একজন সুক্ষ্মদর্শী ও বিচক্ষণ আলেমের জন্য এমন বিষয়ে রেগে ফুলে যাওয়াটাই স্বাভাবিক! কারণ, তারা জানেন এর সুদূরপ্রসারী অকল্যাণ ও ক্ষতিকর দিকগুলো কী কী! যেমন, এতে করে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে সমালোচনার দ্বার উন্মোচন হয়ে যাবে। একজনের দেখাদেখি অন্যরাও বিভিন্ন ইমামের সমালোচনায় লিপ্ত হয়ে পড়বে, ফলে মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপক আকারে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। ফলস্বরূপ: মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য বিনষ্ট হবে আর এদিকে ইহুদি খ্রিস্টানরা এর সুযোগ গ্রহণ করবে। তাছাড়া আরো একটি বিশাল ক্ষতিকর দিক রয়েছে- এ বিষয়ে আমরা আলাদা প্রবন্ধ রচনা করবো ইন-শা-আল্লাহ!


 


৩. “আমরা এই জাহেলদের বলি, তোমরা কি আল্লাহ দ্বীন সম্পর্কে অধিক গয়রত ওয়ালা নাকি আহমাদ বিন হাম্বল, মুহাম্মাদ বিন ইসমাঈল আল-বুখারী, মুসলিম বিন হাজ্জাজ, দারাকুতনী এবং খতিব?”


পর্যালোচনা —১: আমরা এই জাহিলকে বলি, তুমি কি আল্লাহর দ্বীন সম্পর্কে অধিক গায়রাত ওয়ালা নাকি হাফেয যাহাবী, হাফেয মিযযী, হাফে ইবনে কাসীর, হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী, হাফেয সাখাবী ও ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতীঅধিক গায়রাত ওয়ালা? তারা রিজাল বিষয়ে বিস্তর কিতাবাদী লেখা সত্ত্বেও কেন ইমাম আবূ হানীফা'র জারহ প্রকাশ করেননি!


পর্যালোচনা —২: আহমদ বিন হাম্বল প্রমুখ জারহ করেছে, কারণ তখন জারহ করার যুগ ছিলো। কিন্তু এখন কি সে যুগ আছে? এখন তো লক্ষ লক্ষ দুর্বল/জাল রাবীদের মধ্যে কারোরই জারহ বই আকারে বা বিশেষভাবে প্রচার করা হচ্ছে না, তাহলে শত শত বছর পর কেবল ইমাম আবূ হানীফা'র জারহ কেন প্রচার করা হচ্ছে? কিসের উদ্দেশ্যে! 


মূলত পূর্ববর্তী হিংসুকরা এতো সব চক্রান্ত করেও ইমাম আবূ হানীফাহ রহ. এর মাযহাব বিলুপ্ত করতে পারেনি বরং এখনো মানুষ ব্যাপকভাবে ইমাম আবূ হানীফা'র মাযহাব অনুসরণ করছে- তা দেখে বেঁচে থাকা ডাইনোসরদের এই গাত্রদাহ! একবার তাদের পূর্বসূরীরা চক্রান্ত করে সফল হয়নি তাই উত্তরসূরীরা আবার ব্যর্থ চেষ্টা চালাচ্ছে! কিন্তু শুনে রাখো ওহে হিংসুক ও জাহেলের দল, হেরে গেলে তো তোমাদের হিংসা! এভাবে বারবার হেরেই যাবে! এতো এতো সমালোচনা করেও তাঁর মাযহাবের অনুসরণ থামানো যায়নি আর যাবেও না। আসলে যাকে আল্লাহ কবুল করেন তিনি এমনই হন।


অতএব বলাই বাহুল্য যে, ইমাম আবূ হানীফা'র মাযহাব বিলুপ্ত করার লক্ষ্যেই তাদের এ হীন প্রচেষ্টা! কিন্তু কেন? তাদের প্রতি আমার প্রশ্ন- হানাফী মাযহাব মানা কি গোনাহের কাজ? ইমাম আবূ হানীফা'র অনুসরণ করা যদি গুনাহের কাজ হতো, তাহলে ইতিহাসের একজন ইমামও কেন এ ব্যাপারে সতর্ক করেননি? কেন বলেননি যে, তোমরা হানাফী মাযহাব মানবে না, হানাফী মাযহাব মানা গুনাহের কাজ! অথবা তোমরা আবূ হানীফা'র অনুসরণ করবে না, তাকে অনুসরণ করা পথভ্রষ্টতা! এত বড় সত্য (?) কিভাবে চাপা থেকে গেল?


পর্যালোচনা —৩: তারা সমালোচনা করেছেন কিছু শোনা কথার ভিত্তিতে, আর সেসব শোনা কথা ভিত্তিহীন ছিলো! অতএব তাদের সমালোচনাও ভিত্তিহীন, অনর্থক ও অপাঙ্ক্তেয়। 


পর্যালোচনা —৪: উল্লেখিত ব্যক্তিদের থেকে তাঁর সমালোচনা বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিতই নেই বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের নামে এগুলো মোকবেলের মতো হিংসুকদের বানানো কথা। উল্টোদিকে তাদের অধিকাংশ থেকে বরং প্রশংসাই পাওয়া যায়।


পর্যালোচনা —৫: তাঁর নামে প্রচারিত এই সমস্ত সমালোচনার বিন্দুমাত্র মূল্যও নেই। এ ব্যাপারে হাফেয ইবনে হাজার রহ. খুবই সুন্দর বলেছেন। তিনি বলেন,


فإنَّ الإمامَ وأمثالَه ممَّن قفزوا القَنْطَرَة، فما صار يُؤَثِّرُ في أحد منهم قولُ أحدٍ، بل هم في الدرجة التي رفعهم اللَّه تعالى إليها


“ইমাম আবূ হানীফাহ ও তাঁর মতো ইমামগণ তো (সমালোচনার) সেতু পার হয়ে গেছেন, অতএব তাঁদের ব্যাপারে কারো সমালোচনায় কোনো প্রভাবই ফেলবে না! বরং তাঁরা এমন মর্যাদায় পৌঁছে গেছেন যেখানে স্বয়ং আল্লাহই তাঁদেরকে উঠিয়েছেন” [আল-জাওহার ওয়াদ দুরার ফী তারজামাতি ইবনে হাজার: ২/৯৪৭]


৪. “তাদের বলি: আবূ হানীফাহ সম্পর্কে তোমরা বেশি জ্ঞানী নাকি মালিক বিন আনাস, শারিক বিন আব্দুল্লাহ, ইয়াহইয়াহ বিন সাঈদ আল কাত্তান, আব্দুল্লাহ বিন ইয়াযিদ আল মুকরি, সুফইয়ান ছাওরী, সুফইয়ান বিন উয়াইনাহ এবং আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারাক আর যারা এই ইমামদের পথে গিয়েছে?”


পর্যালোচনা —১: আমরা তাকে বলবো, আবূ হানীফাহ সম্পর্কে সে বেশি জ্ঞানী নাকি ইবনে আব্দিল বার্র, ইমাম আবূ ইসহাক শীরাযী, লায়স ইবনে সা'দ, ওয়াকী ইবনুল জাররাহ, মালিক বিন আনাস, ইয়াহয়া ইবনে সা'ঈদ আল-কাত্তান, ইমাম শাফে'ঈ, মুজাদ্দিদে আলফে সানী, হাফেয যাহাবী, হাফেয ইবনে হাজার, হাফেয সাখাবী ও জালালুদ্দীন সুয়ূতী, হাফেয ইবনে কাসীর রহ বেশি জ্ঞানী? 


পর্যালোচনা —২: সমালোচনাকারী হিসেবে যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তাঁদের অধিকাংশ থেকেই তাঁর সমালোচনা প্রমাণিত নয় বরং প্রশংসাই প্রমাণিত। (চলবে…)

মাসিক আল-আহনাফ / 5

ইমামুল আ'যম আবূ হানীফাহ (রযীআল্লাহু তা'আলা আনহু) এর ব্যাপারে সমালোচনার বাস্তবতা


ইয়াসিন হোসেন শিশির 


 


বর্ণনা —১:


وَذَكَرَ الدُّولابِيُّ نَا مُحَمَّدُ بْنُ حَمَّادِ بْنِ الْمُبَارَكِ الْهَاشِمِيُّ قَالَ نَا على بن الْحسن بن شَقِيق المروزى عَنِ ابْنِ الْمُبَارَكِ قَالَ سَمِعْتُ سُفْيَانَ الثَّوْرِيَّ يَقُولُ كَانَ أَبُو حَنِيفَةَ شَدِيدَ الأَخْذِ لِلْعِلْمِ ذَابًّا عَنْ حَرَمِ اللَّهِ أَنْ تُسْتَحَلَّ يَأْخُذُ بِمَا صَحَّ عِنْدَهُ مِنَ الأَحَادِيثِ الَّتِي كَانَ يَحْمِلُهَا الثِّقَاتُ وَبِالآخَرِ مِنْ فِعْلِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عَلَيْهِ وَسلم وَبِمَا أَدْرَكَ عَلَيْهِ عُلَمَاءَ الْكُوفَةِ ثُمَّ شَنَّعَ عَلَيْهِ قَوْمٌ يَغْفِرُ الله لنا وَلَهُم


অর্থ: ইমাম সুফয়ান ছাওরী বলেন, “আবূ হানীফাহ (রহিমাহুল্লাহ) ছিক্বাহ রাবীদের সূত্রে বর্ণিত হাদীসের মধ্য থেকে সেটা গ্রহণ করতেন, যেটা তাঁর নিকট সহীহ। এবং নবীজির আমলের মধ্যে শেষটি গ্রহণ করতেন। এবং যার উপর কূফার আলেমদেরকে পেয়েছেন, সেটা গ্রহণ করতেন। এরপর একশ্রেণির লোক তাঁর নিন্দা করেছে। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সকলকে মাফ করুন।” [আল-ইনতিকা: ২৬২]


আপত্তি —১: সানাদের রাবী مُحَمَّدُ بْنُ حَمَّادِ بْنِ الْمُبَارَكِ الْهَاشِمِيُّ মাজহূল।


জবাব: সনদের রাবী মুহাম্মাদ ইবনে হাম্মাদ ইবনুল মুবারক আল-হাশেমী মাজহূল নন। কেননা, ইমাম যাহাবী রহ. তাকে “মীযানুল ই'তিদাল” গ্রন্থে উল্লেখ করেননি এবং তিনি ইমাম তবারানীর শায়খ ছিলেন। [তারীখে বাগদাদ: ১১/১১৫]



হায়ছামী রহ. লিখেছেন, “তবারানীর শায়খদের মধ্যে যাদের উল্লেখ ‘মীযান’ গ্রন্থে নেই, তারা সবাই আদেল ও ছিক্বাহ।” [মাজমাউয যাওয়ায়েদ: ১/৮]


মনে রাখতে হবে, এই তাওছীক্বের বিপরীতে কোনো মুহাদ্দিস তার উপর কোনরূপ জারহ করেননি। সুতরাং, মুহাম্মাদ ইবনে হাম্মাদ একজন ছিক্বাহ রাবী।


আপত্তি —২: আরেক রাবী أَبَا بكر, তাঁরও তাওছীক্ব না-মালূম।


জবাব: সনদে আবূ বকর নামে কোনো রাবী নেই। এটা মূলত নাসেখের ভুল ছিলো, যা মুহাক্কিক্ব আব্দুল ফাত্তাহ আবূ গুদ্দাহ রহ. সংশোধন করে দিয়েছেন।


هكذا جاء في نسخة ك: (علي بن الحسن بن شقيق المروزي عن ابن المبارك)، وهذا سياق السند تماماً في تلك النسخة: «وذكر الدولابي في كتابه في «أخبار أبي حنيفة» عن شيوخه، عن علي بن الحسن بن شقيق المروزي، عن ابن المبارك». ووقع في نسختي أ و والمطبوعة كالاتي (... علي بن الحسن بن علي بن شقيق أبو الحسن المروزي، قال: سمعت أبا بكر يذكر عن ابن المبارك) وفيه أكثر من خطأ، أولاً في نسب علي، ثانياً في كنيته، فإن كنيته (أبو عبد الرحمن) كما في كتب الرجال، ثالثاً إقحام (أبا بكر) بينه وبين ابن المبارك، وهذا خطأ فإن علياً تلميذ ابن المبارك يروي عنه مباشرة، وقد سبق في ص ٢٠٦ بعض رواياته عنه.


বর্ণনা —২:


حَدثنَا أَبُو الْحسن عَليّ بن الْحسن الرَّازِيّ قَالَ ثَنَا أَبُو عبد الله الزَّعْفَرَانِي قَالَ ثَنَا أَحْمد بن أبي خَيْثَمَة قَالَ سَمِعت يحيى بن معِين يَقُول حَدثنِي عبيد بن أبي قُرَّة قَالَ سَمِعت يحيى بن الضريس قَالَ شهِدت سُفْيَان الثَّوْريّ وَأَتَاهُ رجل لَهُ مِقْدَار فِي الْعلم وَالْعِبَادَة فَقَالَ لَهُ يَا ابا عبد الله مَا تنقم على أبي حنيفَة قَالَ وَمَا لَهُ قَالَ سمعته يَقُول قولا فِيهِ إنصاف وَحجَّة أَنى آخذ بِكِتَاب الله إِذا وجدته فَلَمَّا لم اجده فِيهِ اخذت بِسنة رَسُول الله والْآثَار الصِّحَاح عَنهُ الَّتِي فَشَتْ فِي أَيدي الثِّقَات عَن الثِّقَات فَإِذا لم اجد فِي كتاب الله وَلَا سنة رَسُول الله أخذت بقول أَصْحَابه من شِئْت وأدع قَول من شِئْت ثمَّ لَا أخرج عَن قَوْلهم إِلَى قَول غَيرهم فَإِذا انْتهى الْأَمر إِلَى ابراهيم وَالشعْبِيّ وَالْحسن وَابْن سِيرِين وَسَعِيد بن الْمسيب وَعدد رجَالًا قد اجتهدوا فلي أَن أجتهد كَمَا اجتهدوا قَالَ فَسكت سُفْيَان طَويلا ثمَّ قَالَ كَلِمَات بِرَأْيهِ مَا بَقِي فِي الْمجْلس أحد إِلَّا كتبهَا نسْمع الشَّديد من الحَدِيث فنخافه ونسمع اللين فنرجوه وَلَا نحاسب الْأَحْيَاء وَلَا نقضي على الْأَمْوَات نسلم مَا سمعنَا وَنكل مَا لَا نطلع على علمه إِلَى عالمه ونتهم رَأينَا لرأيهم


অর্থ: ইমাম ইয়াহয়া ইবনে দুরাইস থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: আমি সুফয়ান ছাওরী রহ. এর নিকট বসা ছিলাম। এমতাবস্থায় জনৈক ব্যক্তি- যিনি ইলম ও ইবাদতে বড় মর্যাদাসম্পন্ন ছিলেন, তার কাছে এসে বললেন, “আপনি কেনো আবূ হানীফাহ’র প্রতি বিরক্ত?” তিনি বললেন, “কেনো, তার কী হয়েছে?”


লোকটি বললো: আমি ইমামুল আ'যম আবূ হানীফাহ (রযীআল্লাহু তা'আলা আনহু) কে যা বলতে শুনেছি, যা ইনসাফ ও দলীলপূর্ণ। তিনি বলেন, “আমি আল্লাহর কিতাবের উপর নির্ভর করি। আর আল্লাহর কিতাবে যা না পাই, সেই বিষয়ে রসূলুল্লাহ ﷺ এর সুন্নাতের উপর নির্ভর করি। কিতাব ও সুন্নাতে যা না পাই, সে বিষয়ে সাহাবায়ে কেরামের বক্তব্যের উপর নির্ভর করি। তাঁদের মধ্য থেকে যার মত ইচ্ছা গ্রহণ করি এবং যার মত ইচ্ছা বাদ দেই, তবে তাঁদের মত ছেড়ে অন্য কারো কথার দিকে যাই না। আর যখন বিষয়টি ইমাম ইবরাহীম নাখাঈ, শা'বী, ইমাম হাসান বসরী রহ., ইমাম ইবনে সীরীন, আতা ইবনে আবী রবাহ রহ., সাঈদ ইবনুল মুসায়্যাব প্রমুখ তাবে'ঈগণের পর্যায়ে আসে, তখন তারা যেমন ইজতিহাদ করেছেন, আমিও তেমন ইজতিহাদ করি।’’


এই কথা শুনে ইমাম সুফয়ান ছাওরী রহ. দীর্ঘসময় চুপ করে থাকেন। অতঃপর বলেন, “আমরা অনেক সময় কঠিন কথা শুনি, তখন ভীত হই। আবার কখনো নরম কথা শুনি, তখন আশাবাদী হই। আমরা জীবিতদের হিসাব নেই না এবং মৃতদের বিচারও করি না। যা শুনি, তা মেনে নিই এবং যা না জানি, তা ঐ ব্যক্তির উপর ছেড়ে দিই, যিনি জানেন। তাদের মতের বিপরীতে আমাদের মতকেই অভিযুক্ত করি।” [আখবারু আবী হানীফাহ: ২৪]


আপত্তি —১: সনদের রাবী عبيد بن أبي قُرَّة- য'ঈফ। সে মুনকার বর্ণনা রিওয়ায়েত করতো।


জবাব: হাফেয যাহাবী লিখেছেন - ما كل من روى المناكير يضعف - “মুনকার রেওয়ায়েত বর্ণনাকারী প্রত্যেক রাবীকে যঈফ বলতে হবে, বিষয়টা এমন নয়।” [মীযানুল ই'তিদাল: ১/১১৮]


আপত্তি —২: ইমাম উক্বায়লী রহ. তাঁর ‘কিতাবুয যু'আফাহ’তে তাকে উল্লেখ করেছেন। ইমাম ইবনে আদী তাঁর ‘আল-কামিল ফী দু'আফাইর রিজাল’-এ তাকে উল্লেখ করেছেন৷ ইমাম যাহাবী তাঁর ‘দিওয়ানুদ-দু'আফাহ’তে তাকে উল্লেখ করেছেন। ইমাম বুখারী তাকে তাঁর ‘আত তারীখুল কাবীর’-এ উল্লেখ করে সমালোচনা করেছেন৷


জবাব: লা-মাযহাবদেরই শায়খ কেফায়াতুল্লাহ সানাবিলী হাফি. লিখেছেন—


 محض ضعفاء والی کتب میں ذکر ہونے سے یہ لازم نہیں آتا کہ ضعفاء کے مولفین کی نظر


میں وہ راوی ضعیف ہے۔


অর্থ: স্রেফ যুয়াফা গ্রন্থসমূহে উল্লেখ হওয়ার দ্বারা এটা আবশ্যক হয় না যে, সংশ্লিষ্ট গ্রন্থপ্রণেতাদের দৃষ্টিতে সেই রাবী যঈফ। [আনওয়ারুল বদর: পৃষ্ঠা ১৯৪]


এর বিপরীতে, ইবনে মা'ঈন রহ. বলেন- ما كان به بأس - অর্থাৎ “উবায়দ ইবনে আবী কুর্রার ব্যাপারে কোনো সমস্যা নেই।” [সুওয়ালাতু ইবনিল জুনায়দ: ৪২৯]


ইমাম বুখারীর উস্তায আলী ইবনুল মাদীনী বলেন - ما كان به بأس - “তার ব্যাপারে কোনো সমস্যা নেই।” [প্রাগুক্ত: ৪৩০]


আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. তার থেকে বর্ণনা করতেন।


ইয়াকুব ইবনে শায়বাহ বলেন- هُوَ ثِقَةٌ صَدُوقٌ অর্থাৎ “উবায়দ ইবনে আবী কুর্রা ছিক্বাহ (তথা বিশ্বস্ত) ও সত্যবাদী।” [তারীখে বাগদাদ: ১১/৯৮]


 


 

মাসিক আল-আহনাফ / 6

 


ইমাম আ'যম আবূ হানীফাহ রহ. এর ওপর কিতাব চুরির অপবাদ ও জবাব 


 


লুবাব হাসান সাফওয়ান


 


বিদ্বেষীদের অভিযোগ:


نا عبد الرحمن أنا إبراهيم بن يعقوب الجوزجاني فيما كتب إلى [قال - 1] حدثنى اسحاق بن راهويه قال سمعت جريرا يقول قال محمد بن جابر اليمامى: سرق ابو حنيفة كتب حماد منى.


 


অর্থ: ইসহাক্ব বিন রহাওয়াইহ বলেন, জারিরকে বলতে শুনলাম, সে বলল, মুহাম্মদ বিন জাবির আল ইয়ামামি বলেনঃ আবু হানিফা হাম্মাদের কিতাবসমূহ আমার থেকে চুরি করেছে।


[الرازي، ابن أبي حاتم، الجرح والتعديل لابن أبي حاتم، ٤٥٠/٨]


পর্যালোচনা:


১. চোখ বন্ধ করেই বলে দেওয়া যায়, উপরিউক্ত ঘটনাটি সম্পূর্ণ জাল। কারণ, ইমাম আ'যম আবূ হানীফাহ রহ.-কে হাদীসের ক্ষেত্রে কেউ কেউ দুর্বল বললেও শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে কেউই তার তাকওয়া ও পরহেযগারিতা সম্পর্কে প্রশ্ন তুলতে পারেনি। সমস্ত ইমামের ঐকমত্যে তিনি ছিলেন একজন মহান বুযুর্গ, আবিদ, তাকওয়াবান ও পরহেযগার ইমাম। আর স্বভাবতই মুসলিম উম্মাহর একজন তাকওয়াবান ও পরহেযগার ইমামের দ্বারা চুরি করা অসম্ভব। তার মত মহান বুযুর্গ ইমাম কেন, সাধারণ একজন আলেমের শানেও তো চুরির অপবাদটা যায় না। যারা তাঁর নামে এই অপবাদ দিয়েছে আল্লাহ তাদের বিবেক-বুদ্ধি ছিনিয়ে নিয়েছে। তারা ইমাম আবূ হানীফা'র শত্রুতায় নিজেদেরকে অন্ধ হিসেবে প্রতিপন্ন করেছে। তাই তো তারা এই মহান ইমামের শানে বেয়াদবীর সকল সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে। 


২. ইমাম আবূ হানীফাহ কর্তৃক ইমাম হাম্মাদের কিতাব চুরি করা একেবারেই যুক্তিহীন। কারণ হাম্মাদ ছিলেন তাঁর শায়খ। তিনি শায়খ হাম্মাদের নিকট ২০ বছরের অধিক সময় ছিলেন। তাহলে তিনি ঐ কিতাবসমূহ থেকে কী পাবেন যা তিনি বিশ বছরেও পাননি? যদি তিনি ইমাম হাম্মাদের সাক্ষাৎ না পেতেন, তাহলে মানা যেতো যে, তাঁর থেকে অজানা ইলমগুলো অর্জন করার জন্য তিনি তাঁর কিতাব চুরি করেছেন। কিন্তু ব্যাপারটা তো এমন নয়। তাছাড়া উস্তাদের কিতাব চুরি করা নিম্নমানের কোনো ছাত্রের দ্বারাও তো সম্ভব হয় না। কমনসেন্সের দাবি হলো, উম্মাহের এই মহান ইমামের নামে এমন ধরনের অভিযোগ করা একেবারেই অযৌক্তিক, অবিশ্বাস্য ও হাস্যকর। 


৩. এই বর্ণনার প্রধান রাবী হলেন, মুহাম্মদ ইবনে জাবের আল-ইয়ামামী। তিনি অত্যন্ত দুর্বল ও নিতান্তই অগ্রহণযোগ্য! তাছাড়া তিনি ছিলেন অন্ধ। তার ব্যাপারে ইমাম বায়হাকী রহ. বলেন, متروك، ومرة: ضعيف - অর্থাৎ, তিনি পরিত্যাজ্য। কখনওবা বলেছেন, তিনি য'ঈফ। 


ইমাম আবু দাউদ রহ. বলেন, ليس بشيء، ومرة: ضعفه - তিনি কোনো বস্তুই নন, কখনও আবার দুর্বল বলেছেন।


আহমাদ বিন হাম্বল রহ. বলেন, 


لا يحدث عنه إلا شر منه، ومرة: يروي أحاديث مناكير، يقولون رأوا في كتبه نحو حديثه عن حماد فيه اضطراب، ومرة: منكر


أنكره جدا


অর্থাৎ, তার সূত্রে তার চেয়ে মন্দ ব্যতীত কেউ বর্ণনা করে না। তিনি আপত্তিকর হাদীস বর্ণনা করেন। মুহাদ্দিসগণ তাঁর কিতাবে হাম্মাদ থেকে বর্ণিত হাদীসসমূহ পরখ করে দেখলেন তাতে ‘ইযতিরাব’ তথা নানা ধরনের বৈপরীত্য, গোলমাল ও অসঙ্গতি রয়েছে। তিনি অত্যন্ত আপত্তিজনক বর্ণনাকারী।


হাফেয যাহাবী রহ. বলেন, سيئ الحفظ - তার স্মৃতিশক্তি দুর্বল। 


ইমাম বুখারী রহ. বলেন, ليس بالقوي، يتكلمون فيه، روى مناكير


অর্থাৎ, তিনি শক্তিশালী নন। তিনি আপত্তিকর রেওয়ায়েত বর্ণনা করেন। ইমামগণ তার ব্যাপারে সমালোচনা করেছেন। 


উক্ত বর্ণনারই আরেকজন রাবী ইবরাহীম ইবনে ইয়াকুব, তাঁর নিজেরই মন্তব্য


إبراهيم بن يعقوب الجوزجاني : ضعفه، ومرة: غير مقنع 


অর্থ: মুহাম্মদ ইবনে জাবের আল-ইয়ামামী দুর্বল। অন্যত্র বলেন, তিনি বিশ্বাসযোগ্য নন।


ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে মা'ঈন রহ. বলেন, 


اختلط عليه حديثه وهو ضعيف، ومرة: لا يحدث عنه إلا من هو أشر منه، ومرة: عمي واختلط، ومرة: ليس بشيء


অর্থ: তার হাদীসগুলো (সঠিক-বেঠিকে) মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে এবং তিনি দুর্বল। অন্যত্র বলেছেন, তার সূত্রে তার চেয়ে মন্দ ব্যতীত কেউ হাদীস বর্ণনা করে না। তিনি ছিলেন অন্ধ ও বিভ্রান্তির শিকার। অন্যত্র বলেন,


তিনি কোনো বস্তুই না। [তথ্যসূত্র: আয-যু'আফাউল কাবীর: ৪/১৪]


এই বর্ণনার বাকী রাবীদের অবস্থা যদি রিজাল শাস্ত্রের প্রখ্যাত ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে মা'ঈন রহ. ও আহমদ বিন হাম্বল এর সুরে বলি, তাহলে এই বর্ণনার বাকি রাবীদের অবস্থা হলো, উক্ত রাবীর চেয়ে নিম্নমানের। কারণ, তাঁরা বলেছেন- মুহাম্মদ ইবনে জাবের এর সূত্রে তার চেয়ে মন্দ ব্যতীত কেউ বর্ণনা করে না। তো, যেহেতু তার সূত্রে বাকিরা এই জাল ঘটনা বর্ণনা করেছে, সেহেতু তাদের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। 


আসলে বড়দের ভুল ধরতে গেলে নিজেদেরকেই ছোট হতে হয়। বারবার তা প্রমাণিত হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে কারো প্রতি মিথ্যারোপ করা থেকে হিফাযতক রুন।


 

মাসিক আল-আহনাফ / 7

রাবীকে ছিকাহ বা য'ঈফ বলা ও এতদসংক্রান্ত কয়েকটি উসূল 


মূল: ড. আব্দুল গনী বিন আহমদ


অনুবাদ: লুবাব হাসান সাফওয়ান 


 


১. কখনো কখনো রাবী বিরল ও সন্দেহযুক্ত হাদীস বর্ণনা করা এবং কিছু হাদীসের ক্ষেত্রে ভুল করা অথবা তার কিছু হাদীসের ক্ষেত্রে মুতাবা'আত (অপরাপর সাক্ষ্য) না থাকা সত্ত্বেও তাকে ‘ছিকাহ’ আখ্যায়িত করা হয়।


২. কোনো কোনো রাবীকে ইলমের কিছু কিছু শাখায় গ্রহণযোগ্য ধর্তব্য করা হয়। অন্যান্য (সকল) ক্ষেত্রে নয়। যেমন যুদ্ধ, কিরাআত এবং এতদসংক্রান্ত মাসআলা ইত্যাদির ক্ষেত্রে; হাদীসের ক্ষেত্রে নয়।


ইয়াহয়া ইবনে মা'ঈন রহ. যিয়াদ ইবনে আব্দিল্লাহ এর ব্যাপারে বলেন- 


لا بأس به في المغازي، وأما في غيره فلا


অর্থ: যুদ্ধাভিযান ইত্যাদির ক্ষেত্রে তিনি সমস্যাযুক্ত নন; তথা গ্রহণযোগ্য। কিন্তু অন্যান্য ক্ষেত্রে তিনি গ্রহণযোগ্য নন। [আল-কাশিফ: ১/৪১১]


সালেহ রহ. তাঁর ব্যাপারে বলেন-


هو على ضعفه أثبتهم في المغازي


অর্থ: তিনি দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও যুদ্ধাভিযানের ক্ষেত্রে তিনি অন্যদের চেয়েও বেশি বিশ্বস্ত ও গ্রহণযোগ্য। [আল-কাশিফ: ১/৪১১]


৩. আবার কখনো কখনো কোনো রাবীর ব্যাপারে ছিকাহ  বলা  হয়,  অথচ  তিনি (প্রায়শই)  ইরসাল করেন; অথবা অমুক অমুক থেকে মুরসাল বর্ণনা করেছেন। অতএব তার হাদীস মুত্তাসিল নয়।


৪. আবার কখনো নির্দিষ্ট একটি হাদীসের ওপর ‘মুনকার’ শব্দ প্রয়োগ করা হয়, অথচ বর্ণনাকারী মাকবূল। এটা হচ্ছে কিছু মুতাকাদ্দিমীন (পূর্ববর্তী) ইমামগণের সুনির্দিষ্ট পরিভাষা, যেমন আহমদ এবং নাসাঈ। এবং এর ওপর কিছু পরবর্তী ইমামগণও চলেছেন, যেমন  বারদীজী  রহ.।  অতএব  প্রত্যেক ওই হাদীস- যার ব্যাপারে মুনকার বলা হয়েছে- ততক্ষণ পর্যন্ত প্রত্যাখ্যাত নয় যতক্ষণ পর্যন্ত মুনকার আখ্যায়িতকারীর পরিভাষা জানা না যাবে। (সংক্ষেপিত)


সূত্র:


https://www.alukah.net/sharia/0/335/%D8%A3%D8%B5%D9%88%D9%84-%D8%A7%D9%84%D8%AA%D8%B5%D8%AD%D9%8A%D8%AD-%D9%88%D8%A7%D9%84%D8%AA%D8%B6%D8%B9%D9%8A%D9%81/#ixzz8BalI00HL

মাসিক আল-আহনাফ / 8

উলামায়ে দেওবন্দ কারা: কী তাদের বৈশিষ্ট্য


আব্দুল আযীয বিন মাহবূব


 



এতদঞ্চলে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলেন উলামায়ে দেওবন্দের মুবারক জামাত। উলামায়ে দেওবন্দের ইলম আমল ও তাকওয়া-তাহারাত প্রবাদতূল্য। তাঁদের আখলাক চরিত্র সালাফে সালেহীনের আখলাকের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এমন একটি মুবারক জামাতকে বিদ'আতী ও সালাফী উভয় ঘরানা প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায় এবং তাঁদের মাকামের উপর প্রশ্ন উঠাতে চায়। বস্তুত কেউ যদি ই'তিদালী নজরে উলামায়ে দেওবন্দের জীবনচরিত পাঠ করে তাহলে সে কখনোই তাঁদের ব্যাপারে খারাপ মন্তব্য করতে পারবে না; বরং তাদের আকাশচুম্বী আখলাক ও ইলমের অবস্থা দেখে ভক্ত হতে বাধ্য হবে।


উলামায়ে দেওবন্দের বর্তমান সময়ের শ্রেষ্ঠতম ভাষ্যকার শাইখুল ইসলাম মুফতি তাকী উসমানী হাফিযাহুল্লাহ বয়ান বক্তৃতার পাশাপাশি রচনা ও লেখালেখির মাধ্যমে উলামায়ে দেওবন্দের মাকাম নিয়ে আলোচনা করেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ কিতাব হলো, اکابر دیوبند کیا تھے


এই কিতাবটি বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় মুহাক্কিক আলেম হযরত মাওলানা তাহমীদুল মাওলা হাফিযাহুল্লাহ প্রতিভাবান আলেম মাওলানা আনাস বিন আবদুস সামাদ হাফিযাহুল্লাহর মাধ্যমে কিতাবটি অনুবাদ করিয়েছেন علماء ديوبند: نماذج من حياتهم الدينية والعلمية নামে। কিতাবটি আরবের মাকতাবাতুল গানিম ও মুআসসাসা ইলমিয়্যাহ বাংলাদেশ এর যৌথ উদ্যোগে জর্ডান ও বাংলাদেশ থেকে মাসখানেক আগে প্রকাশ পেয়েছে।


আশা করি ভারত উপমহাদেশের পাশাপাশি আরব বিশ্বে উলামায়ে দেওবন্দের বিরুদ্ধে অপপ্রচারকারীদের অপপ্রচার রোধে কিতাবটি শক্ত ভূমিকা পালন করবে ইনশাআল্লাহ।


আজ মুআসসাসাহ ইলমিয়্যার পক্ষ থেকে পাঠানো গুরুত্বপূর্ণ হাদিয়াটি হাতে এসে পৌঁছেছে আলহামদুলিল্লাহ। কিতাবটি হাতে নিয়েই কয়েক পৃষ্ঠা পড়লাম। মাশাআল্লাহ আরবীর মান অনেক ভালো।ভাষা ঝরঝরে ও সাবলীল হয়েছে।


আল্লাহ তাআলা কিতাবটির সাথে যে কোনভাবে সংশ্লিষ্ট সকলকে জাযায়ে খাইর দান করুন। আমীন।


 


 

মাসিক আল-আহনাফ / 9

মক্কা-মদীনার আকীদাই কি সহীহ আকীদা!


আবু বকর তাওহীদ


 



আমাদের মাতুরীদী আলিমদের আকীদার বক্তব্য দেখে এদেশের বদ মাযহাবী সালাফিরা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছে। এরা মদীনার আকীদা সহীহ না কিন্তু মাতুরীদী আশয়ারী আকীদা সহীহ বলায় খুব ক্ষিপ্ত।


আফসোস লাগে এ জাহেলদেরকে নিয়ে। হাজারেরও অধিক কাল ধরে মক্কা মদীনা চার মাযহাবী ও আশয়ারী মাতুরীদী উলামায়ে কিরামের নিয়ন্ত্রিত ছিল। গত এক হাজার বছরের মক্কা মদীনার আলিমদের জীবনীগ্রন্থ ও ইতিহাস পড়লে এটা দিবালোকের মত স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। তখন তথাকথিত বদ মাযহাবী সালাফীদের কোন অস্তিত্বই ছিল না।


এরপর দুশ বছর আগে আগমন ঘটে বিখ্যাত খারেজী মুহাম্মাদ বিন আব্দিল ওয়াহহাব নজদী, বিন সউদ ও তার অনুসারী চেলাদের , যারা নিরীহ মুসলমানদের মুশরিক কাফির অ্যাখ্যা দিয়ে মারামারি হত্যাকান্ড করে মক্কা মদীনা দখল করে। আহলুস সুন্নাহ আশয়ারী মাতুরীদী চার মাজহাবের শাসক ও আলিমরা তাদের কয়েকবার পরাস্ত করে।


কিন্তু শেষে গত শতাব্দীতে এ খারেজী নজদী সউদরা তাদের বাতিল গোমরাহী রাস্ট্র সৌদি আরব প্রতিষ্ঠা করে। একে তাদের বাতিল আকীদা প্রচারের কেন্দ্র বানায়। মক্কা মদীনা, আর নজদে ( বর্তমান রিয়াদে) শত শত ভার্সিটি স্থাপন করে আমাদের হাজার বছরের অনুসৃত ইমামদের গোমরাহ অ্যাখ্যা দিয়ে শত শত গবেষণা পত্র নামক শয়তানি পত্র লিখেছে। এখান থেকে বিভিন্ন দেশে ফেতনাবাজ দায়ী প্রেরণ করে দেশে দেশে অশান্তি তৈরি করছে। সিরিয়া, মিশর, তিউনিসিয়া, মরক্কো, তুরস্ক, আফগানিস্তান, ভারত, পাকিস্তানের আলিমরা তাদের শয়তানী কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে লিখে যাচ্ছেন।


যারা মক্কা মদীনার আলিমদের বিরোধিতা করলে ক্ষেপে যান তারা শুধু এতটুকু স্মরন রাখলেই হবে যে, গত হাজার বছর এ নগরী মাযহাবী ও আশয়ারী মাতুরীদী আকীদার আলিমদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। আর গত একশ বছর ধরে সালাফী মাদখালী খারেজীদের দখলে আছে। যদি মক্কা মদীনার আকীদাই মানতে চান তাহলে হাজার বছরের আকীদা মানুন। শত বছরের খারিজী আকীদা নয়। হাজার বছরের মজবুত আকীদার ইতিহাস চেপে গিয়ে শত বছরের গজিয়ে উঠা নব্য খারিজী আকীদার প্রতি এত আগ্রহ কেন? গত শতাব্দীর আগে পৃথিবীতে আসলে মদীনার আকীদা কি মানতেন? তখনকার আশয়ারী মাতুরীদী আকীদাকে হক বলতেন? তাহলে ডাবল স্ট্যান্ডার্ড কেন রে ভাই? এখনেরটা সহীহ হলে আগেরটা ভুল হবে কেন?


আল্লাহ তায়ালা খারিজী নজদীদের অপবিত্র দখলের হাত হতে এ পবিত্র নগরীদ্বয়কে মুক্ত করুন।


 

মাসিক আল-আহনাফ / 10

হানাফী মাযহাবে কি মু’তাযিলী উসূল অনুপ্রবেশ করেছে?


আয়াতুল্লাহ আহনাফ


 



এই সংশয়টি সৃষ্টি হয়েছে মূলত হানাফীদের উসূলের কিতাব উসূলুশ শাশীর একটি ‘ইবারত থেকে। যেমন- উসূলুশ শাশীতে রয়েছে গায়রে ফকীহ সাহাবীদের হাদীস কিয়াসের বিপরীত হলে তা অগ্রহণযোগ্য। এটাকে অনেকে মু'তাযিলী (আকীদাহর) উসূল মনে করেন ‘ঈসা ইবনু আবানের দিকে নিসবত করে। কারণ, হিসেবে দেখায় তিনি মু'তাযীলাহ ছিলেন।


এরপর এই আপত্তিটা তুলেছেন শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়্যাহ রহ.। তিনি ‘মিনহাজুস সুন্নাহ’র ৫/২৬১-এ বলেন-


وَكَذَلِكَ الْحَنَفِيُّ يَخْلِطُ بِمَذَاهِبِ أَبِي حَنِيفَةَ شَيْئًا مِنْ أُصُولِ الْمُعْتَزِلَةِ وَالْكَرَّامِيَّةِ وَالْكُلَّابِيَّةِ، وَيُضِيفُهُ إِلَى مَذْهَبِ أَبِي حَنِيفَةَ.


অর্থ: এমনিভাবে হানাফী মাযহাবে মু'তাযিলী উসূল মিশ্রিত হয়ে গেছে।


পরবর্তীতে সমালোচকরা উসূলুশ শাশীর এই 'ইবারত নিয়ে বলে থাকেন যে হানাফী ফিকহে মু’তাযিলী উসূল রয়েছে। উসূলটি হলো-


وَالْقسم الثَّانِي من الروَاة هم المعروفون بِالْحِفْظِ وَالْعَدَالَة دون الِاجْتِهَاد وَالْفَتْوَى كَأبي هُرَيْرَة وَأنس بن مَالك فَإِذا صحت رِوَايَة مثلهمَا عنْدك فَإِن وَافق الْخَبَر الْقيَاس فَلَا خَفَاء فِي لُزُوم الْعَمَل بِهِ وَإِن خَالفه كَانَ الْعَمَل بِالْقِيَاسِ أولى مِثَاله مَا روى أَبُو هُرَيْرَة الْوضُوء مِمَّا مسته النَّار


অর্থ: রাবীদের দ্বিতীয় প্রকার: যারা হিফয ও 'আদালতে প্রসিদ্ধ (কিন্তু) ইজতিহাদ ও ফাতাওয়াতে অপ্রসিদ্ধ; যেমন আবূ হুরায়রাহ ও আনাস ইবনু মালিক রা.। যদি তাদের থেকে কোনো হাদীস সহীহ সুত্রে তোমার কাছে পৌঁছে এবং কিয়াসের মুওয়াফিক হয়, (তাহলে) তার উপর আমল করা ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে কোনো অস্পষ্টতা নেই। আর যদি কিয়াসের বিপরীত হয়,তাহলে কিয়াসের উপর আমল করা উত্তম। তার উদাহরণ হলো, রান্না করা খাবার খাওয়ার পর ওয়াযূ করা সংক্রান্ত আবূ হুরায়রাহ রা. এর হাদীসটি। [উসূলুশ শাশী: ২৭৫]


মূলত এই উসূলটির আবিষ্কারক হলেন 'ঈসা ইবনু আবান রহ- যাকে মু'তাযীলাহ গণ্য করা হয়।



উসূলটি আবিষ্কারের প্রেক্ষাপট:


একটি মাসআলাহকে কেন্দ্র করে এ উসূলটি যাহির হয়। সূরতে মাসআলাহ হলো, যদি কোনো ব্যক্তি উট কিংবা বকরিকে মোটাতাজা দেখা যাওয়ার জন্য দুধ দোহন না করে আটকিয়ে রেখে বিক্রয় করে পরবর্তীতে কি ক্রেতার জন্য এই ক্রয় ভঙ্গ করার এখতিয়ার থাকবে নাকি থাকবে না! এখানে ইমাম শাফে'ঈ রহ. আর আবূ হানীফাহ রাহিমাহুল্লাহ এর মাঝে ইখতিলাফ। ইমাম শাফে‘ঈ রাহিমাহুল্লাহ হাদীসের বাহ্যিক দিকে লক্ষ করে বলেন, তার (ক্রেতার) জন্য ক্রয় ভঙ্গ করার পূর্ণ অধিকার থাকবে। দুধ দোহন করে থাকলে দুধের মুল্য ও সাথে হাদীস অনুযায়ী এক সা’ খেজুর দিতে হবে। যেমন হাদীসে রয়েছে—


، وَلاَ تُصَرُّوا الْغَنَمَ، وَمَنِ ابْتَاعَهَا فَهْوَ بِخَيْرِ النَّظَرَيْنِ بَعْدَ أَنْ يَحْتَلِبَهَا إِنْ رَضِيَهَا أَمْسَكَهَا، وَإِنْ سَخِطَهَا رَدَّهَا وَصَاعًا مِنْ تَمْرٍ ‏"‏‏.‏


অর্থ: আবূ হুরায়রাহ (রা.) থেকে বর্ণিত- আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, তোমরা বকরির দুধ আটকিয়ে রাখবে না। যে এরূপ বকরি ক্রয় করবে, সে দুধ দোহনের পরে এ দু’টির মধ্যে যেটি ভাল মনে করবে, তা করতে পারে। সে যদি এতে সন্তুষ্ট হয় তবে বকরি রেখে দেবে, আর যদি সে তা অপছন্দ করে তবে ফেরত দিবে এবং এক সা’ পরিমাণ খেজুর দিবে। [সহীহুল বুখারী: ২১৫০]


কিন্তু, ইমাম আ'যম আবূ হানীফাহ রহ. বলেন পরিপূর্ণ খেয়ার ছাবেত হবে না। এই জন্য দুধের মূল্য দেওয়া ওয়াজিব নয়। (হ্যাঁ বিক্রেতার সন্তুষ্টি আর বিচারকের ফয়সালার ভিত্তিতে বিক্রয় ফসখ (ভঙ্গ) করতে পারে।)
'ঈসা ইবনু আবান দেখলেন এখানে আবূ হানীফাহ রহ. আবূ হুরায়রা রা. এর হাদীস অনুযায়ী আমল না করে ক্বিয়াস অনুযায়ী আমল করেছেন। এই জন্য তিনি এখান থেকে এই উসূল আবিষ্কার করলেন যে, গায়রে ফকীহের হাদীস যদি ক্বিয়াসের বিপরীত হয় তাহলে ক্বিয়াসের উপর আমল করা উত্তম, যেমনটি আবূ হানীফাহ রহ. করেছেন।


আবূ হানীফাহ রহ. এর যুক্তি ছিলো বিক্রয়টি ভঙ্গ করার আগে ছাগলটি ক্রেতার যিম্মায় ছিলো যদি ক্রেতার কাছেই বকরিটি মারা যেতো ক্রেতারই ক্ষতি হতো। সুতরাং ক্ষতি হলেও তার লাভ হলেও তার। এই জন্য তার খেয়ারে কামেল ছাবেত হবে না। দ্বিতীয়ত: জরিমানা হয়তো ‘মিছল’ দিয়ে দেওয়া হবে বা মূল্য দিয়ে, কিন্তু এখানে দেওয়া হচ্ছে ভিন্নভাবে।


আসলে এখানে 'ঈসা ইবনু আবান বুঝতে ভুল করেছেন। প্রকৃতপক্ষে এটি আবূ হানীফাহ রহ. এর ক্বিয়াস নয় বরং অন্য একটি হাদীসের বক্তব্য। অর্থাৎ পণ্য যার অধীনে থাকবে সেখানে কোনো ক্ষতি কিংবা লাভ হলে এটা তার থেকে ধরা হবে। যেমন ‘সুনানুন নাসাঈ’তে রয়েছে আম্মাজান 'আইশাহ রা. থেকে বর্ণিত—


أَخْبَرَنَا إِسْحَاقُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ قَالَ: حَدَّثَنَا عِيسَى بْنُ يُونُسَ، وَوَكِيعٌ قَالَا: حَدَّثَنَا ابْنُ أَبِي ذِئْبٍ، عَنْ مَخْلَدِ بْنِ خُفَافٍ، عَنْ عُرْوَةَ، عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: " قَضَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَنَّ الْخَرَاجَ بِالضَّمَانِ "


অর্থ: তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফয়সালা দিয়েছেন যে, দায়িত্ব যার উসূলও তার। [সুনানুন নাসাঈ: ৪৪৯০]


সুতরাং, এখানে যেহেতু ক্রেতার অধীনে ছিলো। তাই ক্ষতি হলে যেমন তার থেকে যেতো; তো এখন লাভ হলেও তারই হবে। অতএব, দুধের মূল্য ফিরিয়ে দেওয়া ওয়াজিব নয়।


এখান থেকে প্রমাণিত হলো যে, এটা ইমাম আবূ হানীফাহ রহ. কিংবা হানাফী কারো উসূল নয়। বরং এক্ষেত্রে অন্য একটি হাদীসের উপর আমল করা হয়েছে। এ জন্য ইমাম শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলবী হানাফী রহ. এই দিকে ইঙ্গিত দিয়ে সতর্ক করে দিয়েছেন, যাতে কেউ ধোঁকা না খায়! তিনি বলেন যে এর উপর মাযহাবের ভিত্তি নয়।


وَبَعْضهمْ يزْعم أَن بِنَاء الْمَذْهَب على هَذِه المحاورات الجدلية الْمَذْكُورَة فِي مَبْسُوط السَّرخسِيّ وَالْهِدَايَة والتبيين وَنَحْو ذَلِك، وَلَا يعلم أَن أول من أظهر ذَلِك فيهم الْمُعْتَزلَة، وَلَيْسَ عَلَيْهِ بِنَاء مَذْهَبهم


অর্থ: তাদের কেউ কেউ মনে করে হানাফী মাযহাবের ভিত্তি এ সকল ইখতিলাফী বিষয়ে ইমাম সারাখসীর মাবসূত এবং হিদায়াহ ও এই ধরনের কিতাবগুলো। কিন্তু তারা জানে না, সর্বপ্রথম এগুলো (গায়রে ফকীহের হাদীস অগ্রহণযোগ্য হওয়া) যে আহনাফদের মধ্যে প্রকাশ করেছে সে মু'তাযিলাহ। আর এর ওপর মাযহাবের ভিত্তিও প্রতিষ্ঠিত নয়। [হুজ্জাতু্ল্লাহিল বালিগাহ: ১/২৭১]


এরপরে হানাফীদের পক্ষ হয়ে ইমাম দেহলবী হানাফী রহ. এই মতটি হানাফী আলেমদের দ্বারা খন্ডন করেন। তিনি বলেন,


وَيَكْفِيك دَلِيلا على هَذَا قَول الْمُحَقِّقين فِي مَسْأَلَة لَا يجب الْعَمَل بِحَدِيث من اشْتهر بالضبط وَالْعَدَالَة دون الْفِقْه إِذا انسد بَاب الرَّأْي كَحَدِيث الْمُصراة أَن هَذَا مَذْهَب عِيسَى بن إبان، وَاخْتَارَهُ كثير من الْمُتَأَخِّرين، وَذهب الْكَرْخِي وَتَبعهُ الْكثير من الْعلمَاء إِلَى عدم اشْتِرَاط فقه الرَّاوِي لتقدم الْخَبَر على الْقيَاس، قَالُوا: لم ينْقل هَذَا القَوْل عَن أَصْحَابنَا، بل الْمَنْقُول عَنْهُم أَن خبر الْوَاحِد مقدم على الْقيَاس، أَلا ترى أَنهم عمِلُوا بِخَبَر أبي هُرَيْرَة فِي الصَّائِم إِذا أكل أَو شرب نَاسِيا، وَإِن كَانَ مُخَالفا للْقِيَاس حَتَّى قَالَ أَبُو حنيفَة رَحمَه الله: لَوْلَا الرِّوَايَة لَقلت


অর্থ: এর অসারতার জন্য তোমার জন্য দলীল হিসাবে যথেষ্ট হবে মুহাক্কিকীনদের বক্তব্য। যে ব্যক্তি 'আদালত এবং যবতে প্রসিদ্ধ (কিন্তু) ফিকহের ক্ষেত্রে অপ্রসিদ্ধ তার হাদীসের উপর আমল করা হবে না। যখন রায়ের দরজা বন্ধ। যেমন মুসার্রাতের হাদীস, এটা 'ঈসা ইবনু আবান এর মাযহাব এবং পরবর্তী অনেকে এটা গ্রহণ করেছে। কিন্তু ইমাম কারখী রহ. আরো অনেকে তার অনুসরণ করে বলেন ফকীহ হওয়া শর্ত নয়। কারণ ক্বিয়াসের উপর হাদীস অগ্রগামী। তারা বলেন, গায়রে ফকীহের হাদীস অগ্রহণযোগ্য এটা আমাদের কোন আলেম বলেননি। বরং তাদের থেকে বর্ণিত আছে, খবরে ওয়াহিদ ক্বিয়াসের উপর প্রধান্যপ্রাপ্ত। তারা কি দেখে না, হানাফীরা রোযাদারের ক্ষেত্রে আবূ হুরায়রাহ রা. এর হাদীসের উপর আমল করেছে; যখন কোনো ব্যক্তি ভুলে খায় বা পান করে, যদিও তা ক্বিয়াস পরিপন্থী। এমনকি আবূ হানীফাহ রহ. বলেছেন, যদি হাদীস না থাকতো আমি বলতাম রোযা ভেঙ্গে গেছে ক্বিয়াসের উপর ভিত্তি করে। [হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ: ১/২৭৩]



এর টিকায় আল্লামা সা‘ঈদ আহমদ পালনপুরী রহ. লিখেন,


يه مذهب كے أصلي أصول نهيں هيں


অর্থ: এটা মাযহাবের মৌলিক কোনো উসূল নয়। [রহমাতুল্লাহিল ওয়াসিয়াহ: ২/৭৩৪]


স্বয়ং উসূলুস শাশীর ব্যখ্যাদাতারাও এটা কে অস্বীকার করেছেন,


مگر صحيح يه هے كه خبر كو هر طرح قياس پر ترجيح وتقديم هيں،


অর্থ: কিন্তু সহীহ হলো, খবর প্রত্যেক ধরনের ক্বিয়াসের উপর প্রাধান্য ও অগ্রগণ্য হবে। [মুয়াল্লিয়ামুল উসূল শরহে উসূলুস শাশী: ২২৪]


যেমনটি হানাফীদের কিতাব হিদায়ার মধ্যে রয়েছে -


والقياس في مقابلة النص المنقول غير مقبول


অর্থ: স্পষ্ট নস (কুরআন-হাদীসের) বিপরীতে ক্বিয়াস অগ্রহণযোগ্য। [হিদায়াহ: ১/২২৯]


ইমাম 'আলাউদ্দীন বুখারী রহ. স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন-


وَدَلَّتْ الْمَسَائِلُ الْمُتَفَرِّقَةُ عَنْ أَصْحَابِنَا فِي الْمَبْسُوطِ وَغَيْرِ الْمَبْسُوطِ عَلَى أَنَّهُمْ لَمْ يَمِيلُوا إلَى شَيْءٍ مِنْ مَذَاهِبِ الِاعْتِزَالِ وَإِلَى سَائِرِ الْأَهْوَاءِ


অর্থ: আমাদের আসহাবদের বিভিন্ন মাসআলাহ যেগুলো মাবসূত এবং অন্যান্য গ্রন্থে রয়েছে এগুলো এটার ওপর দালালত করে যে, হানাফী মাযহাবের কেউ মু'তাযিলী উসূলের দিকে ধাবিত হননি। [কাশফুল আসরার: ১/১০]


ইমাম সারাখসী রহ.ও বলেছেন, এক-দু’জন যারাই সালাফের উসূল উপেক্ষা করে মু'তাযিলী উসূলের দিকে ধাবিত হয়েছেন এটা বিরাট ভুল। আহলুস সুন্নাহর বিরোধী। তাঁর বক্তব্য—


وَزعم بعض أَصْحَابنَا أَن التَّخْصِيص فِي الْعِلَل الشَّرْعِيَّة جَائِز وَأَنه غير مُخَالف لطريق السّلف وَلَا لمَذْهَب أهل السّنة وَذَلِكَ خطأ عَظِيم من قَائِله فَإِن مَذْهَب من هُوَ مرضِي من سلفنا أَنه لَا يجوز التَّخْصِيص فِي الْعِلَل الشَّرْعِيَّة وَمن جوز ذَلِك فَهُوَ مُخَالف لأهل السّنة مائل إِلَى مائل إِلَى أقاويل الْمُعْتَزلَة فِي أصولهم [السرخسي، أصول السرخسي، ٢٠٨/٢]



'ঈসা ইবনু আবান রহ. কোনো মু'তাযিলাহ নন। আমরা তিনটি কিতাবে তার জীবনী দেখেছি কোথাও তাকে মু'তাযিলাহ বলা হয়নি, তাজুত তারাজিম, আল-ই'লাম, তারীখে বাগদাদ। এবং বক্তব্যটা তাঁর থেকে প্রমানিতও নয়। কারণ তার থেকে ভিন্ন একটা বর্ণনা রয়েছে, যেখানে তিনি সাহাবী এবং তাবে'ঈ ও তাবে তাবে'ঈর মুরসাল বর্ণনা গ্রহণ করেছেন। যেমন তার থেকে বর্ণনা রয়েছে-


عِيسَى بْنُ أَبَانَ، فَقَبِلَ مَرَاسِيلَ الصَّحَابَةِ وَالتَّابِعِينَ وَتَابِعِي التَّابِعِينَ دُونَ مَنْ عَدَاهُمْ وَلَعَلَّهُ يَسْتَدِلُّ عَلَى هَذَا بِحَدِيثِ "خَيْرُ الْقُرُونِ قَرْنِي ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ ثُمَّ الذين يلونهم ثم يفشو الكذب


অর্থ: ঈসা ইবনু আবান রহ. সাহাবী, তাবে'ঈ, তাবে তাবে'ঈ এর মুরসাল রেওয়ায়েত কবূল করেছেন। হয়তো তিনি এর ওপর এই হাদীস “সর্বোত্তম যুগ আমার যুগ, অতঃপর যারা তাদের সাথে সাক্ষাৎ করবে, এরপর যারা তাদের সাথে সাক্ষাৎ করবে” দিয়ে দলীল দিয়েছেন। [ইরশাদুল ফুহুল: ১/১৭৩]


যেখানে তিনি 'আমভাবে সাহাবী, তাবে'ঈ, তাবে তাবে'ঈর মুরসাল বর্ণনা গ্রহণ করেছেন সেখানে গায়রে ফকীহ ক্বয়েদ দিয়ে কারো বর্ণনা বাদ দেওয়ার অপবাদ ভুয়া হতে পারে।


যাইহোক, মূলত হানাফীরা ক্বিয়াসের উপর হাদীসকে প্রাধান্য দেয় যদিও তা য'ঈফ হয়। এটা সর্বমহলে আলোচিত বিষয়। যেমন হাফেয ইবনুল কায়্যিম রহ. বলেন-


فقدم أبو حنيفة حديثَ القهْقَهَة في الصلاة على مَحْض القياس، وأجمع أهل الحديث على ضَعْفِه وقدم حديثَ الوضوء بنبيذ التمر على القياس، وأكثر أهل الحديث يُضَعِّفه ، وقدَّم حديثَ: "أكْثَرُ الحيضِ عَشَرَةُ أيامٍ وهو ضعيف باتفاقهم- على محض القياس؛ وقَدَّم حديثَ: "لا مهر أقلّ من عشرة دراهم"وأجمعوا على ضعفه।


অর্থ: আবূ হানীফাহ রহ. নামাযে অট্টহাসির হাদীসকে ক্বিয়াসের উপর প্রধান্য দিয়েছেন। কিন্তু মুহাদ্দিসদের ঐক্যমতে হাদীসটি য'ঈফ। এবং ‘নাবীযুত তামার’ দিয়ে ওয়াযূ করার হাদীসকে ক্বিয়াসের উপর প্রধান্য দিয়েছেন- এটাও অধিকাংশ হাদীস বিশারদের মতে য'ঈফ। ‘হায়েযের সর্বোচ্চ সময় দশদিন’ এই হাদীসকেও ক্বিয়াসের উপর প্রধান্য দিয়েছেন, এটাও য'ঈফ। “দশ দেরহামের কমে মোহর নেই” এই হাদীসকে ক্বিয়াসের উপর প্রধান্য দিয়েছেন, এটাও য'ঈফ। [ই'লামুল মু'আক্কী'ঈন: ২/৫৮]


উল্লেখ্য: নাসবুর রায়াহ-সহ হানাফী মাযহাবের তাখরীজের কিতাবাদিতে উক্ত হাদীসগুলোর সহীহ বা হাসান পর্যায়ের হওয়ার আলোচনা রয়েছে।
অট্টহাসির হাদীসটি মুসান্নাফু আব্দির রাজ্জাক-এ এসেছে।


" (3761) عن معمر، عن قتادة، عن أبي العاليه الرياحي " أن أعمى تردى في بئر، والنبي صلى الله عليه وسلم يصلي بأصحابه، فضحك بعضمن كان يصلي مع النبي صلى الله عليه وسلم، فأمر النبي صلى الله عليه وسلم من كان ضحك منهم أن يعيد الوضوء والصلاة "، وإسناده على إرساله صحيح،


অর্থ: হযরত আবুল আলিয়াহ রহ. থেকে বর্ণিত: একজন অন্ধ লোক কূপে পড়ে গেলো আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের নিয়ে সালাত আদায় করছিলেন। রাসূল সা. এর সাথে সালাতে শরীক থাকা কিছু সাহাবী হেসে দিলেন। রাসুল সা. যারা হেসেছে, তাদেরকে পুনরায় সালাত পড়া ও ওয়াযূ করার হুকুম দেন। [মুসান্নাফু আব্দির রাজ্জাক হাদীস: ৩৭৬১, নাসবুর রায়াহ: ১/৫৩]


ইমাম যাহাবী রহ. বলেন-


وَعَمِلَ أَبُو حَنِيْفَةَ، وَالشَّافِعِيُّ، وَغَيْرُهُمَا بِحَدِيْثِهِ: (أَنَّ مَنْ أَكَلَ نَاسِياً، فَلْيُتِمَّ صَوْمَهُ (2)) ، مَعَ أَنَّ القِيَاسَ عِنْدَ أَبِي حَنِيْفَةَ أَنَّهُ يُفْطِرُ، فَتَرَكَ القِيَاسَ لِخَبَرِ أَبِي هُرَيْرَة
بَلْ قَدْ تَرَكَ أَبُو حَنِيْفَةَ القِيَاسَ لِمَا هُوَ دُوْنَ حَدِيْثِ أَبِي هُرَيْرَةَ، فِي مَسْأَلَةِ القَهْقَهَةِ، لِذَاكَ الخَبَرِ المُرْسَلِ.


অর্থ: ইমাম আবূ হানীফাহ, শাফে'ঈ ও অন্যরা হাদীসের ওপর 'আমল করেছেন। তাদের নিকট ক্বিয়াস থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি ভুলে খেয়ে ফেলে সে যেন সিয়াম পুর্ণ করে নেয়। তারা ক্বিয়াসকে ছেড়ে দিয়েছেন, আবূ হুরায়রাহ রা. এর হাদীসের কারণে। আবূ হুরায়রাহ রা. এর হাদীস ছাড়াও আবূ হানীফাহ রহ. ক্বিয়াস তরক করেছেন। যেমন, অট্টহাসি দেওয়ার মাসআলা'য় মুরসাল হাদীসের উপর ভিত্তি করে তিনি ক্বিয়াস বর্জন করেছেন। [সিয়ারু আ'লামিন নুবালা: ২/১৬১]


বলাবাহুল্য, হানাফীদের শত্রুরাও এটা স্বীকার করেছেন যে, তারা ক্বিয়াস বাদ দিয়ে হাদীসের উপর আমল করে হাদীসটি য'ঈফ হলেও। যেমন, আহলে হাদীস শায়খ নবাব সিদ্দীক হাসান খান ভুপালী রহ.ও একই কথা তার কিতাব আল-হিত্তাহ-তে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন-


قال الملا علي القاري ان ابا حنيفة قدم الحديث ولو كان ضعيفا


অর্থ: ইমাম মুল্লা আলী ক্বারী রহ. বলেছেন- আবূ হানীফাহ রহ. হাদীসকে (নিজস্ব মতের ওপর) প্রাধান্য দেন যদিও তা য'ঈফ হয়। [আল-হিত্তাহ: ২২৮]


وذكر بن حزم الاجماع علي ان مذهب ابي حنيفة ان ضعف الحديث اولي عنده من الرأي والقياس


অর্থ: ইবনে হাযম রহ. বলেন, এ কথার উপর ইজমা' হয়েছে যে, আবূ হানীফাহ রহ. এর মাযহাবে য'ঈফ হাদীস উত্তম ক্বিয়াস আর রায় থেকে। [আল হিত্তাহ: ২২৮]


অন্য জায়গায় রয়েছে—


قال إبن حزم جميع اصحاب ابي حنيفة مجمعون علي ان ضعف الحديث اولي عنده من القياس والرأي ،


অর্থ: ইমাম ইবনু হাযম যাহেরী রহ. বলেন, আবূ হানীফাহ রহ. এর সকল আসহাব (ছাত্র) একমত যে য'ঈফ হাদীস তার নিকট ক্বিয়াস আর রায় অপেক্ষা উত্তম।


وكيع سمعت ابا حنيفة يقول البول في المسجد احسن من بعض القياس ،،


অর্থ: ইমাম ওয়াক্বী' ইবনুল জাররাহ রহ. বর্ণনা করেন, ইমাম আবূ হানীফাহ রহ. বলেন, মসজিদে পেশাব করা উত্তম কিছু ক্বিয়াস থেকে। [মানাকিবুল ইমাম আবী হানীফাহ: ২৩]



ইমাম নু'আঈম ইবনু হাম্মাদ রহ. বলেন-


حدثني ابي قال حدثني ابي قال حدثني محمد بن احمد بن حماد بنقال حدثني ابو بشر قال حدثني عثمان سعيد بن عثمان التنوخي قال سمعت نعيم بن حماد يقول سمعت ابا عصمة يقول سمعت ابا حنيفة يقول ما جاء عن رسول الله ﷺ فعلي الرأس والعين وما جاء عن اصحاب رسول الله ﷺ إخترنا وما كان غير ذالك هم رجال ونحن رجال ،


অর্থ: আবূ উসমাহ রহ. বলেন আমি আবূ হানীফাহকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, রাসুল সা. এর হাদীস আমরা চোখ ও মাথায় রাখি। আর সাহাবায়ে কেরাম থেকে যা এসেছে তা যাচাই-বাছাই করি। আর তারা ছাড়া বাকিদের ব্যাপারে মত হলো, তারাও মানুষ আমরাও মানুষ। [ফাযাইলু আবী হানিফাহ: ৯৭]


এ ব্যাপারে আবূ হানীফাহ রহ. এর বক্তব্য-


وَعَنْ نُعَيْمِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ سَمِعْت أَبَا حَنِيفَةَ - رَحِمَهُ اللَّهُ - يَقُولُ: عَجَبًا لِلنَّاسِ يَقُولُونَ إنِّي أَقُولُ بِالرَّأْيِ وَمَا أُفْتِي إلَّا بِالْأَثَرِ وَعَنْ النَّضْرِ بْنِ مُحَمَّدٍ قَالَ مَا رَأَيْت أَحَدًا أَكْثَرَ أَخْذًا لِلْآثَارِ أَلَا تَرَى أَنَّهُمْ جَوَّزُوا نَسْخُ الْكِتَابِ بِالسُّنَّةِ لِقُوَّةِ مَنْزِلَةِ السُّنَّةِ عِنْدَهُمْ وَعَمِلُوا بِالْمَرَاسِيلِ تَمَسُّكًا بِالسُّنَّةِ وَالْحَدِيثِ وَرَأَوْا الْعَمَلَ بِهِ مَعَ الْإِرْسَالِ أَوْلَى مِنْ الرَّأْيِ، وَمَنْ رَدَّ الْمَرَاسِيلَ فَقَدْ رَدَّ كَثِيرًا مِنْ السُّنَّةِ وَقَدَّمُوا رِوَايَةَ الْمَجْهُولِ عَلَى الْقِيَاسِ وَقَدَّمُوا قَوْلَ الصَّحَابِيِّ عَلَى الْقِيَاسِ وَقَالَ مُحَمَّدٌ - رَحِمَهُ اللَّهُ تَعَالَى - فِي كِتَابِ أَدَبِ الْقَاضِي: لَا يَسْتَقِيمُ الْحَدِيثُ إلَّا بِالرَّأْيِ

অর্থ: নূ'আইম ইবনু আমর রা. বলেন, আমি আবূ হানীফাহ রহ.-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আশ্চর্য লাগে মানুষের জন্য! তারা বলে আমি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে রায় দিয়ে থাকি। বস্তুত, আমি হাদীস ছাড়া কোনো ফাতাওয়া দিই না। নজর ইবনে মুহাম্মদ রহ. বলেন, আমি হানাফীদের থেকে কাউকে আছারের প্রতি বেশি অনুগামী দেখিনি। তুমি কী দেখ না, তারা কিতাবুল্লাহকে সুন্নাহ দ্বারা নসখ (রহিতকরণ) জায়েয বলেছে। কারণ সুন্নাহ’র স্তর তাদের নিকট বেশ শক্তিশালী। এবং সুন্নাহ এবং হাদীসকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরতে তারা মুরসাল হাদীসের উপর আমল করেছে। তাদের মতে মুরসাল হাদীস ব্যক্তিগত রায় থেকে উত্তম। যে লোক মুরসাল হাদীস প্রত্যাখ্যান করলো সে প্রচুর হাদীসকে ছেড়ে দিলো। ক্বিয়াসের উপর তারা মাজহূল বর্ণনাকে প্রাধান্য দেয়। এবং সাহাবীদের বক্তব্যকে ক্বিয়াসের উপর প্রধান্য দেয়। [কাশফুল আসরার: ১/১৭]


وَعَنْ أَحْمَدَ بْنِ يُونُسَ قَالَ سَمِعْت أَبِي يَقُولُ كَانَ أَبُو حَنِيفَةَ شَدِيدَ الِاتِّبَاعِ لِلْأَحَادِيثِ الصِّحَاحِ،


অর্থ: আহমদ ইবনে ইউনুস রহ. বলেন, আমি আমার পিতাকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আবূ হানীফাহ রহ. সহীহ হাদীসের কঠোর অনুসারী ছিলেন। [প্রাগুক্ত: ১/১৭]


وَعَنْ الْفُضَيْلِ بْنِ عِيَاضٍ قَالَ كَانَ أَبُو حَنِيفَةَ فَقِيهًا مَعْرُوفًا بِالْفِقْهِ مَشْهُورًا بِالْوَرَعِ وَاسِعَ الْمَالِ صَبُورًا عَلَى تَعْلِيمِ الْعِلْمِ بِاللَّيْلِ وَالنَّهَارِ كَثِيرَ الصَّمْتِ هَارِبًا مِنْ مَالِ السُّلْطَانِ، وَكَانَ إذَا وَرَدَتْ عَلَيْهِ مَسْأَلَةٌ فِيهَا حَدِيثٌ صَحِيحٌ اتَّبَعَهُ، وَإِنْ كَانَ فِيهَا قَوْلٌ عَنْ الصَّحَابَةِ وَالتَّابِعِينَ أَخَذَ بِهِ وَإِلَّا قَاسَ فَأَحْسَنَ الْقِيَاسَ،


অর্থ: ফুযায়ল ইবনু 'ইয়ায রহ. বলেন, আবূ হানীফাহ রহ. একজন এমন ফকীহ ছিলেন যিনি ফিকহে পরিচিত, পরহেযগারীতে প্রসিদ্ধ, সম্পদে প্রশস্ত এবং দিন-রাত ইলম শিক্ষাদানে ধৈর্যশীল। দীর্ঘ সময় চুপ থাকতেন। বাদশার সম্পদ থেকে বেঁচে চলতেন। যখন তার সামনে কোনো মাসআলাহ আসতো এবং এই ব্যাপারে কোনো সহীহ হাদীস পেতেন তিনি সহীহ হাদীসের অনুসরণ করতেন। আর যদি তাতে কোনো সাহাবী বা তাবে'ঈ এর বক্তব্য থাকতো তা গ্রহণ করতেন। সর্বশেষ তিনি ক্বিয়াস করতেন যা অতিউত্তম। [প্রাগুক্ত: ১/১৭]


وَقِيلَ لِعَبْدِ اللَّهِ بْنِ الْمُبَارَكِ الْمُرَادُ مِنْ الْحَدِيثِ الَّذِي جَاءَ (أَصْحَابُ الرَّأْيِ أَعْدَاءُ السُّنَّةِ) أَبُو حَنِيفَةَ وَأَمْثَالُهُ فَقَالَ سُبْحَانَ اللَّهِ أَبُو حَنِيفَةَ يُجْهِدُ جَهْدَهُ أَنْ يَكُونَ عَمَلُهُ عَلَى السُّنَّةِ فَلَا يُفَارِقُهَا فِي شَيْءٍ مِنْهُ فَكَيْفَ يَكُونُ مِنْ أَعَادِي السُّنَّةِ إنَّمَا هُمْ أَهْلُ الْأَهْوَاءِ وَالْخُصُومَاتِ الَّذِينَ يَتْرُكُونَ الْكِتَابَ وَالسُّنَّةَ وَيَتَّبِعُونَ أَهْوَاءَهُمْ.


অর্থ: আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহ.-কে বলা হলো, হাদীস থেকে কি তাই উদ্দেশ্য যা সুন্নাহের দুশমন আবূ হানীফাহ থেকে এসেছে? তিনি বলেন- সুবহানাল্লাহ! আবূ হানীফাহ রহ. সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন তার আমল যেনো সুন্নাহ-সম্মত হয়। এমনকি আবূ হানীফাহ থেকে সুন্নাহর কোনো জিনিস পৃথক হয়নি। কীভাবে তিনি সুন্নাহের দুশমন হোন? যারা সুন্নাহকে তরক করে মনমতো চলে, তারা হলো কুপ্রবৃত্তির অনুসারী। [প্রাগুক্ত: ১/১৭]


কুরআন-সুন্নাহ ও সাহাবীদের বক্তব্যই হানাফীদের সম্বল


إن الجصاص والسرخسي ينقلان عن طريق هشام بن عبيد الله الرازي (ت. 221) عن الشيباني قوله: "الفقه على أربعة أوجه، ما في القرآن وما أشبهه، وما جاءت به السنة وما أشبهها، وما أجمع عليه الصحابة وما اختلفوا فيه وما أشبهه


অর্থ: ইমাম জাসসাস ও সারাখসী রহ. হিশাম ইবনে ওবায়দুল্লাহ রহ. এর সনদে ইমাম শায়বানী রহ. থেকে বর্ণনা করেন যে, ফিকহ চার ধরনের। ১. যা কুরআনে রয়েছে এবং যা তার সাথে সামঞ্জস্য রাখে। ২. যা হাদীসে রয়েছে এবং যা তার সাথে সামঞ্জস্য রাখে। ৩. যার ব্যাপারে সাহাবীরা ঐক্যমত পোষণ করেছেন এবং মতানৈক্য করেছেন এবং যা এগুলোর মতে রয়েছে। ৪. যা মুসলমানরা উত্তম মনে করেন ও তার মতো যা রয়েছে। [কিতাবুল আসল: ১৮০]


ويقول الشافعي: "وأصل ما يذهب إليه محمد بن الحسن في الفقه أنه لا يجوز أن يقال بشيء من الفقه إلا بخبر لازم أو قياس" (2). وينقل الشافعي أيضاً عن الشيباني أن الحجة هي الكتاب والسنَّة والإجماع والقياس (3).
ويوجد تشابه بين كلام الإمام محمد عن مصادر التشريع وبين كلام أستاذه أبي حنيفة عن ذلك. فالروايات المختلفة عن أبي حنيفة تفيد بأن المصادر عنده هي القرآن والسنة، وإجماع الصحابة، والتخير بين أقوالهم دون إحداث قول جديد، والاجتهاد (4).


অর্থ: ইমাম শাফে'ঈ রহ. বলেন, ইমাম মুহাম্মদ রহ. এর মূলনীতি হলো, হাদীস অথবা ক্বিয়াস ব্যতিরেকে ফিকহী কোনো বিষয়ে কথা বলা জায়েয নয়। ইমাম শাফে'ঈ থেকে আরো বর্ণনা করা হয়, শরী'আতের দলীল চারটি: কুরআন, হাদীস, ইজমা', ক্বিয়াস। আর ইমাম মুহাম্মাদের বক্তব্য ও তার উস্তাদ আবূ হানীফাহ রহ. এর বক্তব্যের মাঝে শরীয়তের উৎস সম্পর্কে সামঞ্জস্য পাওয়া যায় । ইমাম আবূ হানীফাহ রহ. থেকে বিভিন্ন বক্তব্য রয়েছে যার থেকে প্রমাণিত হয় যে, আবূ হানীফাহ রহ. এর নিকট শরী'আতের উৎস হলো কুরআন, সুন্নাহ এবং ইজমায়ে সাহাবা এবং তাদের বক্তব্য যাচাই-বাছাই করে গ্রহণ করা (নতুন কিছু বের করা ব্যতীত) এবং ইজতেহাদ। [কিতাবুল আসল: ১৮০]


اُخْبُرْنَا أَبُو الْقَاسِم عبد الله بن مُحَمَّد الْبَزَّاز قَالَ ثَنَا مكرم قَالَ ثَنَا أَحْمد بن عَطِيَّة قَالَ ثَنَا ابْن سَمَّاعَة عَن أبي يُوسُف قَالَ سَمِعت أَبَا حنيفَة يَقُول إِذا جَاءَ الحَدِيث عَن النَّبِي صلى الله عَلَيْهِ وَسلم عَن الثِّقَات أَخذنَا بِهِ فَإِذا جَاءَ عَن أَصْحَابه لم نخرج عَن أقاويلهم


অর্থ: ইমাম আবূ ইউসুফ রহ. বলেন, আমি আবূ হানীফাহ রহ.-কে বলতে শুনেছি, যখন নবী সা. থেকে গ্রহনযোগ্য রাবীর মাধ্যমে কোনো হাদীস আসে আমরা তা গ্রহণ করি। যখন তার সাহাবীদের থেকে আসে আমরা তাদের বক্তব্য থেকেও বাহির হইনা! [আখবারু আবী হানীফাহ: ২৪]


অতএব, হানাফী মাযহাবে মু'তাযিলী উসূল অনুপ্রবেশ করেছে- এটি একটি ভুয়া অভিযোগ।

মাসিক আল-আহনাফ / 11

ইমাম আবূ হানীফাহ রহ. এর সাথে তাঁর ছাত্রদের এক-তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রে বিরোধিতা:
সংক্ষিপ্ত জবাব



লুবাব হাসান সাফওয়ান



বিদ্বেষীরা প্রায় বলে থাকে, ইমাম আবূ হানীফার ছাত্ররা এক-তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রে তাঁর বিরোধিতা করেছে।



এই আপত্তির জবাবে অনেক কথাই বলা যায়, যেমন বিরোধিতা কাকে বলে আর ইখতিলাফ কাকে বলে? এবং আদাবে ইখতিলাফ কী?



যাইহোক, সেসব আলোচনায় না গিয়ে কেবল একটা কথাই এখানে বলছি। তা হলো, এই ব্যাপারটা কেবল ইমাম আবূ হানীফা'র বেলাতে নয় বরং প্রায় প্রত্যেক ইমামের বেলাতেই ঘটেছে। ইমাম মালেকের ছাত্ররা তো কেবল তাঁর বিরোধিতাই করেননি বরং তাঁর বিরুদ্ধে গিয়ে সরাসরি আলাদা একটা মাযহাবই তৈরি করে ফেলেছে। আর তা হলো শাফে'ঈ মাযহাব। ইমাম শাফে'ঈ হচ্ছেন ইমাম মালেকের ছাত্র। বলা হয়, তিনি ইমাম মালিকের ছাত্র থাকাকালে ওস্তাদের পক্ষ নিয়ে হানাফীদের সাথে নাকি বিতর্কও করেছিলেন। কিন্তু যখন পরিণত হলেন, তখন শিক্ষকের বিরুদ্ধে গিয়ে নিজেই আলাদা একটা মাযহাব তৈরি করে ফেললেন। ফিকহের সবাই জানে, ছাত্র শাফে'ঈর অধিকাংশ মাসআলা শিক্ষক ইমাম মালেকের বিপরীতে। চার মাযহাবের ভিতরে এই দুই মাযহাবেই সবচেয়ে বেশি বিপরীতধর্মী কথা পাওয়া যায়; যেন উত্তর মেরু আর দক্ষিণ মেরু।



আলাদা মাযহাব তৈরি হওয়া থেকে বোঝা যায়, বিরোধিতার পরিমাণ অল্প ছিল না বরং অর্ধেকেরও বেশি বা দুই-তৃতীয়াংশ। কারণ, অল্প মতবিরোধ থাকলে তো আর আলাদা মাযহাব তৈরিই হতো না।



এদিকে ইমাম শাফে'ঈর ছাত্ররাও কেবল তাঁর বিরোধিতা করাকেই যথেষ্ট মনে করেনি, বরং তারাও শিক্ষকের বিরুদ্ধে গিয়ে আলাদা মাযহাব তৈরি করেছে। যেমন আহমদ বিন হাম্বল ইমাম শাফে'ঈর ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও কেবল শিক্ষকের বিরোধিতা করেই ক্ষান্ত হননি বরং শিক্ষকের বিরুদ্ধে গিয়ে তিনিও আলাদা মাযহাব তৈরি করে ফেলেছেন।



এখানেও একই কথা, অল্প মতবিরোধ থাকলে তো আর আলাদা মাযহাব তৈরি হতো না। তার মানে তিনিও তাঁর শিক্ষক শাফে'ঈর সাথে দুই-তৃতীয়াংশ মাসআলায় বিরোধিতা করেছেন।



এদিকে ইমাম আবূ হানীফাহ রহ. এর কোনো ছাত্র তো শিক্ষকের বিরুদ্ধে গিয়ে আলাদা মাযহাব তৈরি করেননি। হাঁ, কিছু কিছু মাসআলার ক্ষেত্রে আদব বজায় রেখে ইখতিলাফ করলেও তাঁর মাযহাবের ভিতরেই ছিলেন, মরণ পর্যন্ত তাঁর মাযহাবেরই প্রচার-প্রসার করে গেছেন।
অতএব, ইমাম আবূ হানীফা'র ছাত্ররা যদি তাঁর সাথে এক-তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রে বিরোধিতা করেও থাকেন, তবে ইমাম মালেক ও ইমাম শাফে'ঈর ছাত্ররা তো দুই-তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রে তাঁদের বিরোধিতা করেছেন। তাহলে এক ইমামের কথা বলা হয় বাকি দুই ইমামের কথা বলা হয় না কেন?

মাসিক আল-আহনাফ / 12