আরবের আলেমগণ কি তাকলিদ বিরোধী?
তাক্বলীদে সাখছী
১. শায়খ আব্দুর রাহমান ইবনে সা‘দী রাহ.
যে সকল মাসআলায় ফিকহ-ফতোয়ার ইমামগণের মাঝে শরয়ী দলীলের ভিত্তিতে ইখতিলাফ হয়েছে তাতে সাধারণ মানুষের কর্তব্য, নিজ অঞ্চলের আলিমদের ফতোয়া অনুসরণ করা। সালাফের যুগে এই নীতিই অনুসরন করা হত।
অথচ অনেক সময় গাইরে মুকাল্লিদ বন্ধুদের দেখা যায়, তারা মতভেদপূর্ণ মাসআলায় নিজ দেশের আলিমদের পরিবর্তে আরব জাহানের আলিমদের ফতোয়া অনুসরণ করেন এবং অন্যদেরকেও তা মানার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেন। এটা সঠিক নিয়ম নয়। খোদ আরবের আলেমগণ বলে গেছেন, সাধারণ মানুষের কর্তব্য মতভেদপূর্ণ মাসআলায় নিজ দেশের আলিমদের তাকলিদ করা। যারা এই নীতি অনুসরন করতে বলেছেন তাঁদের অন্যতম হলেন সৌদি আরবের শায়খ আব্দুর রহমান ইবনে সা‘দী রাহ.।
তিনি শাইখ উছাইমীন রাহ.-এর উস্তায ছিলেন। শাইখ উছাইমীন রাহ. বলেন,
فالعامي يجب عليه أن يقلد علماء بلده الذين يثق بهم، وقد ذكر هذا شيخنا عبد الرحمن بن سعدي رحمه الله، وقال: "العامة لا يمكن أن يقلدوا علماء من خارج بلدهم؛ لأن هذا يؤدي إلى الفوضى والنزاع"
অর্থ: সাধারণ মানুষের জন্য ওয়াজিব হল নিজ দেশের বিশ্বস্ত আলিমদের তাকলীদ করা। এই বিষয়টি আমাদের উস্তায আব্দুর রহমান ইবনে সা‘দী রাহ. বলে গেছেন। তিনি বলতেন, সাধারণ মানুষের জন্য অসম্ভব যে, সে নিজ দেশের আলিমদের পরিবর্তে অন্য দেশের আলিমদের তাকলীদ (অন্ধ অনুসরণ) করবে। কেননা এর দ্বারা বিশৃঙ্খলা/নৈরাজ্য ও বিবাদ-বিসংবাদের সৃষ্টি হয়। লিকা'আতুল বাবিল মাফতুহ ১৯/৩২
২. শায়খ মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহীম আলে শায়খ রাহ.
শায়খ মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহীম রাহ. ছিলেন সৌদি আরবের সাবেক প্রধান মুফতী এবং শায়খ ইবনে বায রাহ.-সহ অনেক আলেমের উস্তায। তাঁর সম্পর্কে শায়খ আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুর রহমান আলজিবরীন বলেন,
قد لاحظنا ان الشيخ ابن ابراهيم يشرح كتب الحنابلة كالروض المربع ونحوه ويقرر مسائله، ولا يخرج عنها إلا قليلا.
আমরা পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি, শায়েখ মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহীম আলে শায়খ রাহ. হাম্বলী মাযহাবের কিতাবসমূহ যেমন ‘আর-রাওযুল মুরবি’ ইত্যাদির ব্যাখ্যা করতেন এবং এখানে উল্লেখিত মাসআলার প্রমাণাদি আলোচনা করতেন। খুব কমই এখান থেকে সরে আসতেন। ভূমিকা: আল ইজায ফী বা'যি মাখতালাফা ফীহিল আলবানী ওয়াবনু আসাইমীন ওয়াবনু বায: ১/৬
৩. শায়খ আব্দুল আযিয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায রাহ.-এর বক্তব্য
সৌদি আরবের সাবেক প্রধান মুফতী শাইখ ইবনে বায রাহ.-কে তাঁর ফিকহী মাযহাব সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছেন,
مذهبي في الفقه هو مذهب الإمام أحمد بن حنبل رحمه الله.
অর্থ: ফিকহের ক্ষেত্রে আমার মাযহাব হল, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রাহ.-এর মাযহাব। [মাজমূ'উল ফাতাওয়া লি-ইবনে বায: ৪/১৬৬]
তিনি আরো বলেছেন,
وأتباع الشيخ محمد بن عبد الوهاب رحمه الله كلهم من الحنابلة، ويعترفون بفضل الأئمة الأربعة و يعتبرون أتباع المذاهب الأربعة إخوة لهم في الله.
অর্থ: শায়খ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব নাজদীর অনুসারী সকলেই হাম্বলী মাযহাবের অন্তর্ভুক্ত। তারা চার ইমামকেই অত্যন্ত শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখেন এবং চার মাযহাবের অনুসারীদেরকে নিজেদের দ্বীনী ভাই মনে করে থাকেন। [মাজমু'উল ফাতাওয়া লি-ইবনে বায: ৫/১৫০]
ফিকহী মাযহাবগুলি সম্পর্কে সাধারণত আমাদের গাইরে মুকাল্লিদ বন্ধুরা ধারণা করেন যে, এগুলো নতুন সৃষ্ট এবং এই ফিকহী মতপার্থক্য মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও সংহতিকে বিনষ্ট করেছে এবং তাঁদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করেছে। শায়েখ ইবনে বায রাহ. এই ধারণা খণ্ডন করে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন,
وأنتم تعلمون حفظكم الله أن الخلاف المذهبي في أمور الفروع واقع منذ قديم الزمان، ولم يؤد ذلك إلى البغضاء والتشاحن والشقاق.
অর্থ: আল্লাহ আপনাদের রক্ষা করুন নিশ্চয়ই আপনারা অবগত আছেন যে, দ্বীনের ফুরু‘ বা শাখাগত মাসায়েলে ফিকহী মাযহাবসমূহের মধ্যে যে মতপার্থক্য তা নতুন নয় বরং প্রাচীনযুগ (সাহাবাযুগ) থেকেই চলে আসছে। আর এই মতপার্থক্য মুসলিম উম্মাহর মধ্যে কোনোরকম হিংসা-বিদ্বেষ এবং বিভক্তি সৃষ্টি করেনি। [মাজমু'উল ফাতাওয়া লি-ইবনে বায: ৫/১৪৯]
দ্বীনের ফুরু‘ বা শাখাগত মাসায়েলে মতভিন্নতা যে সালাফ থেকেই চলে আসছে এবং এটা কোনো বিভেদ-বিচ্ছিন্নতা নয় এই বিষয়টি শাইখ ইবনে বায রাহ. অসংখ্য জায়গায় বলেছেন। এক জায়গায় তিনি লেখেন,
فقد كان أصحاب الرسول صلى الله عليه وسلم والعلماء بعدهم رحمهم الله يختلفون في المسائل الفرعية، ولا يوجب ذلك بينهم فرقة ولا تهاجرا...
অর্থ: রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ এবং তাঁদের পরবর্তী উলামায়ে কেরাম শাখাগত অনেক মাসায়েলে মতভেদ করেছেন। কিন্তু এই মতভেদ তাঁদের মাঝে বিভেদ ও বিভক্তি সৃষ্টি করেনি কেননা তাঁদের প্রত্যেকের উদ্দেশ্য ছিলো দলীলের ভিত্তিতে সত্যকে জানা।
৪. শায়খ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসায়মীন রাহ.
সৌদি আরবের আরেকজন সম্মানিত আলিম, সর্বোচ্চ উলামা পরিষদের সদস্য শায়খ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসায়মীন রাহ.-এরও মাযহাব ও তাকলীদের সমর্থনে একাধিক বক্তব্য রয়েছে। তিনি নিজের ফিকহী মাসলাকের পরিচয় দিতে গিয়ে স্পষ্ট বলেছেন,
نحن الآن مذهبنا مذهب الامام أحمد رحمه الله.
অর্থ: বর্তমানে আমাদের মাযহাব হল, ইমাম আহমাদ রাহ.-এর মাযহাব। [লিকা'আতুল বাবিল মাফতুহ: ১২/১০০]
মাযহাব মানার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি আরো লেখেন-
الانتماء الى المذهب ودراسة قواعده و أصوله يعين الإنسان على فهم الكتاب والسنة.
অর্থ: কোনো মাযহাবের সাথে সম্বন্ধযুক্ত হওয়া এবং তাঁর উসূল ও কাওয়ায়েদ অধ্যয়ন করা মানুষকে কুরআন-সুন্নাহ বুঝতে সহায়তা করে। [মাজমু'উল ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল লি-উসায়মীন: ২৬/২৪৫]
তিনি সাধারণ মানুষের জন্য তাকলীদকে অত্যন্ত জরুরি মনে করতেন। বিশেষত মতপার্থক্যপূর্ণ মাসআলায় নিজ দেশের আলিমদের অনুসরণ এবং তাদের সাথে যুক্ত থাকার প্রতি জোর তাগিদ দিতেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন-
أن يكون المقلد عاميا لا يستطيع معرفة الحكم بنفسه ففرضه التقليد لقوله تعالى فاسالوا أهل ذكر إن كنتم لا تعلمون.
মুকাল্লিদ যদি একজন সাধারণ ব্যক্তি হয়, যে নিজে নিজে থেকে হুকুম বের করার সামর্থ্য রাখে না, তাহলে তার উপর ফরজ হচ্ছে তাকলীদ করা। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেছেন, যদি তোমরা না জানো তাহলে আহলুয যিকর (আলেমদের) জিজ্ঞেস করো। [আল উসূল মিন ইলমিল উসূল: ১/৮৭]
নিজ অঞ্চলের আলিমদের অনুসরণের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে শাইখ উসায়মীন রাহ. বলেন-
لأن فرضك أنت هو التقليد، وأحق من تقلد علماؤك، ولو قلدت من كان خارج بلادك أدى ذلك إلى الفوضى في أمر ليس عليه دليل شرعي... فالعامي يجب عليه أن يقلد علماء بلده الذين يثق بهم.
অর্থ: নিশ্চয়ই তোমার ফরজ হল তাকলীদ করা। আর তোমার তাকলীদের সবচে বড় হকদার হল তোমার দেশের আলিমগণ। যদি তুমি তা না করে বাইরের দেশের আলিমদের তাকলীদ করো তবে তা নৈরাজ্য/বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করবে- (বিশেষ করে) যেসব বিষয়ে শার'ঈ দলীল নেই। সুতরাং সাধারণ মানুষের জন্য ফরজ হচ্ছে, নিজ দেশের আলিমদের তাকলীদ করা। [লিকা'আতুল বাবিল মাফতুহ: ১৯/৩২]
গায়রে মুকাল্লিদ বন্ধুদের ধারণা, তাকলীদ চতুর্থ শতাব্দীতে শুরু হয়েছে। অথচ তাকলীদ সাহাবা যুগ থেকেই চলে আসছে। এ বিষয়ে শায়খ উসায়মীন রাহ. লেখেন—
والتقليد في الواقع حاصل من عهد الصحابة رضي الله عنهم. ولا شك أن من الناس في عهد الصحابة رضي الله عنهم وإلى عهدنا هذا من لا يستطيع الوصول إلى الحكم بنفسه لجهله وقصوره، ووظيفة هذا أن يسأل أهل العلم، وسؤال أهل العلم يستلزم الأخذ بما قالوا، والأخذ بما قالوا هو التقليد.
অর্থ: বাস্তব কথা হল, তাকলীদ সাহাবা যুগ থেকেই চলে আসছে। কেননা সাহাবা যুগ থেকে নিয়ে এই যুগ পর্যন্ত সবসময়ই এমন মানুষ থাকেন, যারা নিজে নিজে শরী'আতের বিধান জানতে সক্ষম নন। তাঁদের কর্তব্য, আহলে ইলমদের জিজ্ঞাসা করে সেই অনুপাতে আমল করা। আর এটাই তাকলীদ। [ফতোয়া নূর আলাদ দার্ব: ২/২২০]
মাযহাব এবং তাকলীদ বিষয়ে শায়খ উসায়মীন রাহ. যা বললেন, এরপরেও যদি আমাদের ঐ বন্ধুরা আশ্বস্ত না হন তবে তা হবে অত্যন্ত দুঃখজনক।
৫. শায়খ সালিহ আল ফাওযান
সৌদি আরবের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় আলিম শায়খ সালিহ আল ফাওযানেরও এ বিষয়ে বেশ কিছু বক্তব্য রয়েছে। মাযহাব অনুসরণ যে জরুরি এই বিষয়টি স্পষ্ট করতে গিয়ে শায়খ সালিহ ফাওযান লেখেন
هاهم الأئمة من المحدثين الكبار كانوا مذهبيين، فشيخ الاسلام ابن تيمية وابن القيم كانا حنبليين، والإمام النووي وابن حجر شافعيين، والإمام الطحاوي كان حنفيا وابن عبدالبر كان مالكيا.
অর্থ: বড় বড় হাদীস বিশারদ ইমামগণ মাযহাবের অনুসারী ছিলেন। শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ রাহ. ও ইবনুল কায়্যিম রাহ. ছিলেন হাম্বলী, ইবনে হাজার রাহ. ও ইমাম নববী রাহ. ছিলেন শাফেয়ী মাযহাবের অনুসারী। ইমাম ত্বাহাবী রাহ. ছিলেন হানাফী মাযহাবের অনুসারী। ইবনু আব্দিল বার্র রাহ. ছিলেন মালেকী মাযাহবের অনুসারী। [ই'আনাতুল মুসতাফিদ শরহু কিতাবিত তাওহীদ: ১/১২]
৬. শায়খ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব নাজদী
আরবের মাটিতে তাওহীদ ও সুন্নাহকে যিন্দা করা এবং শিরক-বিদআত নির্মূলে যারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন তাঁদের অন্যতম হলেন শাইখ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব নাজদী রাহ.। বর্তমানে সৌদি আরবের অধিকাংশ আলিম শাইখ নাজদী রাহ.-এর চিন্তা-চেতনা ও মতাদর্শে বিশ্বাসী। আমাদের সালাফী বন্ধুরাও তাঁর রচিত ‘কিতাবুত তাওহীদ’ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে অধ্যয়ন করে থাকেন। মাযহাব ও তাকলীদের বিষয়ে শাইখ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব নাজদী-এর অনেক বক্তব্য রয়েছে। কিছু এখানে উল্লেখ করছি। এক জায়গায় তিনি বলেন-
ونحن أيضاً في الفروع، على مذهب الإمام أحمد بن حنبل، ولا ننكر على من قلد أحد الأئمة الأربعة، دون غيرهم، لعدم ضبط مذاهب الغير؛ الرافضة، والزيدية، والإمامية، ونحوهم؛ ولا نقرهم ظاهراً على شيء من مذاهبهم الفاسدة، بل نجبرهم على تقليد أحد الأئمة الأربعة .
অর্থ: আমরা ফিকহী বিষয়ে ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল রাহ.-এর মাযহাবের অনুসারী। যারা চার ইমামের কোনো একজনের তাকলীদ করে আমরা তাদের উপর কোনো আপত্তি করি না। কারণ (চার ইমামের মাযহাব সংকলিতরূপে বিদ্যমান। পক্ষান্তরে) অন্যদের মাযহাব সংকলিত আকারে বিদ্যমান নেই। তবে রাফেযী, যায়দিয়্যাহ,ইমামিয়্যাহ ইত্যাদি বাতিল মাযহাব-মতবাদের অনুসরণকে আমরা স্বীকৃতি দিই না। বরং তাদেরকে চার ইমামের কোনো একজনের তাকলীদ করতে বাধ্য করি। [আদ দুরারুস সানিয়্যাহ: ১/২৭৭]
শাইখ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব নাজদীর উপরোক্ত বক্তব্যই প্রমাণ করে তিনি চার মাযহাবের কোনো একটির অনুসরণকে কতটা জরুরি মনে করতেন। সেই সাথে এটাও স্পষ্ট হল যে, তিনি হাম্বলী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন। যারা তাঁর নামে প্রচার করেছিল যে, ‘তিনি তাকলীদকে বর্জন করেছেন এবং চার মাযহাবের গ্রন্থগুলিকে বাতিল বলেন’ তিনি তাদের এই প্রচারণার বাস্তবতা খণ্ডন করে বলেছেন :
قوله : إني مبطل كتب المذاهب الأربعة، وإني أقول إن الناس من ستمائة سنة ليسوا على شيء وإني أدعي الاجتهاد، وإني خارج عن التقليد... هذا بهتان عظيم .
অর্থ: যারা আমার নামে প্রচার করছে যে, আমি চার মাযহাবের কিতাবগুলোকে বাতিল বলি, আমি নাকি বলি মানুষ ছয়শ বছর ধরে ভুলের উপর আছে, আমি ইজতিহাদের দাবি করেছি এবং তাকলীদকে বর্জন করেছি, (তাদের এই অপপ্রচারের জবাবে শুধু এটাই বলব,) এটা আমার উপর অনেক বড় অপবাদ। [আর রাসায়েলুস শাখসিয়্যাহ: পৃ-৪]
???? তাক্বলীদে মত্বলক্ব (সাধারণ/অনির্দিষ্ট তাক্বলীদ)
১. শায়খ আবু বকর জাবির আল জাযায়েরী রাহ.
সৌদি আরবের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় আলিম, মসজিদে নববীর ওয়ায়েজ আবু বকর জাবের জাযায়েরী সূরা আম্বিয়া এর ৭ নং আয়াত- فاسألوا أهل الذكر إن كنتم لا تعلمون- এর তাফসীরে লেখেন-
وفي الآية دليل على وجوب تقليد العامة العلماء، إذ هم أهل الذكر، ووجوب العمل بما يفتونهم به ويعلمونهم به.
অর্থ: উপরের আয়াতে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যে সাধারণ মানুষের উপর উলামাদের তাকলীদ করা ওয়াজিব। কেননা আয়াতে ‘আহলুয যিকর’ বলে উলামাদেরকেই উদ্দেশ্য করা হয়েছে। সুতরাং আলেমগণ যা ফতোয়া দেন, যা শিক্ষা দেন সেটার উপর আমল করা ওয়াজিব। [আইসারুত তাফাসীর: ৭৭০]
২. শায়খ আতিয়্যাহ সালিম-এর বক্তব্য
সৌদি আরবের আরেকজন প্রসিদ্ধ আলিম,মসজিদে নববীর মশহুর মুদাররিস এবং মদীনা মুনাওওয়ারার কাযী শায়খ আতিয়্যা সালিম রাহ. যারা ফিকহী মাযহাবের দলীল নির্ভর মতভেদকে দোষণীয় মনে করেন এবং উম্মাহর মাঝে বিভেদ-বিচ্ছন্নতা জ্ঞান করে একে নির্মূল করার চেষ্টা করছেন তাঁদের চিন্তাকে সংশোধন করে বলেন
إن الاختلاف أمر من لوازم البشر، ولا يمكن رفعه، ولأنه لا يشكل خطرا على الأمة، فقد كانوا يختلفون في الرأي مع اتحاد كلمتهم وتوحيد صفوفهم.
অর্থ: নিশ্চয়ই ইখতিলাফ বা মতভিন্নতা মানুষের স্বভাবজাত একটি বিষয়। এটি নির্মূল করা সম্ভব নয়। ইখতিলাফ উম্মাহর জন্য কোনো ক্ষতিকর বিষয় নয়। তাঁরা (সালাফে সালেহীন) অনেক বিষয়ে ইখতিলাফ করেছেন। কিন্তু এ সত্ত্বেও তাঁরা ঐক্যবদ্ধ ছিলেন। তাঁদের মাঝে কোনো বিভেদ ছিল না। [মাওকিফুল উম্মাহ মিন ইখতিলাফিল আইম্মাহ: ১৪]
৩. শায়খ শানকীতি রাহ.
সৌদি আরবের আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন শায়খ শানকীতি রাহ.। তাঁর ‘আযওয়াউল বয়ান’ তো খুবই প্রসিদ্ধ। শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালিহ উসায়মীন রাহ.ও অনেক সময় ‘আযওয়াউল বয়ান’ কিতাবের হাওয়ালা দিয়ে থাকেন। দ্র. ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম পৃ. ৩৯৭।
শায়খ শানকীতি রাহ. লেখেন
ولم يختلف العلماء، أن العامة عليها تقليد علمائها، وأنهم المرادون بقول الله عز وجل: فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لا تَعْلَمُونَ.
অর্থ: এ বিষয়ে কোনো আলিমের দ্বিমত নেই যে, সাধারণ মানুষের জন্য আলিমদের তাকলীদ করা আবশ্যক। কেননা আয়াতে আহলুয যিকর দ্বারা আহলে ইলমই উদ্দেশ্য। [আযওয়াউল বয়ান: ৭/৪৯৫]
তিনি আরো লেখেন
وقد أمر الله تعالى بطاعته وطاعة رسوله وأولى الأمر، وهم العلماء أو العلماء والأمراء، وطاعتهم تقليدهم فيما يفتون به.
অর্থ: আল্লাহ তা'আলা মানুষকে তার আনুগত্য করার, রাসূলের আনুগত্য করার এবং ‘উলুল আমর’-এর আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়েছেন। উলুল আমর দ্বারা উদ্দেশ্য হল আলেমগণ অথবা উলামা ও উমারা উভয়ই। তাঁদের আনুগত্যের অর্থ হল, তাঁরা যে ফতোয়া দেন সেই বিষয়ে তাদের তাকলীদ করা। [আযওয়াউল বায়ান: ৪/৫০১]
৪. শায়খ আলবানী
আহলে হাদীসের প্রাণপুরুষ শায়খ আলবানীকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তাক্বলীদ (বা মাযহাব মানা) যে হারাম- তার দলিল কী? উত্তরে তিনি বললেন,
لا أعلم دليلاً على تحريم التقليد، بل التقليد لا بد منه لمن لا علم عنده، وقد قال الله تعالى: (فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ)؛ فهذه الآية جعلت المسلمين من العلم قسمين: عالم وأوجب عليه أن يجيب السائل، وغير عالم وأوجب عليه أن يسأل العالم، فلو كان رجلاً من عامة الناس جاء لعالم فسأله فأجابه العالم فقد طبق هذا الرجل هذه الآية
তাকলিদ হারাম হওয়ার কোনো দলিল আছে বলে আমার জানা নেই বরং যে জানেনা তার তাক্বলীদ করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
فاسالوا أهل ذكر إن كنتم لا تعلمون
যদি তোমরা না জানো তাহলে যারা জানে তাদের কে জিজ্ঞেস করো। এই আয়াতে ইলমের ভিত্তিতে মুসলমানদের দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। আলিম: তার উপর ওয়াজিব করা হয়েছে প্রশ্নকারীর উত্তর দেওয়া। অজ্ঞ: তার উপর ওয়াজিব করা হয়েছে আলিম কে জিজ্ঞেস করা।
সাধারণ মানুষের কেউ যদি কোনো আলেমের কাছে গিয়ে (কোনো ফতোয়া) জিজ্ঞেস করে এবং আলিমের উত্তর অনুযায়ী আমল করে তাহলে সে কুরআনের এই আয়াত অনুযায়ী কাজ করলো। [আরশিফুল মুলতাকা আহলুল হাদীস- ১/৩৬০]
৫. রাবেতাতুল আলামিল ইসলামী’র সিদ্ধান্ত
সবশেষে ফিকহি মাযহাবের ইখতিলাফ ও মতভিন্নতার ধরন সম্পর্কে বর্তমান যুগের বড় বড় মনীষীর প্রতিনিধিত্বে ১৪০৭ হিজরীতে ‘রাবেতাতুল আলামিল ইসলামী’ মক্কা মুকাররমায় যে সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়েছিল তার মূল অংশ তুলে ধরছি
“মুসলিম বিশ্বে প্রচলিত চিন্তানৈতিক মতবিরোধ সাধারণত দু’ধরনের।
ক. আকীদা ও বিশ্বাসগত মতবিরোধ। খ. আহকাম ও বিধানগত মতবিরোধ।
প্রথমোক্ত মতবিরোধ: (এখানে অনুল্লিখিত রইলো)। আর দ্বিতীয়তটি হল, কিছু বিধানের ক্ষেত্রে ফিকহী মাযহাবসমূহের মতপার্থক্য, যার অনেক শাস্ত্রীয় কারণ রয়েছে। এবং যাতে আল্লাহ তাআলার নিগূঢ় হিকমত রয়েছে। যেমন বান্দাদের প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ এবং নুসূস থেকে আহকাম ও বিধান উদঘাটনের ক্ষেত্রকে প্রশস্ত করা। তাছাড়া এটা হল অল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এক বিরাট নেয়ামত এবং ফিকহ ও কানুনের মহাসম্পদ, যা মুসলিম উম্মাহকে দ্বীন ও শরীয়তের ক্ষেত্রে প্রশস্ততা দিয়েছে। ফলে তা নির্ধারিত একটি হুকুমের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকবে না, যা থেকে কোনো অবস্থাতেই বের হওয়ার সুযোগ নেই। বরং যে কোনো সময়ই কোনো বিষয়ে যদি কোনো একজন ইমামের মাযহাব সংকীর্ণতার কারণ হয়ে যায় তাহলে শরঈ দলিলের আলোকেই অন্য ইমামের মাযহাবে সহজতা ও প্রশস্ততা পাওয়া যাবে। তা হতে পারে ইবাদত সংক্রান্ত বিষয়ে অথবা মুআমালা সংক্রান্ত অথবা পারিবারিক কিংবা বিচার ও অপরাধ সংক্রান্ত। তো আহকাম ও বিধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের মাযহাবী ইখতিলাফ আমাদের দ্বীনের জন্য দোষের কিছু নয় এবং তা স্ববিরোধিতাও নয়। এ ধরনের মতভেদ না হওয়া অসম্ভব। এমন কোনো জাতি পাওয়া যাবে না যাদের আইন-ব্যবস্থায় এ ধরনের ইজতিহাদী মতপার্থক্য নেই।
অতএব বাস্তবতা এই যে, এ ধরনের মতভেদ না হওয়াই অসম্ভব। কেননা একদিকে যেমন নুসূসে শরয়ী অনেক ক্ষেত্রে একাধিক অর্থের সম্ভাবনা রাখে অন্যদিকে শরয়ী নস সম্ভাব্য সকল সমস্যাকে সুস্পষ্টভাবে বেষ্টন করতে পারে না। কারণ নুসূস হল সীমাবদ্ধ আর নিত্য-নতুন সমস্যার তো কোনে সীমা নেই।
অতএব কিয়াসের আশ্রয় নেওয়া এবং আহকাম ও বিধানের ইল্লত, বিধানদাতার মাকসাদ; শরীয়তের সাধারণ মাকসাদসমূহ বোঝার জন্য চিন্তাভাবনা করতে হবে এবং এর মাধ্যমে নিত্যনতুন সমস্যার সমাধান গ্রহণ করতে হবে।
এখানে এসেই উলামায়ে কেরামের চিন্তার বিভিন্নতা দেখা দেয় এবং সম্ভাব্য বিভিন্ন দিকের কোনো একটিকে প্রাধান্য দেওয়ার ক্ষেত্রে মতপার্থক্য হয়। ফলে একই বিষয়ে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত আসে। অথচ প্রত্যেকের উদ্দেশ্য হক্ব ও সত্যের অনুসন্ধান। কাজেই যার ইজতিহাদ সঠিক হবে তিনি দুটি বিনিময় পাবেন এবং যার ইজতিহাদ ভুল হবে তিনি একটি বিনিময় পাবেন। আর এভাবেই সংকীর্ণতা দূর হয়ে প্রশস্ততা সৃষ্টি হয়।
সুতরাং যে মতপার্থক্য কল্যাণ ও রহমতের ধারক তা বিদ্যমান থাকলে দোষ কেন হবে? বরং এ তো মুমিন বান্দার প্রতি আল্লাহ তাআলার রহমত ও অনুগ্রহ। বরং মুসলিম উম্মাহর গর্ব ও গৌরবের বিষয়।
কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, কিছু মুসলমান তরুণ, বিশেষত যারা বাইরে লেখাপড়া করতে যায় তাদের ইসলামী জ্ঞানের দুর্বলতার সুযোগে কিছু গোমরাহকারী লোক তাদের সামনে ফিকহী মাসআলার এজাতীয় মতপার্থক্যকে আকীদার মতভেদের মতো করে তুলে ধরে। অথচ এ দু’য়ের মাঝে আকাশ-পাতালের ব্যবধান!
দ্বিতীয়ত যে শ্রেণীর লোকেরা মানুষকে মাযহাব বর্জনের আহ্বান করে এবং ফিকহের মাযহাব ও তার ইমামগণের সমালোচনা করে এবং মানুষকে নতুন ইজতিহাদের মধ্যে নিয়ে আসতে চায় তাদের কর্তব্য, এই নিকৃষ্ট পন্থা পরিহার করা, যা দ্বারা তারা মানুষকে গোমরাহ করছে এবং ঐক্যকে বিনষ্ট করছে। অথচ এখন প্রয়োজন ইসলামের দুশমনদের ভয়াবহ চ্যালেঞ্জের মোকাবেলায় নিজেদের ঐক্যকে সুদৃঢ় করা।” [মাজাল্লাতুল মাজমাইল ফিকহী, রাবিতাতুল আলামিল ইসলামী, মক্কা মুকাররমা, বর্ষ ১, সংখ্যা ২, পৃষ্ঠা : ৫৯, ২১৯]
উপরোক্ত রেজুলেশনে যাদের স্বাক্ষর রয়েছে:
আবদুল আযীয ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে বায —রঈস/প্রধান
ড. আব্দুল্লাহ উমর নাসিফ, —নায়েবে রঈস/উপ প্রধান
মুহাম্মাদ আশশাযিলী আননাইফার, সদস্য
মুহাম্মাদ আলহাবীব ইবনুল খাওজা, সদস্য
মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে সুবায়্যিল, সদস্য
আবুল হাসান আলী নদবী, সদস্য; আবু বকর জুমী, সদস্য
মুহাম্মাদ ইবনে জুবাইর, সদস্য
সালেহ ইবনে ফাওযান আলফাওযান, সদস্য
মুহাম্মাদ মাহমুদ আসসাওয়াফ, সদস্য
আব্দুল্লাহ আবদুর রহমান আলবাসসাম, সদস্য
মুস্তফা আহমাদ আযযারকা, সদস্য
মুহাম্মাদ রশীদ রাগেব কাবানী, সদস্য
ড. আহমাদ ফাহমী আবু সুন্নাহ, সদস্য
মুহাম্মাদ সালেম ইবনে আবদুল ওয়াদূদ, সদস্য।
কিন্তু আফসোস!আমাদের দেশ থেকে অসংখ্য মানুষ হজ্জে বাইতুল্লাহ এবং যিয়ারাতে মাদীনার উদ্দেশ্যে আরব সফর করে থাকেন। এছাড়াও রুজি-রোযগারের উদ্দেশ্যেও আমাদের দেশের অনেক মানুষ সেখানে প্রবাস জীবন যাপন করছেন। যে উদ্দেশ্যেই হোক, আরবের পুণ্যভূমি সফর করতে পারা অনেক বড় সৌভাগ্যের বিষয়। তবে সাম্প্রতিককালে আমাদের কিছু ভাই সেখান থেকে সফর করে এসে মুজতাহিদ ইমামগণ এবং তাঁদের সংকলিত ফিকহী মাযহাব সম্পর্কে বিভিন্নরকম বিষোদগার করে থাকেন। এসব ফিকহী মাযহাব কোত্থেকে এল? আরবে মাযহাব এবং তাকলীদ বলতে তো কিছু নেই? আরবের আলেমগণ তো কোনো মাযহাব অনুসরণ করেন না ইত্যাদি নানা রকম মন্তব্য তাঁদের মুখে শোনা যায়। সাধারণ মানুষকেও তাঁরা মাযহাব এবং তাকলীদ সম্পর্কে বিরূপ ও বীতশ্রদ্ধ করে থাকেন।
অথচ বাস্তবতা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। অধিকাংশ আরব আলেম কোনো না কোনো মাযহাবেরই অনুসারী। কোনো কোনো আলেম সরাসরি কোনো মাযহাবের সাথে নিজেকে সম্পর্ক বা সম্বন্ধ না করলেও ফিকহ ও ফতোয়া, মাযহাব এবং মাযহাবের অনুসারীদের প্রতি ইতিবাচক মানসিকতা পোষণ করেন। আর সাধারণ মানুষের জন্য তাকলীদকে জরুরি মনে করে থাকেন। আলিমদের অনুসরণ ও তাদের সাথে যুক্ত থাকার জন্য উৎসাহিত করে থাকেন। মাযহাব তাকলীদকে গোমরাহী আখ্যা দেওয়ার যে প্রবণতা তা ওখানের দায়িত্বশীল আলিমগণের বা অনুসরণীয় মাশাইখের প্রবণতা নয়। এটা মূলত অপরিপক্ক ইলমের অধিকারী আবেগপ্রবণ কিছু লোকের প্রবণতা।
মোটকথা সৌদি আরবের মূল ধারার আলেমগণ মুজতাহিদ ইমামও তাদের সংকলিত ফিকহী মাযহাবসমূহের ব্যাপারে পরিপূর্ণ শ্রদ্ধাশীল। তারা কখনোই মাযহাবের অনুসারীদের ব্যাপারে অশালীন মন্তব্য করেন না। যারা এই ধরনের কাজে ব্যতিব্যস্ত তাদের অধিকাংশই বিভিন্ন দেশ থেকে সেখানে গিয়েছে। সুতরাং যেই জিনিস হেজাযের বাইরে থেকে হেজাযের ভিতরে প্রবেশ করেছে সেটাকে আরবের মনে করে এই দেশে নিয়ে আসা বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না। আল্লাহ সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন।