ইমাম আবূ হানীফাহ রহ. এর সমালোচনা ও জবাব

A+ A-

ইমাম আ'যম আবূ হানীফাহ রহ. এর ওপর কিতাব চুরির অপবাদ ও জবাব 


 


এক অবুঝ-অবোধ-নির্বোধ ভাই লিখেছে- “কিতাব চুরির শাস্তি কী ভাই?


 


نا عبد الرحمن أنا إبراهيم بن يعقوب الجوزجاني فيما كتب إلى [قال - 1] حدثنى اسحاق بن راهويه قال سمعت جريرا يقول قال محمد بن جابر اليمامى: سرق ابو حنيفة كتب حماد منى.


ইমাম ইসহাক্ব বিন রহাওয়াইহ বলেন জারিরকে বলতে শুনলাম সে বলল, মুহাম্মদ বিন জাবির আল ইয়ামামি বলেনঃ আবু হানিফা হাম্মাদের কিতাবসমূহ আমার থেকে চুরি করেছে।


 


[الرازي، ابن أبي حاتم، الجرح والتعديل لابن أبي حاتم، ٤٥٠/٨]


 


???? পর্যালোচনা


 


১. চোখ বন্ধ করেই বলে দেওয়া যায়, উপরিউক্ত ঘটনাটি সম্পূর্ণ জাল। কারণ, ইমাম আ'যম আবূ হানীফাহ রহ.-কে হাদীসের ক্ষেত্রে কেউ কেউ দুর্বল বললেও শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে কেউই তার তাকওয়া ও পরহেযগারিতা সম্পর্কে প্রশ্ন তুলতে পারেনি। সমস্ত ইমামের ঐকমত্যে তিনি ছিলেন একজন মহান বুযুর্গ, আবিদ, তাকওয়াবান ও পরহেযগার ইমাম। আর স্বভাবতই মুসলিম উম্মাহর একজন তাকওয়াবান ও পরহেযগার ইমামের দ্বারা চুরি করা অসম্ভব। তার মত মহান বুযুর্গ ইমাম কেন, সাধারণ একজন আলেমের শানেও তো চুরির অপবাদটা যায় না। 


 


যারা তার নামে এই অপবাদ দিয়েছে আল্লাহ তাদের বিবেক-বুদ্ধি ছিনিয়ে নিয়েছে। তারা ইমাম আবূ হানীফার শত্রুতায় নিজেদেরকে অন্ধ হিসেবে প্রতিপন্ন করেছে। তাই তো তারা এই মহান ইমামের শানে বেয়াদবীর সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে। 


 


২. ইমাম আবূ হানীফাহ কর্তৃক ইমাম হাম্মাদের কিতাব চুরি করা একেবারেই যুক্তিহীন। কারণ হাম্মাদ ছিলেন তাঁর শায়খ। তিনি সরাসরিই তাঁর শায়খ হাম্মাদের নিকট ২০ বছরের অধিক সময় ছিলেন। তাহলে তিনি ঐ কিতাবসমূহ থেকে কী পাবেন যা তিনি বিশ বছরেও পাননি? যদি তিনি ইমাম হাম্মাদের সাক্ষাৎ না পেতেন, তাহলে মানা যেতো যে, তাঁর থেকে অজানা ইলমগুলো অর্জন করার জন্য তিনি তাঁর কিতাব চুরি করেছেন। কিন্তু ব্যাপারটা তো এমন নয়। 


 


৩. এই বর্ণনার প্রধান রাবী হলেন, মুহাম্মদ ইবনে জাবের আল-ইয়ামামী। তিনি অত্যন্ত দুর্বল ও নিতান্তই অগ্রহণযোগ্য! তাছাড়া তিনি ছিলেন অন্ধ। তার ব্যাপারে ইমাম বায়হাকী রহ. বলেন, متروك، ومرة: ضعيف - অর্থাৎ, তিনি পরিত্যাজ্য। কখনওবা বলেছেন, তিনি য'ঈফ। 


 


ইমাম আবু দাউদ রহ. বলেন, ليس بشيء، ومرة: ضعفه - তিনি কোনো বস্তুই নন, কখনও আবার দুর্বল বলেছেন।


 


আহমাদ বিন হাম্বল রহ. বলেন, 


 


لا يحدث عنه إلا شر منه، ومرة: يروي أحاديث مناكير، يقولون رأوا في كتبه نحو حديثه عن حماد فيه اضطراب، ومرة: منكر أنكره جدا


 


অর্থাৎ, তার সূত্রে তার চেয়ে মন্দ ব্যতীত কেউ বর্ণনা করে না। তিনি আপত্তিকর হাদীস বর্ণনা করেন। মুহাদ্দিসগণ তাঁর কিতাবে হাম্মাদ থেকে বর্ণিত হাদীসসমূহ পরখ করে দেখলেন তাতে ‘ইযতিরাব’ তথা নানা ধরনের বৈপরীত্য, গোলমাল ও অসঙ্গতি রয়েছে। তিনি অত্যন্ত আপত্তিজনক বর্ণনাকারী।


 


হাফেয যাহাবী রহ. বলেন, سيئ الحفظ - তার স্মৃতিশক্তি দুর্বল। 


 


ইমাম বুখারী রহ. বলেন, ليس بالقوي، يتكلمون فيه، روى مناكير


 


অর্থাৎ, তিনি শক্তিশালী নন। তিনি আপত্তিকর রেওয়ায়েত বর্ণনা করেন। ইমামগণ তার ব্যাপারে সমালোচনা করেছেন। 


 


উক্ত বর্ণনারই আরেকজন রাবী ইবরাহীম ইবনে ইয়াকুব, তাঁর নিজেরই মন্তব্য


 


إبراهيم بن يعقوب الجوزجاني : ضعفه، ومرة: غير مقنع 


 


মুহাম্মদ ইবনে জাবের আল-ইয়ামামী দুর্বল। অন্যত্র বলেন, তিনি বিশ্বাসযোগ্য নন।


 


 


ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে মা'ঈন রহ. বলেন, 


 


اختلط عليه حديثه وهو ضعيف، ومرة: لا يحدث عنه إلا من هو أشر منه، ومرة: عمي واختلط، ومرة: ليس بشيء


 


তার হাদীসগুলো (সঠিক-বেঠিকে) মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে এবং তিনি দুর্বল। অন্যত্র বলেছেন, তার সূত্রে তার চেয়ে মন্দ ব্যতীত কেউ হাদীস বর্ণনা করে না। তিনি ছিলেন অন্ধ ও বিভ্রান্তির শিকার। অন্যত্র বলেন, তিনি কোন বস্তুই না। [তথ্যসূত্র: আয-যু'আফাউল কাবীর: ৪/১৪]


 


এই বর্ণনার বাকী রাবীদের অবস্থা


 


যদি রিজাল শাস্ত্রের প্রখ্যাত ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে মা'ঈন রহ. ও আহমদ বিন হাম্বল এর সুরে বলি, তাহলে এই বর্ণনার বাকি রাবীদের অবস্থা হলো, উক্ত রাবীর চেয়ে নিম্নমানের। কারণ, তাঁরা বলেছেন- মুহাম্মদ ইবনে জাবের এর সূত্রে তার চেয়ে মন্দ ব্যতীত কেউ বর্ণনা করে না। তো, যেহেতু তার সূত্রে বাকিরা এই জাল ঘটনা বর্ণনা করেছে, সেহেতু তাদের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। 


আসলে বড়দের ভুল ধরতে গেলে নিজেদেরকেই ছোট হতে হয়। বারবার তা প্রমাণিত হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে কারো প্রতি মিথ্যারোপ করা থেকে হিফাযত করুন।


 


[অবস্থা অনুযায়ী আরেক পর্ব আসবে]


 


 

১ / 1