যারা তাক্বলীদ করে তারা কি ইহুদীদের সাদৃশ্য অবলম্বন করে?
মুহাম্মাদ হাফিজুর রহমান
“যারা তাক্বলীদ করে তারা ইহুদীদের সাদৃশ্য অবলম্বন করে” শাওকানী রহ. এর এ কথাটি কি সঠিক? কয়েকদিন আগে ‘যারা তাক্বলীদ করে তারা ইহুদীদের সাদৃশ্য অবলম্বন করলো’ শিরোনামে একটা লেখা চোখে পড়লো। এ দাবির স্বপক্ষে ইমাম শাওকানী রহ. এর উক্ত বক্তব্যও উল্লেখ করা হয়েছে।
মূলত ইমাম শাওকানী রহ. সূরাহ তাওবার ৩১ নং আয়াত (اتخذوا احبارهم ورهبانهم اربابا من دون الله) -এর তাফসীরে লিখেছেন- “এ আয়াতে বিবেকবান লোকদের আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে তাক্বলীদ এবং কুরআন-সুন্নাহর উপর পূর্ববর্তীদের কথাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ব্যাপারে কঠোরভাবে ধমকানো হয়েছে। কেনোনা, ‘নস’ তথা কুরআন-সুন্নাহয় যা এসেছে এবং আল্লাহ প্রদত্ত দলীল-প্রমাণাদির দ্বারা যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তার বিপরীতে মাযহাবের কারো কথা বা এ উম্মতের কোনো আলিমের তরীকা অনুসরণ করা ইহুদী-নাসারাদের আল্লাহকে বাদ দিয়ে পণ্ডিত পুরোহিতদের রব হিসেবে গ্রহণ করার শামিল। কারণ, এটা প্রমাণিত যে, ইহুদী-নাসারারা তাদের পণ্ডিত পুরোহিতদের ইবাদত করতো না বরং তাদের আনুগত্য করতো এবং তাদের হালাল করা বস্তুকে হালাল ও হারাম করা বস্তুকে হারাম হিসেবে গ্রহণ করতো। আর এ উম্মতের মুকাল্লিদরাও এ কাজই করে থাকে। এ কাজ মূলত ইহুদী-নাসারাদের কাজের পরিপূর্ণ সাদৃশ্যের নামান্তর”।
পর্যালোচনা:
শাওকানী রহ. এখানে ইহুদী-নাসারা কর্তৃক তাদের পণ্ডিতদের অনুসরণ এবং সাধারণ মুসলমান কর্তৃক মুজতাহিদ বা ফকীহ ইমামগণের তাক্বলীদ করাকে একীভ‚ত করে ফেলেছেন। তিনি এখানে ইহুদী-নাসারা কর্তৃক তাদের পÐিতদেরকে ‘রব’ হিসেবে গ্রহণের যে অর্থ উল্লেখ করেছেন, তাতে আমরা ৩টি অর্থ পাই। যথা- ১. তারা তাদের পÐিতদের আনুগত্য করতো।
২. তাদের হালাল করা বস্তুকে হালাল মনে করতো।
৩. তাদের হারাম করা বস্তুকে হারাম মনে করতো।
শাওকানী রহ. এর যুক্তি হলো, এই কাজগুলো মুকাল্লিদরাও করে থাকে। তাই মুকাল্লিদদের এ কাজ মূলত ইহুদী-নাসারাদের কাজের সাথে পরিপূর্ণ সাদৃশ্যপূর্ণ! কিন্তু বাস্তবতার আলোকে এটা ভুল কথা; কারণ, এ উম্মতের মুকাল্লিদরা ইহুদী-নাসারাদের মতো তাদের মুজতাহিদ ইমামদের অনুসরণ করে না। কেননা, এ উম্মতের মুজতাহিদ ইমামগণ ইহুদী-নাসারাদের পুরোহিতদের মতো নিজেরা হালালকে হারামও বানায়নি যে, মুকাল্লিদ কর্তৃক সেগুলোর অনুসরণকে ইহুদী-নাসারাদের অনুসরণের মতো বলা হবে। আমাদের মুজতাহিদ ইমামগণ মূলত আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসুলের বাণী (কুরআন-সুন্নাহকে) সামনে রেখে হালাল-হারামের হুকুম নিরূপণ ও ব্যাখ্যা করেছেন।
পক্ষান্তরে ইহুদী-নাসারাদের পণ্ডিতেরা আল্লাহর হুকুমের তোয়াক্কা না করেই আল্লাহর বিধানের বাইরে গিয়ে নিজেদের স্বার্থের অনূক‚লে হালালকে হারাম নির্ধারণ করতো আর হারামকে হালাল নির্ধারণ করতো। তাদের হালাল-হারাম করার ধরণ দেখুন- উপরিউক্ত সূরা তাওবার ৩১ নম্বর আয়াতের তাফসীরে ইবনে কাসীর রহ. একটি হাদীস উল্লেখ করেছেন। যেখানে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন-
فقال : بلى ، إنهم حرموا عليهم الحلال ، وأحلوا لهم الحرام ، فاتبعوهم ، فذلك عبادتهم إياهم
অর্থ: তারা (ইহুদী পণ্ডিতেরা) হালালকে হারাম বানিয়ে ফেলতো এবং হারামকে হালাল বানিয়ে ফেলতো। আর সাধারণ ইহুদী-নাসারারা তাদেরকে এক্ষেত্রে অনুসরণ করতো। এটাই মূলত ইহুদী-নাসারা কর্তৃক তাদের পণ্ডিতদের ইবাদত। [তাফসীরে ইবনে কাসীর, সূরা তাওবাহ, আয়াত নাম্বার ৩১]
এখন দেখার বিষয় হলো, মুসলিম মুজতাহিদ ইমামগণ কি এভাবে নিজেদের খেয়ালখুশি মতো হালাল-হারাম নির্ধারণ করেছেন? তাঁরা কি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিধান পরিবর্তন করে নিজেদের তরফ থেকে নতুন বিধান নিয়ে এসেছেন? না, তাঁরা এমনটা করেননি। বরং তাঁদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ সাধ্যানুযায়ী কুরআন-সুন্নাহের উপর সর্বোচ্চ গবেষণা করে কুরআন-সুন্নাহের হুকুমগুলো মানুষের কাছে সহজবোধ্য পাঠে উপস্থাপন করেছেন।
তাঁদের গবেষণালব্ধ ফতোয়া এবং ইহুদী- মনগড়া পণ্ডিতদের বক্তব্য কস্মিনকালেও এক নয়। অতএব, মুজতাহিদ ইমামগণের কুরআন সুন্নাহ থেকে গবেষণালব্ধ ফতোয়ার অনুসরণ এবং ইহুদী-নাসারা কর্তৃক তাদের পণ্ডিতদের অনুসরণ এক নয়। উভয় অনুসরণের মাঝে লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এবং ধরনগত বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। যদি এই পার্থক্য ধর্তব্য না হয়, তাহলে বলতে হবে, শাওকানী রহ. সর্বজন স্বীকৃত মান্যবর ইমামগণকে ইহুদী-পণ্ডিতদের সাথে তুলনা করেছেন! হালাল-হারামের হুকুম সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে তিনি ইহুদী পণ্ডিত এবং মুসলিম মুজতাহিদ ইমামগণকে এক কাতারে এনে দাঁড় করিয়েছেন! আল ইয়াযু বিল্লাহ।
কাজেই এটা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, ইহুদী পণ্ডিতদের হালাল-হারাম সাব্যস্তকরণ এবং মুসলিম মুজতাহিদ ইমামগণের হালাল হারামের বিধান নিরূপণের মাঝে বিস্তার পার্থক্য রয়েছে।
একইভাবে পার্থক্য রয়েছে ইহুদি পণ্ডিতদের অনুসারীদের অনুসরণ এবং মুজতাহিদ ইমামগণের অনুসারীদের অনুসরণের মাঝে। এজন্যই আমরা দেখি, মুজতাহিদ ইমামগণের কোনো বক্তব্য সুস্পষ্টভাবে ভুল প্রমাণিত হলে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়। ঠিক এ কারণেই প্রত্যেক মাযহাবের ফতোয়া সামগ্রীর মাঝেই মুফতাবিহী এবং গাইরে মুফতাবিহী, মা'মুল বিহী এবং গাইরে মা'মুল বিহী, রাজেহ এবং মারজূহ ফতোয়া নির্ধারণ করা হয়েছে। এই বিভাজন অনুসরণ করেই শুধুমাত্র মা'মুলবিহী বা মুফতাবিহী মতের উপর ফতোয়া দেয়া হয়ে থাকে। যাতে করে মানুষ অন্ধের মতো মুজতাহিদ ইমামগণের ভুল-শুদ্ধ সব বক্তব্যই গ্রহণ করতে না পারে। বরং কুরআন সুন্নাহের আলোকে সঠিকটাই যেনো গ্রহণ করে। মজার ব্যাপার হলো- একে তো শাওকানী রহ. এর এই বক্তব্যটি ভুল, তার ওপর আবার পক্ষপাতিত্বকারী ভাই এদলিল বিহীন কথাটা অন্ধের মতো গ্রহণ করে শাওকানী রহ. এর তাক্বলীদে লিপ্ত হয়ে নিজেকে ইহুদী নাসারার কাতারে নিয়ে ছাড়লো!
ইমামগণের ইখতিলাফ ও ভারসাম্য
মূল: আখতার ইমাম আদিল আল-কাসেমী
ভাষান্তর: লুবাব হাসান সাফওয়ান
যখন পানি দুই ‘কুল্লা’ পরিমাণ হয় তখন তা নাপাক হয় না।
اذا كان الماء قلتين لم يحمل الخبث
এই হাদীস অনুযায়ী ইমাম শাফে'ঈর মত হলো দুই ‘কুল্লা’ পানি ‘বেশি পানি’। কিন্তু হানাফীগণ দুই কুল্লা পানিকে ‘বেশি পানি’ গণ্য করে না। কিছু লোকের এ ধারণা যে, ইমাম আবূ হানীফাহ’র নিকট সম্ভবত দুই ‘কুল্লা’ পানির হাদীস পৌঁছেনি। এই কারণেই তিনি নিজের ইজতিহাদের মাধ্যমে দুই কুল্লা পানিকে ‘বেশি পানি’ মানতে অস্বীকার করেছেন। কিন্তু এমন ধারণা সঠিক নয়, বরং ইমাম আবূ হানীফাহ’র সামনেও এই বর্ণনাটি ছিল, কিন্তু এই বর্ণনাটির শব্দ ও অর্থগত ইযতিরাবের কারণে তিনি এই বর্ণনাকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করেননি। এবং তাঁর নিকটে বর্ণনাটির ব্যাখ্যা তা নয়, যা ইমাম শাফে'ঈ করেছেন। বরং তাঁর ব্যাখ্যা এটা ছিল (যা খোদ শব্দের দিকে তাকালেই বোঝা যায়) যে, উক্ত হাদীসে উল্লেখিত পানি দ্বারা উদ্দেশ্য ‘হেজাজ ভ‚মির বিশেষ পানি’Ñ যা মদীনার রাস্তার আশেপাশে বিপুল পরিমাণে পাওয়া যেতো। তা মূলত পাহাড়ী ঝর্ণার পানি ছিলোÑ যা বিভিন্ন নালার মধ্য দিয়ে ছোট ছোট গর্তে (ক্ষুদ্র জলাশয়) জমা হতো, যার পরিমাণ সাধারণত দুই ‘কুল্লা’র বেশি ছিলো না। কিন্তু এই পানি প্রবহমান ছিলো। এই জন্য হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তা নাপাক হবে না। এ কথার সাক্ষ্য রেওয়ায়াত এর প্রথম শব্দগুচ্ছ। তাছাড়া প্রশ্নের ধরন থেকেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। যেমন,
يسأل عن الماء يكون في الفلاة من الارض وما ينوبه من السباع والدواب
এর থেকে সুস্পষ্টভাবে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়, এখানে বদ্ধ জলাশয়ের পানি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়নি; বরং ময়দানের প্রবহমান পানি সম্পর্কেই প্রশ্ন করা হয়েছিলো। তাছাড়া দুই কুল্লা দ্বারা পরিমাণ নির্দিষ্ট করা উদ্দেশ্য নয়, বরং এটা ঘটনা বর্ণনার জন্য (অনুমানভিত্তিক) বলা হয়েছে। আর (উপরিউক্ত) ব্যাখ্যাটা স্বয়ং ইমাম আবূ হানীফাহ রহ. তাঁর ছাত্র আবূ ইউসূফ রহ. এর কাছে করেছেন। তিনি বলেন -
اذا كن الماء قلتين لم يحمل الخبث اذا كان جاريا
অর্থাৎ, পানি যখন দুই কুল্লা হবে, তখন তা নাপাক হবে না, যদি তা প্রবহমান হয়। [মা'রিফাতুস সুনান ওয়াল আসার: ২/১০০]
উল্লেখ্য: ‘কুল্লা’ হলো প্রাচীন আরবের বিশেষ পরিমাপ।
ইমামুল আ'যম আবূ হানীফাহ রহ. কি আদৌ কুরআনকে মাখলূক বলেছিলেন?
ইয়াসিন হোসেন শিশির
[শিয়া সালাফী সমাজে একটি কথা প্রচলিত আছে যে, ইমাম আ'যম আবূ হানীফাহ রাহিমাহুল্লাহ নাকি কুরআনকে মাখলূক বলতেন। এ সম্পর্কিত কয়েকটি বর্ণনার তাহকীক নিচে উদ্ধৃত করা হলো। -সম্পাদক]
রেওয়ায়াত নং ১:
سئل عنه أبو حنيفة فقال: انه مخلوق
অর্থ: ইমামুল আ'যম আবূ হানীফাহ রহ.-কে কুরআন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে, তিনি বলেন, “এটি মাখলূক।” [কিতাবুল-আওয়ায়েল লিল আসকারী: ৩৬৯]
জবাব: রেওয়ায়াতটি সনদবিহীন বিধায় বাতিল।
রেওয়ায়াত নং ২:
حَدَّثَنِي أَحْمَدُ بْنُ عَلِيٍّ، نا عَبْدُ الْأَعْلَى بْنُ وَاصِلٍ، نا أَبُو نُعَيْمٍ ضِرَارٌ قَالَ: سَمِعْتُ سُلَيْمَ بْنَ عِيسَى يَقُولُ: سَمِعْتُ سُفْيَانَ الثَّوْرِيَّ يَقُولُ: سَمِعْتُ حَمَّادَ بْنَ أَبِي سُلَيْمَانَ يَقُولُ: ্রأَبْلِغُوا عَنِّي أَبَا حَنِيفَةَ الْمُشْرِكَ أَنِّي مِنْهُ بَرِيءٌ، إِلَّا أَنْ يَتُوبَগ্ধ قَالَ: قَالَ سُلَيْمٌ: كَانَ - يَعْنِي أَبَا حَنِيفَةَ - يَزْعُمُ أَنَّ الْقُرْآنَ مَخْلُوقٌ
অর্থ: হাম্মাদ ইবনে আবী সুলায়মান রহ. বলেন, “মুশরিক আবূ হানীফাহকে আমার পক্ষ থেকে জানাও যে, তার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই যদি না তিনি তাওবা করেন।” এবং সুলায়ম ইবনে ঈসা বলেন, তিনি কুরআনকে মাখলূক বলে দাবি করতেন। [মুসনাদু ইবনিল জা'দ: ৬৬]
জবাব: বর্ণনাটি বাতিল। সনদের রাবী আবু নু'আয়ম দ্বিরার হচ্ছেন মাতরূক (পরিত্যক্ত)।
রেওয়ায়াত নং ৩:
حَدَّثَنِي عَبْدُ اللَّهِ بْنُ أَحْمَدَ، حَدَّثَنِي عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عَوْنٍ الْخَرَّازُ، وَأَظُنُّ أَنِّي قَدْ سَمِعْتُهُ أَنَا مِنِ ابْنِ عَوْنٍ قَالَ: نا شَيْخٌ، مِنْ أَهْلِ الْكُوفَةِ قَالَ أَبُو عَبْدِ الرَّحْمَنِ: قِيلَ لِابْنِ عَوْنٍ: هُوَ أَبُو الْجَهْمِ عَبْدُ الْقُدُّوسِ بْنُ بَكْرٍ، فَكَأَنَّهُ أَقَرَّ بِهِ قَالَ: سَمِعْتُ سُفْيَانَ الثَّوْرِيَّ يَقُولُ: قَالَ لِي حَمَّادُ بْنُ أَبِي سُلَيْمَانَ: اذْهَبْ إِلَى هَذَا الْكَافِرِ يَعْنِي أَبَا حَنِيفَةَ فَقُلْ لَهُ: إِنْ كُنْتَ تَقُولُ الْقُرْآنُ مَخْلُوقٌ؛ فَلَا تَقْرَبْنَا
অর্থ: হাম্মাদ ইবনে আবী সুলায়মান সুফয়ান ছাওরী-কে বললেন, “আবূ হানীফাহ নামক ঐ কাফিরের কাছে যাও এবং তাকে বলো, আপনি যদি কুরআনকে মাখলূক বলে থাকেন, তাহলে আমাদের কাছে আসবেন না।” [প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৬৬-৬৭]
জবাব: সনদের রাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আওন শতভাগ নিশ্চিত নন যে, তিনি আব্দুল কুদ্দুস ইবনে বকর থেকেই এই বর্ণনা শুনেছেন। কাজেই এ বর্ণনাটিও বাতিল।
রেওয়ায়াত নং ৪:
حَدَّثَنِي إِسْحَاقُ بْنُ أَبِي يَعْقُوبَ الطُّوسِيُّ، حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ ⦗١٨٥⦘ يُونُسَ، عَنْ سُلَيْمٍ الْمُقْرِئِ، عَنْ سُفْيَانَ الثَّوْرِيِّ، قَالَ: سَمِعْتُ حَمَّادًا، يَقُولُ: " أَلَا تَعْجَبُ مِنْ أَبِي حَنِيفَةَ يَقُولُ: لْقُرْآنُ مَخْلُوقٌ، قُلْ لَهُ يَا كَافِرُ يَا زِنْدِيقُ "
অর্থ: হাম্মাদ ইবনে আবী সুলায়মান সুফয়ান ছাওরীকে বললেন, “আবূ হানীফাহ কুরআনকে মাখলূক বলায় তুমি কি অবাক হও না? তাকে বলো, হে কাফির, হে যিনদীক!” [কিতাবুস সুন্নাহ, ১/১৮৪]
জবাব: “কিতাবুস সুন্নাহ” এর একটি নুসখায় সম্ভবত রেওয়ায়াতটি জাল করা হয়েছে। কারণ, বাকি পাঁচটি নুসখায় এই রেওয়ায়েত বিদ্যমান নেই।
রেওয়ায়াত নং ৫:
"لَا رَحِمَ اللَّهُ أَبَا حَنِيفَةَ، فَإِنَّهُ أَوَّلُ مَنْ زعم أن القرآن مخلوق "
অর্থ: সালামা ইবনে আমর বলেন, “আল্লাহ তা'আলা ইমাম আবূ হানীফাহর উপর রহম না করুন। কেনোনা, তিনিই সর্বপ্রথম কুরআনকে মাখলূক বলে দাবী করেছিলেন।” [তারীখে আবু যুর'আহ: ১/৫০৬]
জবাব: রেওয়ায়াতটি বাতিল। সালামা ইবনে আমর হচ্ছেন মাজহূল।
রেওয়ায়েত নং ৬:
أَخْبَرَنَا أَبُو سعد عَبْد الرحمن بْن مُحَمَّد الحارثي قال: حَدَّثَنِي مُحَمَّد بْن عِمْرَان بْن مُحَمَّد بْن عَبْد الرحمن بْن أبي ليلى قَالَ: حَدَّثَنِي #أبي قَالَ: لما قدم أَبُوْحَنِيْفَةَ شهد عليه جماعة فأقر أن القرآن مخلوق.
অর্থ: ইমরান ইবনে মুহাম্মাদ বলেন, “আবূ হানীফাহ একটি জামা'আতের সামনে কুরআনকে মাখলূক বলে সাক্ষ্য দিয়েছেন।” [আখবারুল কুযা: ৩/১৪১]
জবাব: রেওয়ায়াতটি বাতিল। ইমরান ইবনে মুহাম্মাদ মাজহূল।
রেওয়ায়াত নং ৭:
أَخْبَرَنَا الْحُسَيْنُ بْنُ إِدْرِيسَ الأَنْصَارِيُّ قَالَ حَدَّثَنَا سُفْيَانُ بْنُ وَكِيعٍ قَالَ حَدَّثَنَا عُمَرُ بْنُ حَمَّادِ بْنِ أبِي حَنِيفَةَ قَالَ سَمِعْتُ أَبِي يَقُولُ سَمِعْتُ أَبَا حَنِيفَةَ يَقُولُ الْقُرْآنُ مَخْلُوقٌ قَالَ فَكَتَبَ إِلَيْهِ بن أَبِي لَيْلَى إِمَّا أَنْ تَرْجِعَ وَإِلَّا لأَفْعَلَنَّ بِكَ فَقَالَ قَدْ رَجَعْتُ فَلَمَّا رَجَعَ إِلَى بَيْتِهِ قُلْتُ يَا أَبِي أَلَيْسَ هَذَا رَأْيُكَ قَالَ نَعَمْ يَا بُنَيَّ وَهُوَ الْيَوْمَ أَيْضًا رَأْيِي وَلَكِنْ أَعْيَتْهُمُ التَّقِيَّةُ
অর্থ: হাম্মাদ ইবনে আবী হানীফাহ রহ. বলেন, আমি আমার পিতাকে বলতে শুনেছি, “কুরআন মাখলূক।” অতঃপর ইমাম ইবনে আবী লায়লা তার কাছে লিখে পাঠালেন, হয়তো আপনি এর থেকে ফিরে আসবেন, নতুবা আপনার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবো। তখন আমার পিতা বললেন, “আমি এর থেকে ফিরে আসলাম।” বাড়ি ফিরে এসে, আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে পিতা! এটি কি আপনার রায় নয়? তিনি বললেন, “হ্যাঁ, হে ছেলে! এটি আজও আমার রায়। তবে আমি তাদের ভয়ে সত্য গোপন করেছি / কৌশল অবলম্বন করেছি।” [আল-মাজরূহীন: ৩/৬৫]
জবাব: রেওয়ায়াতটি বাতিল। সনদের রাবী উমর ইবনে হাম্মাদ মাজহূল।
রেওয়ায়াত নং ৮:
أَخْبَرَنَا أَبُو بَكْر مُحَمَّد بن عُمَر بن بُكَيْر المُقْرِئ، قَالَ: أَخْبَرَنَا عُثْمَان بن أَحْمَد بن سمعان الرَّزَّاز، قَالَ: حَدَّثَنَا هيثم بن خلف الدُّورِيّ، قَالَ: حَدَّثَنَا محمود بن غيلان، قَالَ: حَدَّثَنَا مُحَمَّد بن سَعِيد، عن أَبِيهِ، قَالَ: كُنْت مَعَ أمير المؤمنين موسى بجرجان ومعنا أَبُو يُوسُف، فسألته عن أَبِي حنيفة، فَقَالَ: وما تصنع بِهِ وقد مات جهميا
অর্থ: সা'ঈদ বাহিলী ইমাম আবূ ইউসুফের কাছে ইমামুল আ'যম আবূ হানীফাহ রহ. সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, “ঐ ব্যক্তিকে দিয়ে তুমি কী করবে, যে জাহমিয়া হয়ে মারা গেছেন।” [তারীখে বাগদাদ: ১৫/৫১৩]
জবাব: রেওয়ায়াতটি বাতিল। সনদের রাবী মুহাম্মাদ ইবনে সা'ঈদ মাজহূল।
রেওয়ায়াত নং ৯:
أَخْبَرَنَا أَحْمَدُ بْنُ يَحْيَى بْنِ زُهَيْرٍ بِتُسْتَرَ قَالَ حَدَّثَنَا إِسْحَاقُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ الْبَغَوِيّ قَالَ حَدَّثَنَا الْحَسَنُ بْنُ أَبِي مَالِكٍ عَنْ أَبِي يُوسُفَ قَالَ أَوَّلُ مَنْ قَالَ الْقُرْآنُ مَخْلُوقٌ أَبُو حَنِيفَةَ يُرِيدُ بِالْكُوفَةِ
অর্থ: আবূ ইউসুফ বলেন, “সর্বপ্রথম যিনি কুরআনকে মাখলূক বলেছেন, তিনি হচ্ছেন ক‚ফাবাসী আবূ হানীফাহ।” [আল-মাজরূহীন: ৩/৬৪-৬৫]
জবাব: রেওয়ায়াতটি বাতিল। সনদের উহ্য রাবী ইসহাক ইবনে আব্দুর রহমান মাজহূল।
নোট: আল-মাজরূহীন গ্রন্থে সনদের রাবী ইসহাক ইবনে আব্দুর রহমান ভুলক্রমে বাদ পড়ে গেছেন। কেনোনা, তারীখে বাগদাদে এই একই রেওয়ায়েত অনুরূপ সনদে বিদ্যমান। আর সেখানে إِسْحَاقُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ الْبَغَوِيّ এবং الْحَسَنُ بْنُ أَبِي مَالِكٍ এর মাঝে ইসহাক ইবনে আব্দুর রহমানের মধ্যস্থতা রয়েছে। [৯ নং বর্ণনা দ্রষ্টব্য]
রেওয়ায়াত নং ১০:
أَخْبَرَنَا الْبَرْقَانِيّ، قَالَ: حَدَّثَنِي مُحَمَّد بن العباس الخزاز، قَالَ: حَدَّثَنَا جعفر بن مُحَمَّد الصندلي، قَالَ: حَدَّثَنَا إسحاق بن إبراهيم ابن عم ابن منيع، قَالَ: حَدَّثَنَا إسحاقথبنথعَبْدথالرَّحْمَن، قَالَ: حَدَّثَنَا حسن بن أبي مالك، عن أبي يوسف، قال: أول من قال: القرآن مخلوق: أَبُو حنيفة.
অর্থ: ইমাম আবূ ইউসুফ রহ. বলেন, “সর্বপ্রথম যিনি কুরআনকে মাখলূক বলেছেন, তিনি হচ্ছেন, আবূ হানীফাহ।” [প্রাগুক্ত: ১৫/৫১৮]
জবাব: রেওয়ায়াতটি বাতিল। সনদের রাবী ইসহাক ইবনে আব্দুর রহমান মাজহূল।
ইমাম বদরুদ্দীন আল-'আয়নী আল-হানাফী রহ. এর জীবনী
আয়াতুল্লাহ আহনাফ
বর্বরতার অন্ধকারে যখন সমগ্র বিশ্ব থমকে যায়। কুসংস্কার আর বদ-দ্বীনি কর্মকাণ্ড যখন মানুষের পেশা হয়ে দাঁড়ায়। ভুলে যায় ঈমান কী আর ইসলাম কী? সেই কঠিন মুহুর্তে ইনসানের সংশোধনের জন্য আল্লাহ তা'আলা যুগে যুগে হাজার হাজার নবী-রাসুল প্রেরণ করেছেন। তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর মেহনতের বদৌলতে মানুষ জেনেছে আসলে তাদের পরিচয় কী, বুঝেছে তাদের কাজই বা কী? কেনোইবা তাদের পৃথিবীতে আসা! এভাবে একের পর এক নবী-রাসূলগণ মানুষকে দ্বীন শিক্ষা দিয়ে তাঁদের ওপর অর্পিত মহা দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে পাড়ি জমান পরপারে। অতঃপর আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে চিরতরে বন্ধ হলো নবুওয়াতের এই ধারা। কিন্তু থেমে থাকেনি তাঁদের বাতলানো সেই সুদৃঢ় পথ।
মহান আল্লাহ তা'আলা নবী-রাসূলগণের পর ইসলাহ (আত্মিক সংশোধন) এর এই মহান কাজ আঞ্জাম দেওয়ার দায়িত্ব অর্পণ করেন নবীদের ইলমের ওয়ারিস কুরআন সুন্নাহ’র ধারক-বাহক আলেম-উলামাগণের ওপর। তারই ধারাবাহিকতাই এসেছেন যুগে যুগে শত শত ইমাম। ইমাম আলকামা, ইমাম আ'যম আবূ হানীফাহ, মালিক বিন আনাস, আবূ ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মদ, শাফে'ঈ, আহমদ বিন হাম্বল রাহিমাহুমুল্লাহ। তাদের এই সাজানো বাগানের মালি হয়ে এসেছেন অসংখ্য মনীষীগণ। ইমাম ত্বাহাবী, সুয়ূতী, ইবনে কাছীর, যাহাবী, ইবনে হাজার। সেই মহান মনীষীগণের তালিকায় আরো নাম লেখালেন ইতিহাসবিখ্যাত মুসলিম মনীষী, যুগশ্রেষ্ঠ হাদীস বিশারদ, ফকীহ, মুফাসসির, আলিমুল-লুগাহ ইমাম বদরুদ্দীন আবূ মুহাম্মদ মাহমুদ ইবনে আহমদ ইবনে মুসা আল-হালাবী আল-'আয়নী আল-হানাফী রহ.। বদরুদ্দীন তার উপাধি এবং এ নামেই তিনি প্রসিদ্ধি লাভ করেন।
তাঁকে 'আয়নী বলা হয় তার জন্মস্থান ইয়ান্তাবের দিকে নিসবত করে। উল্লেখ্য: 'আয়নী শব্দটি ইয়ান্তাবের সংক্ষিপ্ত রূপ।
জম্ম: এই মহা মনীষী পৃথিবীতে আগমন করেন ৭৬২ হিজরির ১৭ই রামাদ্বানে।
তাঁর পিতা কাজী শিহাবুদ্দীন রহ. হালবের অধিবাসী ছিলেন এবং সেখানেই ৭২৫ হিজরিতে জন্মগ্রহণ করেন। অতঃপর হালব থেকে এয়ান্তাবে চলে আসেন। এয়ান্তাবে তাকে কাজীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। আর এখানেই ইমাম বদরুদ্দীন 'আয়নী রহ. জন্মগ্রহণ করেন।
তার জন্ম তারিখ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। ইবনে হাজার আসকালানী ও ইমাম সাখাবী রহ. বলেন ১৭ই রমাদ্বান। আর ইমাম আবুল মাহাসেন রহ. বলেন ২৬শে রমাদ্বান। হাদায়িকুল হানাফিয়্যাহতে তার জন্ম তারিখ লেখা হয়েছে মধ্য রমাদ্বান তথা ১৫ই রমাদ্বান। আযযাউল লামেয়ার লিখক বলেন, 'আয়নী রহ. ১৭ই রামাযানে জন্মগ্রহণ করেন। এই তারিখ আমি তার স্বহস্তে লিখিত ইবারত থেকে পড়েছি। এর থেকে অনুমিত হয়- সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মত হলো ১৭ই রমাদ্বান।
الله اعلم
বেড়ে ওঠা ও প্রাথমিক শিক্ষা
ইমাম 'আয়নী রহ. নিজ জন্মস্থান হালবেই বেড়ে উঠেন। এখান থেকেই প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন ও বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করেন। এবং বিচারকার্যেও অসামান্য মেধার স্বাক্ষর রাখেন।। অতঃপর উচ্চতর জ্ঞান অর্জনের জন্য তাঁর পিতার জীবদ্দশাতেই তৎকালীন ইলমের শহরগুলোতে ভ্রমণ করেন। যেমন হালব, শাম, কুদুস ইত্যাদি শহরগুলোতে পাড়ি জমান। বড় বড় বিদ্বানদের নিকট হাজির হন এবং তাদের থেকে উলুমে দীনিয়্যাহ হাসিল করেন। তিনি খুবই ইলমপিপাসু ছিলেন। ইলম অর্জনের জন্য ৭৮৩ হিজরিতে তার পিতার জন্মস্থান হালবেও সফর করেছিলেন। অতঃপর আবার নিজ শহর এয়ান্তাবে ফিরে আসেন। এর অল্প কিছুদিন পরই ৭৮৪ হিজরিতে তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেন।
মাদরাসা নির্মাণ
তিনি দারস-তাদরিস ও লেখালেখির পাশাপাশি জামে আযহারের কাছাকাছি একটি স্থানে একটি মাদরাসাও নির্মাণ করেছেন। এবং সেই মাদরাসায় ছাত্রদের জন্য নিজের সকল কিতাব ওয়াকফ (উৎসর্গ) করে দেন। এবং তার অবশিষ্ট কিতাবগুলো দারুল কুতুবিল মিসরিয়্যাতে হস্তান্তর করা হয়। [বুদূরুল মুযিয়্যাহ: ১৭/২৬০, যাওউল লামে: ১০/১৩৩, হাদাইকুল হানাফিয়্যাহ: ২৫৬]
ইমাম 'আয়নীর উস্তাদগণ
তাঁর অসংখ্য খ্যাতিমান উস্তাদ ছিলেন। তন্মধ্যে কয়েকজনের নাম নিম্নে উল্লেখ করা হলো-
১. ইমাম তাকীউদ্দিন মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুর-রহমান আদ-দাজবী রহ.
২. ইমাম আ'লা ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুর কারিম আল-ফাবী রহ.
৩. শরফুদ্দীন মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল লতিফ ইবনে কুয়াইক রহ.
৪. মুহাদ্দিস জয়নুদ্দীন তাগরি বারমুশ ইবনে ইউসুফ আত-তুরকামানী রহ.
৫. ইমাম জামালুদ্দীন ইউসুফ আল-মালতি রহ.
৬. জিবরীল ইবনে সালেহ আল-বাগদাদী রহ.
৭. ইমাম সায়রাফী রহ.
৮. ফকীহ ঈসা ইবনুল খাস ইবনে মাহমুদ আস-সারমারী রহ.
৯. ইমাম শামসুদ্দীন মুহাম্মদ রায়ী রহ.
[প্রাগুক্ত: ১৭/২৫২, হাদাইকুল হানাফিয়্যাহ: ২৪৭]
ইমাম বদরুদ্দীন 'আয়নী রহ. এর শিষ্যগণ
ইমাম বদরুদ্দীন 'আয়নী রহ. এর পুরা জীবন যেহেতু ইলমের সাথে সম্পৃক্ত ছিলো তাই তাঁর ছাত্রসংখ্যা ছিলো প্রচুর। শুধু মাদরাসায়ে মুয়ায়্যাদে তিনি দারস দিয়েছেন চল্লিশ বছর। এছাড়া অন্যান্যগুলো গণনায় আনা হয়নি। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অনেকেই রয়েছেন। যেমন-
১. মুহাক্কিক কামালুদ্দীন ইবনে হুমাম
২. ইমাম কাসেম ইবনে কুতলুবুগা
৩. হাফেয শামসুদ্দীন সাখাবী
৪. হাফেয নাসিরুদ্দীন আবুল বাকা
৫. ইমাম আবুল ফাতাহ মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আলী
৬. ইমাম আবূ ইসহাক ইবনে আলী ইবনে আহমদ আল-কুরায়শী
৭. ইমাম জয়নুদ্দীন কাখতায়ী
৮. ইমাম ইযযুদ্দীন হাম্বলী
৯. শায়খ কামালুদ্দীন আল-মালেকী
১০. নূরুদ্দিন আলী ইবনে দাঊদ আল খতীব আল-জাওহারী
মোটকথা সকল মাযহাবের ছাত্ররা তাঁর থেকে ইলম নিয়েছে। যেমনটি বর্ণনা করেছেন যাওউল লামি'-এর লেখক। তিনি বলেন -
وَأخذ عَنهُ الْأَئِمَّة من كل مَذْهَب
অর্থ: সকল মাযহাবের ইমামগণ 'আয়নী আল-হানাফী রহ. থেকে ইলম অর্জন করেছেন। [যাওউল লামি: ১০/১৩৩]
যারা ইমাম 'আয়নী রহ. থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন:
যারা ইমাম 'আয়নী রহ. থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন তাদের মধ্যে প্রসিদ্ধ হলো হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. এবং হাফেয জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহ.। বিস্তারিত দেখুন ‘কারওয়ানে ইলম ওয়া মাতায়ে’।
হাফেয সুয়ূতী রহ. তাঁর থেকে ইজাযত পেয়েছেন। ইজাযতে আম্মাহ। কারণ, ঐ সময় সুয়ূতী রহ. বয়সে অনেক ছোটো ছিলেন। আর অন্যদিকে ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বদরুদ্দীন 'আয়নী রহ. এর সমসাময়িক ছিলেন।
তথাপি ইবনে হাজার আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী রহ. এর রেওয়ায়েতে সহীহ মুসলিমের দুটি ও মুসনাদে আহমদের দুটি হাদীস আল-বালদানিয়্যাতে উল্লেখ করেছেন এবং তাঁকে নিজ বড় বড় শায়েখদের মধ্যে গণনা করেছেন। [বুদূরুল মুযিয়্যাহ: ১৭/ ২৫৪,২৫৫, যাওউল লামে: ১০/১৩৩]
ইমাম বদরুদ্দীন 'আয়নী রহ. এর লেখার গতি
হাফেয সাখাবী রহ. বলেন:
لَا يمل من المطالعة وَالْكِتَابَة، وصنف الْكثير بِحَيْثُ لَا أعلم بعد شَيخنَا أَكثر تصانيف مِنْهُ، وقلمه أَجود من تَقْرِيره وكتابته طَريقَة حَسَنَة مَعَ السرعة حَتَّى استفيض عَنهُ أَنه كتب الْقَدُورِيّ فِي لَيْلَة بل سمع ذَلِك مِنْهُ الْعِزّ الْحَنْبَلِيّ وَكَذَا قَالَ المقريزي أَنه كتب الْحَاوِي فِي لَيْلَة
অর্থ: 'আয়নী রহ. কিতাব পড়া আর লেখালেখি করতে বিরক্তবোধ করতেন না। তিনি অনেক বেশি লেখালেখি করতেন। আমাদের শায়খ ইবনে হাজারের পর তাঁর চেয়ে বেশি গ্ৰন্থ আর কারো দেখিনি। তাঁর কলম সুন্দরভাবে খুব দ্রুত চলতো৷ তিনি এক রাতেই পুরো ‘কুদুরী’ লিখে নেন। বরং ইযয আল-আহম্বলী এই কথা স্বয়ং তাঁর থেকেই শুনেছেন। এবং ইমাম মাকরিযী রহ. বলেন, এক রাতের মধ্যেই তিনি ‘হাবী’ কিতাবটি লিখে ফেলেন।
ইমাম বদরুদ্দীন 'আয়নী রহ. এর রচনাবলি
ইমাম বদরুদ্দীন আইনী হানাফি রহঃ উম্মহার খেদমতে অনেক কিতাব রচনা করেছেন।যেমন
১. উমদাতুল কারী শরহে সহীহুল বুখারী
২. নুখাবুল আফকার ফী তানকীহে মাবানিল আখবার ফী শরহে শরহে মা'আনিয়িল আসার
৩. মা'আনিউল আখইয়ার ফী রিজালে মা'আনিয়িল আসার
৪. শরহে সুনানে আবী দাঊদ
৫. তাকনীলুল আতরাফ
৬. আল-বিনায়াহ ফী শরহিল হিদায়াহ
৭. আদ দুরারুল জাযিরাহ ফী শরহেল বিহারিয যাখিরাহ
৮. গুরারুল আফকার ফী শরহে দুরারিল বিহার।
৯. আল মুসতাজমা' শরহু মাজমা'।
১০. রামযুল হাকাইক ফী শরহে কানজুদ দাকাইক
ইমাম বদরুদ্দীন 'আয়নী আল-হানাফী রহ. এর তেতাল্লিশটি কিতাবের মধ্যে দশটির নাম উল্লেখ করলাম। বাকি অবশিষ্ট যেগুলো রয়েছে তারমধ্যে কোনোটি দশ খণ্ড আর কোনোটি এগারো খণ্ড।
ইমাম বদরুদ্দীন 'আয়নী রহ. এর মৃত্যু
৮৫৫ সালে জিলহজ্জ ৪ তারিখ সোমবার দিন ইন্তেকাল করেন।
বদরুদ্দীন 'আয়নী রহ. এর প্রশংসায় ইমামগণ
ইমাম সাখাবী রহ. বলেন-
وَكَانَ إِمَامًا عَالما عَلامَة عَارِفًا بِالصرْفِ والعربية وَغَيرهَا حَافِظًا للتاريخ وللغة كثير الِاسْتِعْمَال لَهَا مشاركا فِي الْفُنُون ،
অর্থ: তিনি একজন ইমাম, আলেম এবং নাহু-সরফ তথা আরবী ভাষা ও অন্যন্য বিষয়ে সুবিজ্ঞ পণ্ডিত ছিলেন। ইতিহাস ও লুগাতের হাফিয। তিনি লুগাতের প্রচুর ব্যবহার করতেন। সব শাস্ত্রেই তার দখলদারিত্ব ছিলো [যাওউল লামি': ১০/১৩৩]
ইমাম আবুল মা'আলী আল হুসাইনী রহ. বলেন-
وهو الإمام العالم العلامة الحافظ المتقن شيخ العصر، أستاذ الدهر، محدث زمانه، المتفرد بالرواية والدراية، حجة الله على المعاندين، وآيته الكبرى على المبتدعين، شرح صحيح الإمام البخاري بشرح لم يسبق له نظير في شروحه، مع ما كان له من المصنفات المفيدة، والآثار السديدة، تولى القضاء في مصر، وبنى مدرسة عظيمة بالقرب من جامع الأزهر، وأنشأ فيها خزانة كتب وضع فيها كتباً نفيسة في فنون مختلفة، وكان مشغولاً بالتأليف والتدريس،وبالجملة؛ كان رحمه الله من مشاهير عصره علماً وزهداً وورعاً، وممن له اليد الطولى في الفقه والحديث، وقد أسف المسلمون على فقده.
অর্থ: তিনি একজন ইমাম, একজন আলেম, আল্লামাহ, হাফেজ, ছিকাহ, জামানার উস্তায এবং যুগের শায়খ, সময়ের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস। হাদীস বর্ণনা ও বোঝার ক্ষেত্রে অনন্য। দুশমনদের বিপক্ষে আল্লাহর দলীল। বিদ'আতীদের বিপক্ষে আল্লাহর এক বড় নিদর্শন। তিনি বুখারীর এমন ব্যাখ্যা লিখেছেন যার দৃষ্টান্ত ইতিপূর্বে আর দেখা যায়নি। তা সত্ত্বেও এটা ছাড়া তাঁর অনেক উপকারী গ্ৰন্থ রয়েছে। মিসরের কাজী জামে আজহারের কাছাকাছি একটি বড় মাদরাসাহ নির্মাণ করেছেন। এবং তিনি সেখানে কিতাবের একটি সংগ্রহশালাও তৈরি করেন। তাতে বিভিন্ন শাস্ত্রের অনেক মুল্যবান কিতাব রয়েছে। তিনি সবসময় দারস-তাদরীস ও লেখালেখিতে মশগুল থাকতেন। মোটকথা, তিনি নিজ জমানার প্রসিদ্ধ আলেম, দুনিয়াবিমুখ ও পরহেজগার ছিলেন। এবং হাদীস ও ফিকহে পাণ্ডিত্যধারীদের একজন ছিলেন। তাঁর পরলোক গমনে মুসলমানগণ যারপরনাই ব্যথিত হন। [গায়াতুল আমানী: ২/১৫৪]
আল্লামা হিফজুর রহমান তাঁর বুদূরুল মুযিয়্যাহ ফী তারাজিমিল হানাফিয়্যাহ’তে বলেন-
كان البدر العيني آخر مرجع الحل في المشكلات ،وكشف المعضلات، وعند فتواه تقف ملك الاسلام في النوازل والمهمات
অর্থ: কঠিন এবং দুর্বোধ্য জায়গাগুলোতে 'আয়নী রহ. সর্বশেষ সমাধানদাতা ছিলেন। গুরুত্বপূর্ণ এবং আকস্মিক কোনো মসিবতে ইসলামী রাষ্ট্র তার ফাতওয়ার ওপর নির্ভর করতো। [আল বুদূরুল মুযিয়্যাহ: ১৭/ ২৫৫]
আল্লাহ তা'আলা এই মহান ইমামকে জান্নাতুল ফেরদাঊসের উঁচু মাকাম নসিব করুন। আমাদের তাঁর ইলম থেকে উপকৃত হওয়ার তাওফীক দান করুন, আমীন।