আবূ বকর ও ওমর রা. কুরবানী দেননি কেন: সংক্ষিপ্ত তাহকীক
বর্তমানে কিছু ভাই দাবি করে থাকে, লোকেরা কুরবানীকে ওয়াজিব মনে করবে- এই ভয়ে আবূ বকর ও ওমর রা. কুরবানী দেননি! এমনকি সমসাময়িক কালের কিছু কিছু কিতাবেও সহীহ সূত্রে বর্ণনার দাবি করা হয়, আবূ বকর ও ওমর রা. কুরবানী দেননি এই ভয়ে যে, লোকেরা মনে করবে তা ওয়াজিব।
কিন্তু আসলেই কি এই বর্ণনা সহীহ সূত্রে প্রমাণিত ও গ্রহণযোগ্য? বা এই বর্ণনার সঠিক ব্যাখ্যাই বা কী? আমাদের দৃষ্টিতে এ বিষয়ে কোনো তাহকীক পরিলক্ষিত হয়নি। ইনশাআল্লাহ, আজকের প্রবন্ধে এ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত হলেও কিছুটা বিস্তারিত আলোকপাত করবো। ওয়াল্লাহুল মুসতা'আান।
প্রথম কথা: বর্ণনাটি গ্রহণযোগ্য কিনা
উত্তর: এই বর্ণনাটি একাধিক কারণে অগ্রহণযোগ্য
১. মূলত এই বর্ণনাটি সহীহ সূত্রে প্রমাণিতই নয়; বরং এটি সম্পূর্ণ সনদ বিচ্ছিন্ন একটি কথা। এ কথা সর্বপ্রথম ইমাম শাফে'ঈ বলেছেন। তাঁর পূর্বে হুবহু এমন কথা আর কেউই বলেননি। আর তিনিও তা বলেছেন সনদ ছাড়া। তাঁর বক্তব্য হলো এই-
وَقَدْ بَلَغَنَا أَنَّ أَبَا بَكْرٍ وَعُمَرَ كَانَا لَا يُضَحِّيَانِ كَرَاهِيَةَ أَنْ يُقْتَدَى بِهِمَا لِيَظُنَّ مَنْ رَآهُمَا أَنَّهَا وَاجِبَةٌ
ইমাম বায়হাকীও নিজের গ্ৰন্থে ইমাম শাফে'ঈ থেকে তা-ই বর্ণনা করেন
قَالَ الشَّافِعِيُّ: وَقَدْ «بَلَغَنَا أَنَّ أَبَا بَكْرٍ الصِّدِّيقَ وَعُمَرَ كَانَا لَا يُضَحِّيَانِ كَرَاهِيَةَ أَنْ يُقْتَدَى بِهِمَا، فيَظُنَّ مَنْ رَآهُمَا أَنَّهَا وَاجِبَةٌ»
অনুবাদ: শাফে'ঈ বলেন, আমাদের কাছে পৌঁছেছে যে, আবূ বকর ও ওমর রা. কুরবানী দেননি এ বিষয়টির অপছন্দতার কারণে যে, লোকেরা তাদের অনুসরণ করবে। কেননা, তারা মনে করবে, আবূ বকর ও ওমরের রায় হলো তা ওয়াজিব। [আল-উম্ম: ২/২৩৬]
কিন্তু ইমাম শাফে'ঈ রহ. এর কোনো সনদই উল্লেখ করেননি বা করতে পারেননি। কাদের মাধ্যমে তিনি এ খবর পেয়েছেন বা কে তাঁকে এ খবর জানিয়েছে, তারও কোনো হদিস নেই।
২. তাঁর এই বক্তব্যটি সহীহ সূত্রে আসা বর্ণনাসমূহের বিপরীত। সহীহ সূত্রে কেবল এতটুকু এসেছে যে, আবূ বকর ও ওমর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু (এক/দুই বছর) কুরবানি দেননি। কিন্তু কেন কুরবানী দেননি, অর্থাৎ লোকেরা কুরবানীকে ওয়াজিব মনে করবে- সে ভয়ে নাকি অন্য কিছু- সহীহ সূত্রে এমন কোনো কথা বিধৃত হয়নি। ইমাম বায়হাকী বর্ণনা করেন-
أَخْبَرَنَا أَبُو عَبْدِ اللَّهِ الْحَافِظُ، أَخْبَرَنِي مُحَمَّدُ بْنُ أَحْمَدَ بْنِ بَالَوَيْهِ، حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ غَالِبٍ، حَدَّثَنَا مُسْلِمُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، عَنْ سَعِيدِ بْنِ مَسْرُوقٍ، عَنِ الشَّعْبِيِّ، عَنْ أَبِي سَرِيحَةَ قَالَ: «أَدْرَكْتُ أَبَا بَكْرٍ وَعُمَرَ، وَكَانَا لِي جَارَيْنِ وَكَانَا لَا يُضَحِّيَانِ»
অনুবাদ: আবী সারীহাহ রা. থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, আবূ বকর ও ওমর আমার প্রতিবেশী ছিলেন। আমি আবূ বকর ও ওমরকে পেয়েছি যে, তাঁরা কুরবানী করেননি। [মারেফাতুস সুনান: ১৪/১৬]
ব্যস এতটুকুই। মূল বর্ণনাতে এর বেশি কিছু নেই। ইমাম বায়হাকী তাঁর সুনানেও বর্ণনা করেন-
أَخْبَرَنَا أَبُو الْحُسَيْنِ بْنُ بِشْرَانَ، أَنَا أَبُو الْحَسَنِ الْمِصْرِيُّ، نَا ابْنُ أَبِي مَرْيَمَ، نَا الْفِرْيَابِيُّ، ثَنَا سُفْيَانُ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ مُطَرِّفٍ، وَإِسْمَاعِيلَ، عَنِ الشَّعْبِيِّ، عَنْ أَبِي سَرِيحَةَ يَعْنِي حُذَيْفَةَ بْنَ أَسِيدٍ الْغِفَارِيَّ، قَالَ: «أَدْرَكْتُ أَبَا بَكْرٍ، أَوْ رَأَيْتُ أَبَا بَكْرٍ وَعُمَرَ لَا يُضَحِّيَانِ.
অনুবাদ: আবী সারীহাহ রা. থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, আমি আবূ বকরকে পেয়েছি বা আবূ বকর ও ওমরকে দেখেছি যে, তাঁরা কুরবানী দেননি। [সুনানুল কুবরা: ১৯/২৬৪, সুনানুস সাগীর: ২/২২২]
একইভাবে ইমাম ইবনে কাসীরও বর্ণনা করেন-
أنا أبو عبد الله الحافظ، أخبرني محمد بن أحمد بن بَالُويه، ثنا محمد بن غالب، ثنا مسلم بن إبراهيم، ثنا شعبة، عن سعيد بن مسروق، عن الشَّعبي، عن أبي سَرِيحة قال: أدركتُ أبا بكرٍ وعمرَ وكانا لي جَارَيْن، وكانا لا يُضحِّيان.وهذا إسناد صحيح
অনুবাদ: আবী সারীহাহ রা. থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, আবূ বকর ও ওমর আমার প্রতিবেশী ছিলেন। আমি আবূ বকর ও ওমরকে পেয়েছি যে, তাঁরা কুরবানী দেননি। এই বর্ণনার সনদ সহীহ। [মুসনাদুল ফারূক— ইবনে কাসীর: ১/৫৩৭]
এই হলো মূল বর্ণনা। মূল বর্ণনায় কেবল কুরবানী না দেওয়ার বিষয়টি এসেছে। এর বেশি কিছু, অর্থাৎ ‘লোকেরা কুরবানীকে ওয়াজিব মনে করার ভয়ে তাঁরা কুরবানী দেননি' এমন কিছু বর্ণিত হয়নি। এটা মূলত ইমাম শাফে'ঈর নিজস্ব বক্তব্য বা ব্যাখা। আর এ কথা কেবল আমার দাবি নয়, খোদ ইমাম বায়হাকী ও অন্যান্য ইমামগণেরও দাবি এটি! বায়হাকী তাঁর সুনানুস সাগীর-এ উপরিউক্ত বর্ণনা উল্লেখ করে বলেন-
قَالَ الشَّافِعِيُّ: يَعْنِي فَيَظُنُّ مَنْ رَآهُمَا أَنَّهَا وَاجِبَةٌ
শাফে'ঈ এর ব্যাখ্যায় বলেন- ‘কারণ, লোকেরা ধারণা করতে পারে যে, তাঁদের মতে কুরবানী ওয়াজিব। [সুনানুস সাগীর: ২/২২২, বর্ণনা নং: ১৮১৪]
বায়হাকী ও অন্যরা না বললেও এটিই নিরন্তর সত্য যে ‘লোকেরা ওয়াজিব মনে করবে’ এই অংশটুকু ইমাম শাফে'ঈর নিজস্ব সংযোজন। কারণ, এই হাদীসটি যত ‘মতনেই’ বর্ণিত হয়েছে, কোনো মতনেই ‘লোকেরা ওয়াজিব মনে করবে’ এই বাড়তি অংশটুকু নেই। কেবল ইমাম শাফে'ঈর বক্তব্যেই এই কথাটি পাওয়া যায়।
৩. হ্যাঁ, কোনো কোনো বর্ণনায় মূল হাদীসের সাথে আরো একটু বাড়তি কথা আছে। ইমাম বায়হাকী তা হাদীসের শেষাংশে ও অন্যত্র আলাদা আলাদাভাবে উল্লেখ করেছেন। তা হলো-
فِي بَعْضِ حَدِيثِهِمْ: كَرَاهِيَةَ أَنْ يُقْتَدَىَ بِهِمَا»
অর্থাৎ কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে- (তাঁরা কুরবানী ছেড়ে দিয়েছেন,) এ বিষয়টির অপছন্দতার কারণে যে, লোকেরা এ বিষয়ে তাঁদের অনুসরণ করবে। [মারেফাতুস সুনান: ১৪/১৬, সুনানুল কুবরা: ১৯/২৬৪, সুনানুস সাগীর: ২/২২২]
প্রথমত: এ বর্ণনাতেও ‘লোকেরা ওয়াজিব মনে করবে' এ বিষয়টি নেই; বরং বলা হয়েছে, ‘লোকেরা এ বিষয়ে তাদের অনুসরণ শুরু করে দেবে’। দ্বিতীয়ত: এই বাড়তি অংশটি মূল বর্ণনায় নেই; এটিও অন্যদের সংযোজনমাত্র।
আর যদি সঠিক ধরেও নিই; তবুও ইমাম শাফে'ঈর কথা এ কথার ব্যাখ্যা হতে পারে না। বরং এটি শাফে'ঈর বক্তব্যের রদ। কারণ, ‘লোকেরা কুরবানীকে ওয়াজিব মনে করবে’ আর ‘লোকেরা কুরবানী বিষয়ে তাদের অনুসরণ শুরু করে দেবে’ এ দুটো এক কথা নয়, বরং বিপরীতধর্মী কথা নৌ। কেননা, দাবি অনুযায়ী কুরবানী যদি সুন্নতে মুআক্কাদা হয়, তাহলে সুন্নতে মুআক্কাদার ক্ষেত্রে তাদের অনুসরণ করলে ক্ষতি কী? কেন সুন্নতে মুআক্কাদার ক্ষেত্রে তাদের অনুসরণের ভয়ে তাঁরা নিজেদের জন্য সুন্নতে মুআক্কাদা ছেড়ে দেবেন! মানুষের ব্যাপক অনুসরণের ভয়ে কি সুন্নতে মুআক্কাদা ছেড়ে দেওয়া জায়েয হবে আদৌ? বলাবাহুল্য, রাসূলের সুন্নাত ব্যাপক অনুসৃত হবে, এটা তো আরো খুশীর কথা!
তাছাড়া ‘মুআক্কাদা' মানেই তো অধিক গুরুত্বপূর্ণ বা ‘তাকীদপূর্ণ’ আমল। তাহলে মানুষ কুরবানীকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বা ‘তাকীদপূর্ণ’ আমল মনে করলে সমস্যা কোথায়? আর অনেকের নিকট তো সুন্নতে মুআক্কাদা ও ওয়াজিব সমপর্যায়ের। উভয়টাই প্রায় সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাহলে তাঁরা সুন্নতে মুআক্কাদা ছেড়ে দিয়ে কি মানুষকে এটা শিখিয়েছেন যে, সুন্নতে মুআক্কাদা ছেড়েও দেওয়া যায়?
মোটকথা, সুন্নতে মুআক্কাদার ক্ষেত্রে তো চাইলে তাঁদের অনুসরণ করাই যায়; এ জন্য তো তাঁদের নিজেদের কুরবানী ছেড়ে দিতে হবে না। আর সুন্নতে মুআক্কাদা তো এমন আমল নয়, যাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করলে বিদ'আতে পরিণত হতে পারে!
তাছাড়া এ বর্ণনাতে এসেছে- أَنْ يُقْتَدَىَ بِهِمَا; অর্থাৎ ‘তাঁরা কুরবানী ছেড়ে দিয়েছিলেন এ বিষয়ে তাঁদের উভয়ের অনুসরণের ভয়ে’। কিন্তু আমরা জানি, কুরবানী করা আবূ বকর ও ওমর রা. এর অনুসরণ নয়; বরং রাসূলের অনুসরণ। রাসূল সা. কখনো কুরবানী পরিত্যাগ করেননি। অতএব, এ বিষয়ে মানুষজন তাদের উভয়ের অনুসরণের মুখাপেক্ষী নয়, বরং রাসূলের অনুসরণই তাদের জন্য যথেষ্ট। যদি বলা হয়, ছেড়ে না দেওয়ার ব্যাপারে মানুষেরা তাঁদের অনুসরণ করবে; তাহলে বলবো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তো কখনো কুরবানী ছেড়ে দেননি।
আর তাঁদের অনুসরণে কোনো আমল করা তাঁদের অপছন্দের কারণ তখনই হবে, যখন আমলটি শরী'আহ কর্তৃক সুন্নতে মুআক্কাদা বা ওয়াজিব না হবে; বরং তাঁদের নিজস্ব আমল বা নফল হবে।
সুতরাং, এখানে তাদের অনুসরণের কথা বলে এটাই বোঝানো হয়েছে যে, এটি সুন্নতে মুআক্কাদা বা ওয়াজিব কুরবানী নয়, বরং তাঁদের নিজস্ব আমল বা নফল কুরবানী। কেননা, নফল কুরবানীর ক্ষেত্রেই তাঁদের অনুসরণ সম্ভব। সুন্নতে মুআক্কাদা হলে তো রাসুলেরই অনুসরণ হবে।
অতএব, আকল-নাকল ও দলীল-প্রমাণের ভিত্তিতে এ কথা সুপ্রমাণিত যে, ‘লোকেরা এ বিষয়ে তাদের অনুসরণ শুরু করে দেবে’ এমন কথা সুন্নতে মুআক্কাদার ক্ষেত্রে কখনোই প্রযোজ্য হতে পারে না, বরং এমন কথা কেবল নফলের ক্ষেত্রেই বলা সম্ভব হতে পারে।
সুতরাং, উপরিউক্ত বক্তব্যের ব্যাখ্যায় ইমাম শাফে'ঈর ‘লোকেরা ওয়াজিব ধারণা করবে’- এই ব্যাখ্যা করা একেবারেই সঠিক নয়।
৪. আবূ বকর ও ওমর রা. কি ওয়াজিব কুরবানী ছেড়ে দিয়েছিলেন?
ইতোপূর্বে আমরা দাবি করেছিলাম, তাঁরা সুন্নতে মুআক্কাদা নয়; বরং নফল কুরবানীই ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু আমরা যথাসময়ের অপেক্ষায় এর পক্ষে কোনো দলীল উপস্থাপন করিনি। ইনশাআল্লাহ, এ পর্যায়ে আমরা দলীল-প্রমাণসহই সাবেত করে দেবো যে, আবূ বকর ও ওমর রা. মূলত নফল কুরবানীই ছেড়ে দিয়েছিলেন।
এ বিষয়ে হাফেয যাহাবী রহ. স্বীয় গ্রন্থে সবচেয়ে বিশুদ্ধ বর্ণনাটি উল্লেখ করেন। মজার ব্যাপার হলো খোদ ইমাম বায়হাকীও এই বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। দেখুন- সুনানুল কুবরা: ১৯/২৬৪। কিন্তু বিরোধীরা এই বর্ণনা ভুলেও উল্লেখ করেন না। বর্ণনাটি হলো এই—
عن حُذَيفَةَ بنِ أَسِيدٍ قال: لَقَد رأيتُ أبا بكرٍ و عُمَرَ وما يُضَحِّيانِ عن أهلِهِما؛ خَشيَةَ أن يُستَنَّ بهِما، فلَمّا جِئتُ بَلَدَكُم هذا حَمَلَنِى أهلِى على الجَفاءِ بَعدَ ما عَلِمتُ السُّنَّةَ
অনুবাদ: হুযায়ফাহ বিন আসীদ রা. থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, আমি আবূ বকর ও ওমরকে দেখেছি যে তাঁরা নিজেদের ‘আহাল' (পরিবার) এর পক্ষ থেকে কুরবানী দেননি, এই ভয়ে যে লোকেরা এ (নফল) বিষয়ে তাঁদের অনুসরণ শুরু করে দেবে। কিন্তু যখন আমি তোমাদের এই শহরে আসলাম, সুন্নাহ জানার পর আমার স্ত্রী আমার ওপর বিষয়টি চাপিয়ে দিলো। [আল-মুহাযযাব— যাহাবী: ৮/৩৮৪৬]
উল্লেখ্য: সর্বজনবিদিত কথা যে, পরিবার বা স্ত্রীর পক্ষ থেকে কুরবানী দেওয়া নফল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও কখনো কখনো নিজের ‘আহাল'গণের পক্ষ থেকে নফল কুরবানী আদায় করতেন।
অতএব, হাদীসের আলোকেই সুপ্রমাণিত যে, তাঁরা যে কুরবানী ছেড়ে দিয়েছিলেন তা স্রেফ নফল কুরবানীই ছিলো। ওয়াজিব বা সুন্নতে মুআক্কাদা নয়। কিন্তু মানুষজন এই নফল কুরবানীর ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে তাঁদের অনুসরণ শুরু করে দেবে- এই ভয়ে তাঁরা মাঝে মধ্যে তাঁরা নিজেদের নফল কুরবানী ছেড়ে দিতেন। আর সেই নফল কুরবানী হলো নিজ ‘আহাল' বা পরিবারের পক্ষ থেকে কুরবানী করা। অর্থাৎ তাঁরা মাঝে মধ্যে নিজ ‘আহাল’ এর পক্ষ থেকে কুরবানী দিতেন না, যেন মানুষ পরিবারের পক্ষ থেকে এই নফল কুরবানীকে নিজেদের জন্য আবশ্যক করে না নেয় বা এটিকে আবূ বকর ও ওমরের সুন্নত মনে না করে।
সুতরাং, এতোসব দলীল-প্রমাণের আলোকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো যে, ‘সুন্নতে মুআক্কাদাকে ওয়াজিব মনে করা’র বিষয়টি ইমাম শাফে'ঈর একান্ত নিজস্ব বক্তব্য। তিনি ছাড়া ‘ওয়াজিব মনে করা’র বিষয়টি আর কেউই বলেননি। আর তাঁর এই বক্তব্যটি আরো একাধিক কারণেও অগ্রহণযোগ্য; সামনে তা প্রমাণিত হবে।
৫. সনদের সাথে সাথে এই বর্ণনার মতনও অসংলগ্ন। কারণ, কুরবানী ওয়াজিব না, তা বোঝানোর জন্য একে একে দু'জন মহান খলীফা ও সাহাবী কুরবানীর মতো এক মহান গুরুত্বপূর্ণ শর'ঈ বিধান তরক করবেন- তা অযৌক্তিক। কুরবানী ওয়াজিব নয়- এ ব্যাপারে মৌখিক কিংবা লিখিত হুকুম জারি করে দিলেই তো পারতেন। এতে করে বিষয়টি ব্যাপক আকারে প্রচারিত হয়ে যেতো। অথচ তা না করে কুরবানী তরক করে বোঝাচ্ছেন যে, কুরবানী ওয়াজিব নয়। তাও একজন নয়, একে একে দু'জন সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবী! কেন, একজন সাহাবীর আমলের ওপর কি বাকীদের ভরসা ছিলো না?
৬. ঘটনা যদি বাস্তবিকই এমন হতো যে, তাঁরা প্রচলিত কুরবানীকে ওয়াজিব মনে করার ভয়ে ছেড়ে দিয়েছিলেন, তাহলে আশা করা যায়, কুরবানী ওয়াজিব নাকি সুন্নাত- এই বিষয়ে কোনো ইখতিলাফই সৃষ্টি হতো না। কারণ, এ বিষয়টি সাহাবী যুগ থেকেই ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে যেতো যে, কুরবানী ওয়াজিব নয় বরং সুন্নাত। এবং সহাবীদ্বয়ের এই সুন্নতে মুআক্কাদা কুরবানীকে ‘কুরবানী' করার বিষয়টি সুপ্রসিদ্ধ হাদীসগ্রন্ত্র ও সুনির্ভরযোগ্য ইতিহাসগ্ৰন্থসমূহে আসতো, অথচ সুপ্রসিদ্ধ হাদীসগ্রন্ত্র ও ইতিহাসগ্ৰন্থসমূহে এই ঐতিহাসিক কেচ্ছাটি দেখতে পাওয়া যায় না।
সারাংশ:
১. জনসাধারণ কুরবানীকে ওয়াজিব মনে করবে- এই ভয়ে আবূ বকর ও ওমর রা. কুরবানী দেননি! এই বর্ণনা একাধিক কারণে গ্রহণযোগ্য নয়। উপরে বিস্তারিত আলোচনা অতিবাহিত হয়েছে।
২. মূল বর্ণনায় কেবল এতটুকুই এসেছে যে- সাহাবীদ্বয় কখনো কখনো কুরবানী দেননি। কেন দেননি তা বিধৃত হয়নি। তবে এর সঠিক উত্তর হলো, খুব সম্ভব কখনো কখনো তাঁদের কুরবানী দেওয়ার মতো সামর্থ্য থাকতো না। যেমন আমরাও কখনো কুরবানি দিই আবার কখনো দিই না, সামর্থ্য না থাকার কারণে।
৩. যে বর্ণনায় এসেছে, كَرَاهِيَةَ أَنْ يُقْتَدَىَ بِهِمَا; (অর্থাৎ এ বিষয়ে তাঁদের অনুসরণ শুরু করা হবে- এটি তাঁদের না-পছন্দ হওয়ার কারণে।) প্রথমত: এ কথাটি মূল বর্ণনায় নেই, বরং এটি অন্যদের সংযোজন। দ্বিতীয়ত: এ বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত হয়, তা ছিলো নফল কুরবানী। কারণ, সুন্নতে মুআক্কাদার ক্ষেত্রে কারো অনুসরণ করলে কোনো ক্ষতি নেই। কারণ, তা মূলত রাসূলেরই অনুসরণ।
৪. হাফেয যাহাবী ও ইমাম বায়হাকীর পরবর্তীর বর্ণনা থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো, তা ছিলো পরিবারের পক্ষ থেকে নফল কুরবানী।
৫. অতএব, নফল কুরবানী ছেড়ে দেওয়ার কারণে ‘ওয়াজিব কুরবানীকে সুন্নতে মুআক্কাদা’ বানিয়ে দেওয়া অনেক বড় ইলমী পদস্খলন।
কওমী মাদ্রাসার ছাত্ররা সাধারণত যে ৬টি কারণে লা-মাযহাবী মতবাদ গ্রহণ করে
১. অল্প বুঝ ও নাকেসে ইলম
কওমী মাদ্রাসাতে পড়ুয়া এমন কিছু ছাত্র আছে, যাদের বুঝশক্তি হয় অতি অল্প। ইলম হয় একেবারেই সীমিত। চিন্তার জগৎ অতি ক্ষুদ্র। এরা লা-মাযহাবদের ভুল ও জালিয়াতিপূর্ণ লেখালেখি দেখে প্রভাবিত হয়ে পড়ে। কারণ, এরা লা-মাযহাবদের ভুল ও জালিয়াতিগুলো ধরতে পারে না। এরা মনে করে, তারা তো মিথ্যা বলছে না, যা বলছে কুরআন-হাদীস থেকেই বলছে। প্রথম প্রথম এরা লা-মাযহাবদের অল্পস্বল্প বিরোধিতা করলেও মোক্ষম জবাব না দিতে পেরে একটা সময় সয়ে যায়। ধীরে ধীরে তাদেরকে হকপন্থী ধারণা করতেও শুরু করে। ফলে তারা লা-মাযহাবদের কিছু কিছু জিনিস গ্রহণ করে নেয়। কখনো কখনো গ্রহণ না করলেও সঠিক বলে মনে করে। এবং নির্দিষ্ট কোন বিষয়ে তাদের পক্ষ হয়ে আলোচনাও তোলে। অতঃপর নিজ ঘরানার আলিমগণ যখন তাদেরকে এ সকল বিষয়ে তিরস্কার করে, তখন তারা স্বভাবতই লা-মাযহাবদের পক্ষ নিয়ে জবাব দিতে থাকে বা দেওয়ার চেষ্টা করে। এরপর তাদের পক্ষ হয়ে তর্ক করতে করতে ধীরে ধীরে নিজেদেরকেও লা-মাযহাবী মনে করতে শুরু করে। একটা সময় হানাফীদের পক্ষ থেকে অধিক আঘাত পেয়ে রাগবশত পুরোপুরিভাবে লা-মাযহাবী হয়ে যায়।
২. লৌকিকতা ও অহংকারবশত
এরা নিজেকে অন্যদের চেয়ে আলাদা বোঝানোর জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে জমহূর উলামায়ে কেরামের বিপরীতে গিয়ে কিছু শায মতামত গ্রহণ করে এবং এর পক্ষে বিভিন্ন দলিলাদি উপস্থাপন করে থাকে; যেন মানুষ তাদেরকে অন্যদের বেশি ইলমদার মনে করে। এসবের ক্ষেত্রে তারা লা-মাযহাবদেরও সাহায্য নিয়ে থাকে। অর্থাৎ লা-মাযহাবরা যে সমস্ত দলিল উপস্থাপন করে এরাও ওই দলীলগুলো উপস্থাপন করে। অতঃপর স্বজাতির পক্ষ থেকে “তুই তো লা-মাযহাবী হয়ে গেছোস” বলে গালি খায় বা তিরষ্কৃত হয়। অতঃপর স্বজাতির ওপর জিদবশত প্রথমোক্ত দলের মতো পুরোপুরি লা-মাযহাবী হয়ে পড়ে! পরবর্তীতে এরা লা-মাযহাবীদের শায়েখ হওয়ারও সুযোগ পেয়ে যায়।
৩. ওভারস্মার্টনেস ও মুরুব্বিহীনতা
এদের কথা কী আর বলবো! এরা হচ্ছে নাস্তিকের মত। নাস্তিকরা যেভাবে ওভার স্মার্টনেস দেখাতে গিয়ে ইসলাম ত্যাগ করে; একইভাবে এরাও ওভারস্মার্ট সাজতে গিয়ে মাযহাব ত্যাগ করে। নাস্তিকরা মনে করে ইসলাম বিষয়টা সেকেলে আর এরা মনে করে মাযহাব বিষয়টা সেকেলে। দ্বিতীয় দলের মতো এদের ভিতরেও কিছুটা অহংকার কাজ করে। এরা ভাবে, এত পড়ালেখা করে আমি কম বুঝি নাকি? সাধারণত এদের কোন মুরুব্বী থাকে না। এরা নিজেদেরকেই মুরুব্বী মনে করে। এরা আবার নিজেদেরকে মুখলিসও দাবী করে।
৪. নফস বা প্রবৃত্তিপূজা
এরা মাযহাব ত্যাগ করে নিজের প্রবৃত্তি মেটাতে। কারণ, মাযহাবের গণ্ডির মধ্যে থাকলে এরা নিজেদের মনমতো কিছু করতে পারে না। যেমন হানাফী মাযহাবে এমন অনেক বিষয় হারাম যা লা-মাযহাবীদের কাছে হালাল। কিন্তু তারা ওই হারাম কাজটি করতে চায় অথচ হারাম হওয়ার কারণে সরাসরি করতে পারে না। এরপর দেখে যে, এই একই কাজটি লা-মাযহাবীর নিকট হালাল। কিন্তু হানাফী হওয়ার কারণে তারা এটি করতে পারছে না। এমন বহু হারাম ও মাকরূহাত বিষয় আছে যা এরা হালাল করতে চায়। এ কারণে এরা মাযহাবের গণ্ডি ভিতর থাকতে চায় না। অতঃপর কুরআন ও সহীহ হাদিস মানার দোহাই দিয়ে এরাও লা-মাযহাবী হয়ে যায়; যেন নিজেদের সুবিধামতো ইমামগণের বক্তব্য গ্রহণ করতে পারে।
৫. কথিত উদারমনা ও মুক্তমনা ‘ভাব’ দেখাতে
এরা নিজেদেরকে ইসলামী মুক্তমনা মনে করে। এদের ধারণা, মাযহাব মানলেও সমস্যা নেই না মানলেও সমস্যা নেই। আকীদাহ ঠিক থাকলেই এবং কুরআন ও সহীহ হাদীস মানলেই হলো। এরা পৃথিবীর সকল বাতিল ফিরকার সমালোচনা করলেও লা-মাযহাবদের সমালোচনা করে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে লা-মাযাবদের সমালোচনা করার মত এদের যোগ্যতাও থাকে না।
মৌলিকভাবে এরা নিজেদেরকে লা-মাযহাব দাবী করে না বরং নিজেদেরকে সাধারণত মাযহাবীই দাবি করে। কিন্তু এদের সকল কাজকর্ম লা-মাযহাবদেরই মতো। এরা প্রয়োজন অনুসারে মাযহাবী হয়, আবার প্রয়োজন অনুসারে লা-মাযহাবী মতবাদও গ্রহণ করে। তবে এদের অধিকাংশ কথাবার্তা লা-মাযহাবীদের পক্ষেই থাকে। এরা মুখে উদারতা দেখালেও ভিতরে ভিতরে লা-মাযহাবদের হয়ে কাজ করে।
৬. ‘শত্রুর শত্রু বন্ধু’ নীতি
অতি জযবাতি ও আকাবির-বিদ্বেষী কিছু বেয়াদব ও উগ্ৰ টাইপের তরুণ আছে; এরা হর-হামেশা আকাবিরগণের সমালোচনা করে থাকে। এ কারণে এরা স্বজাতির কাছে ব্যাপকহারে তিরষ্কৃত হয়। এরা সবসময় জ/ঙ্গি মানসিকতা নিয়ে থাকে এবং নিজেদেরকে অনেক বড় ঈমানদার মনে করে অথচ এদের ঈমান একেবারেই দুর্বল এবং তা সোশ্যাল মিডিয়াতেই সীমাবদ্ধ। এদের হৃদয় অতি নোংরা। হিংসা ও অহংকারে ভরপুর। স্বজাতির সাথে এদের শত্রুতা চরম পর্যায়ের। অতঃপর “শত্রুর শত্রু বন্ধু নীতি”র অনুসরণে স্বজাতির শত্রু লা-মাযহাবীদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে। বর্তমানে কওমী মাদ্রাসার ছাত্রদের লা-মাযহাবী হওয়ার পিছনে এই কারণটিই সবচেয়ে বেশি।
গতকাল এ বিষয়ে আমি একটি পোস্ট করেছিলাম এবং এক ভাইয়ের মন্তব্যের জবাবে আমিও একটি মন্তব্য করেছিলাম। যথাক্রমে হুবহু তুলে ধরা হলো-
পোস্ট: “কওমী মাদ্রাসার উগ্ৰ ও বেয়াদব টাইপের পোলাপানগুলা নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব করে লা-মাযহাবদের প্রতি ধাবিত হয়ে যায়।
এরা পুরোপুরি বা আংশিকভাবে আকাবির-বিদ্বেষী হয়ে থাকে। আকাবিরদের নাম এরা শুনতেই পারে না। ফলে তারা নিজেদের ঘরের লোকদের কাছে অবহেলিত ও অপমানিত হয়ে এবং নিজের পক্ষে কাউকে খুঁজে না পেয়ে অবশেষে লা-মাযহাবীদের প্রতি ধাবিত হয়ে যায়। আগে বলতো আকাবির না মানলে সমস্যা কোথায়? এখন বলে, মাযহাব না মানলে সমস্যা কোথায়?”
কমেন্ট: (এক ভাই উক্ত পোস্টের মন্তব্যের ঘরে এর উদাহরণ চেয়েছেন; উদাহরণ দিতে গিয়ে লিখেছিলাম)
ক. কওমী মাদ্রাসার এমন বহু ফারেগ দেখি থাকি, যারা সারাক্ষণ আকাবির ও নিজের উস্তায এবং অন্যান্য বড় বড় আলিমগণের দোষত্রুটি খুঁজে বেড়ায়। তাদের চোখে আর কোনো ভ্রান্ত ফেরকার ভুলত্রুটি চোখে পড়ে না। অন্যরা যতই ইসলাম বিদ্বেষী বক্তব্য দিক, তাতে তাদের কিছু যায় আসে না। কেবল নিজের উস্তায ও মুরুব্বিদের পিছনেই তার সময় ব্যয়িত হয়। এতে করে বাকি মুআদ্দব ছাত্রগণ তাদের এসবের বিরোধিতা করে তাদের শত্রুতে পরিণত হয়। অতঃপর ‘শত্রুর শত্রু বন্ধু নীতি’র অনুসরণে তারা শত্রুর শত্রু (লা-মাযহাবী)-কে বন্ধু রূপেই গ্রহণ করে।
খ. বিশেষ কোনো ব্যক্তির সাথে শত্রুতার কারণেও কেউ কেউ এমনটা করে থাকে। ধরুন, আমি সবসময় লা-মাযহাবী ফিতনা সম্পর্কে লিখি। এখন আমার সাথে আমারই আরেক ক্লাসমেট বা বন্ধুর কোনো বিষয়ে দ্বন্দ্ব হয়েছে। এরপর থেকে আমি তার শত্রু হয়ে গেলাম। স্বাভাবিকভাবেই এখন থেকে সে আমার সকল কাজকর্মের বিরোধিতা করবে।
এখন আমি যেহেতু লা-মাযহাবী ফিতনা সম্পর্কে লিখি, সে অটোমেটিকভাবে আমার এসব লেখালেখির বিরোধিতা করবে। কারণ, যেভাবেই হোক আমার বিরোধিতা তো তাকে করতেই হবে। ফলে ‘শত্রুর শত্রু বন্ধু নীতি’র অনুসরণে সে শত্রুর শত্রু লা-মাযহাবীকে বন্ধু রূপেই গ্রহণ করে। পুরোপুরি গ্রহণ না করলেও ওদের প্রতি একটা সফট কর্নার তৈরি হয়।
বিষয়টি সহজে বোঝার জন্য একটা উদাহরণ দিই-
আমি লুবাব হাসান। ফেসবুক খুলেছিই কেবল লা-মাযহাবদের জালিয়াতি ও ফিতনা সম্পর্কে লেখালেখি ও সতর্ক করার জন্য। আমার কাজই হচ্ছে সারাদিন তাদের বিরুদ্ধে লেখালেখি করা। আমার টাইমলাইনে হর-হামেশা লা-মাযহাব লা-মাযহাব জিকির থাকে। আমি লা-মাযহাব ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে সাধারণত লিখি না। বলা যায় এটিই আমার পেশা।
এখন মনে করুন, আমার লিস্টে কোনো এক উগ্রপন্থী শায়েখের কিছু অন্ধ ভক্ত আছে। ঘটনাক্রমে আমি ওই উগ্রপন্থী শায়েখের বিরুদ্ধে একটা পোস্ট করলাম। এখন ওই উগ্রপন্থী শায়খের অন্ধ ভক্তরা তো অবশ্যই আমার উপর ক্ষেপে যাবে। তারা দেখবে, আমি সারাক্ষণ কী করি! আমার কাজ কী! যখন তারা দেখবে, আমার কাজ হচ্ছে লা-মাযহাবদের বিরোধিতা করা, তাদের বিরুদ্ধে লেখালেখি করা। তখন তারা অটোমেটিকভাবেই লা-মাযহাবদের বিরুদ্ধে লেখালেখি করাটাকে তুচ্ছ মনে করতে শুরু করবে! এবং বিষয়টিকে হেয়জ্ঞান করবে। মনের অজান্তেই লুবাবের বিরোধিতা করতে গিয়ে লা-মাযহাবদের প্রতি দয়া দেখাবে! অবচেতন মনে বলে উঠবে, লা-মাহাযবরা তো এত মারাত্মক কিছু না, এত বেশি তাদের বিরোধিতা করতে হবে কেন?
যাই হোক, লুবাব তাদের চরম শত্রু হয়ে গেলো। আর লুবাবের বিরোধিতা করতে করতেই লা-মাযহাবদের প্রতি তাদের একটা সফট কর্নার তৈরি হয়ে গেলো। মূলত ‘শত্রুর শত্রু বন্ধু নীতি’টি ব্যাপক; উদাহরণ দিয়ে শেষ করা যাবে না।
উল্লেখ্য: উপরিউক্ত কারণগুলো কেবল কওমী মাদ্রাসার ছাত্রদের জন্যই সীমাবদ্ধ নয়; বরং সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তবে এখানে কিছু বিষয় আছে এক্সট্রা- যা কেবল কওমী মাদ্রাসার ছাত্রদের জন্যই খাস।
জুতার ইবাদত: ইমাম আবু হানিফার নামে অপবাদ
প্রায়শই আমরা দেখতে পাই, ইমাম আবূ হানীফাহ রহ. এর অন্ধ বিদ্বেষীরা তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপবাদ রটিয়ে বেড়ায়। তেমনি একটি অপবাদ হচ্ছে, তিনি নাকি বলেছিলেন, কেউ যদি আল্লাহর নৈকট লাভের উদ্দেশ্যে জুতার ইবাদত করে তবে এতে কোন সমস্যা নেই। কিন্তুআদৌ কি তিনি এমন কথা বলেছিলেন ? আজ আমরা তার নামে প্রচারিত এই বক্তব্যের বাস্তবতা তুলে ধরবো ইনশাআল্লাহ।
এখানে আরো একটি বড় প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়, তা হলো ইয়াহইয়া বিন হামজা ইমাম আবু হানিফার না ছাত্র, না সহচর, না তার এলাকায় বসবাস করতেন- বরং তিনি ইমাম আবু হানিফা থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে শামে বসবাস করতেন। তাহলে তিনি এত দূরে থেকে এমন গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি কিভাবে পেলেন যা আর কেউই পেল না, এমনকি তার সার্বক্ষণিক সাথী-সঙ্গীরাও না। অথচ তাঁর আশেপাশে হাজার হাজার ছাত্র ও মানুষের আনাগোনা ছিল। তাহলে যে কথা ইয়াহইয়া বিন হামজা ছাড়া আর কেউ শুনেনি, এমন একটি বিচ্ছিন্ন ও একক বক্তব্য কিভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে?
২. তিনি এত বড় কুফরিতে নিমজ্জিত অথচ এই কুফুরীর বিষয়টি বিন্দুমাত্র প্রচারই পাইনি। অথচ ইমাম আবু হানিফা ছিলেন তুমুল জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব, তাঁর একটি কথা জবান থেকে বেরোনোমাত্র মুহুর্তেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়তো। তো এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা কেউ ভুলেও কেন বর্ণনা করলো না, কেনই বা এ নিয়ে সামান্যতম মাতামাতিও হলো না। আর ইতিহাসের কিতাবাদীতে এর ন্যূনতম আলোচনাও বা কেন নেই। যদি তার এমন কথা বলাটা সত্য হবে তাহলে চারদিকে ছড়িয়ে না পড়াটা কিভাবে সম্ভব! যেখানে তথাকথিত কুফর “আনাল হক” এর দায়ে হুসাইন বিন মানসুর হাল্লাজ এর মৃত্যুদণ্ড হয় সেখানে ইমাম আবু হানিফার মত আলোচিত ব্যক্তি কিভাবে বেঁচে যান কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়াই!তিনি যদি সত্যিই এমন কথা বলে থাকতেন নিশ্চয়ই এতে তৎকালীন যুগে বিশাল বড় বিতর্ক তৈরি হতো এবং এ বিষয়ে ইতিহাসের কিতাবাদী ভরপুর আলোচনা থাকতো। কিন্তু আমরা দেখতে পাই, ইতিহাসের কিতাবাদীতে এর কোন আলোচনাই নেই। একমাত্র তারীখে বাগদাদ এবং প্রায় অপরিচিত একটি কিতাবেই ইয়াহিয়া বিন হামজার উক্ত কথাটির উল্লেখ পাওয়া যায়।
৩. সবচেয়ে বড় কথা হলো, তার নামে প্রচারিত এই ঘটনাটিকে কোনো একজন গ্রহণযোগ্য আলেম/মুহাদ্দিস আমলেই নেননি। না এ ব্যাপারে তারা মুখ খুলেছেন, আর না এ ব্যাপারে তারা দু’কলম লিখেছেন। অথচ কুফরের বিরুদ্ধে তাদের কলম শত শত পৃষ্ঠা পাড়ি দিতো অনায়াসেই। এ ঘটনা যদি বাস্তবসম্মত হতো তাহলে নিশ্চয়ই আলেম/মুহাদ্দিসগণ ইমাম আবু হানিফার ব্যাপারে কুফুরীর হুকুম লাগাতে দ্বিধাবোধ করতেন না। যদি তিনি সত্যিই তা বলে থাকবেন তাহলে নিশ্চয়ই যুগে যুগে বড় বড় আলেমগণ এ ব্যাপারে চুপ থাকতেন না। অথচ দেখা যায় (তাদের কথা অনুযায়ী) তিনি এত বড় কুফরীতে লিপ্ত হওয়া সত্ত্বেও কেউ টু শব্দটি পর্যন্ত করেনি; উল্টো সবাই তাকে ইমাম ইমাম বলে মাথায় তুলে রেখেছিলেন। প্রত্যেক যুগের এমন কোন বড় ইমাম নেই যিনি ইমাম আবু হানিফার প্রশংসা করেননি! জামানার এমন কোন ফকিহ নেই যিনি ইমাম আবু হানিফার বক্তব্যের উদ্ধৃতি দেননি!
হানাফি ফিকহ ছাড়াও অন্যান্য মাযহাবের ফিকহের কিতাবাদীও ইমাম আবু হানিফার কথাবার্তায় ভরপুর! ইমাম ইবনে তাইমিয়ার কিতাবাদীতেও ইমাম আবু হানিফার বক্তব্যের ছড়াছড়ি।
হাফেজ যাহাবী ইমাম আবু হানিফার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তিনি স্বতন্ত্রভাবে ইমাম আবু হানিফা ও তার ছাত্রদের জীবনীও সংকলন করেন। ইমাম আবু হানিফার প্রশংসায নিন্দুকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, দিবস প্রমাণে দলীলের প্রয়োজন নেই। যে ব্যক্তি দিবস প্রমাণে দলিল খুঁজে সে মূর্খ বা তার কাছে সঠিক বলতে কিছুই নেই!অর্থাৎ তাঁর দৃষ্টিতে ইমাম আবু হানিফার গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণের জন্য কোন দলিলের প্রয়োজন নেই। তিনি দিবসের মতো নিজেই নিজের দলিল! [সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা: ৬/৪০৩]
ইবনে হাজার তো বলেই দিয়েছেন, ইমাম আবু হানিফা সমালোচনার সেতু পার করে ফেলেছেন, অতএব তার সমালোচনা করলে তার ব্যক্তিত্বে কোন প্রভাব পড়বে না। [আল-জাওহার ওয়াদ দুরার ফী তারজামাতি ইবনু হাজার: ২/৯৪৭; তাহযীবুত তাহযীব: ৫/৬৩১] হাফেজ মিযযী তো তার সমালোচনা উল্লেখ না করেই তৃপ্তি পান। এ ব্যাপারে হাফেজ যাহাবী বলেন, আমার শায়েখ ইমাম আবু হানিফার সমালোচনা উল্লেখ না করে কতই না উত্তম কাজ করেছেন! [তাযহীবু তাহযীবিল কামাল: ৯/২২৫] হাফিয ইবনু কাছীর ও জালাল উদ্দিন সুয়ূতী তো তাঁর সমালোচনার পরিবর্তে তাঁকে হাফিজুল হাদিস হিসেবেই আখ্যায়িত করেছেন। তাই তো তাঁরা তাঁদের ‘হাফিজুল হাদিস রাবীদের জীবনী গ্রন্থে’ তাঁর জীবনী এনে নিজেদের গ্রন্থগুলোকে অলংকৃত করেছেন। উপর্যুক্ত ইমামগণ ছাড়াও পরবর্তী কালের আহলে সুন্নাহ’র ইমামগণও তাঁর প্রশংসা ছাড়া কিছু উল্লেখই করেননি।
এ ব্যাপারে সালাফী শায়খ মুহাম্মদ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ বলেন,
.ولما ترجم الذهبي وابن كثير وغيرهما من مؤرخي أهل السنة للإمام أبي حنيفة رحمه الله لم يعرجوا على شيء مما يوجب القدح فيه ، وهذا من تمام العلم والورع ، وهو الواجب علينا تجاه علمائنا رحمهم الله تعالى ، وهو أقل ما يبذل رعايةً لحقهم وحرمتهم .
অর্থ: “হাফিয যাহাবী, হাফিয ইবনু কাছীরসহ পরবর্তী কালের আহলুস সুন্নাহ’র ইমামগণ ইমাম আবূ হানীফাহ রাহিমাহুল্লাহ এর জীবনী বর্ণনায় এমন কোনো কথা আলোচনা করেননি যা তাঁর শানকে ছোট করে। আর এটাই হচ্ছে পূর্ণ ইলম এবং তাকওয়ার পরিচায়ক। এটি আমাদের ইমামদের হক আদায়ে আমাদের জন্য ওয়াজিব। আর এটাই হবে তাঁদের প্রতি সম্মান জা